Logo
Logo
×
   

আন্তর্জাতিক

৭৮ বছরে এই প্রথম এমন সংকটের মুখে ইসরাইল, নেপথ্যে যে কারণ

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:২৮ পিএম

৭৮ বছরে এই প্রথম এমন সংকটের মুখে ইসরাইল, নেপথ্যে যে কারণ

সংগৃহীত

ইসরাইলের অন্যতম প্রধান ডিস্যালিনেশন (সমুদ্রের নোনা পানি থেকে সুপেয় পানি তৈরির) প্ল্যান্টগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। যার ফলে দেশটিতে পানি সংকট প্রকটাকার ধারণ করেছে। ৭৮ বছরে এমন পরিস্থিতিতে আর পড়েনি দেশটি। 

ভূমধ্যসাগরে মাইলের পর মাইল জুড়ে ছড়িয়ে পড়া এক ধরনের ক্ষুদ্র শৈবালকে দায়ী করা হচ্ছে এই সুপেয় পানি তৈরির প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে। ইসরাইলের জাতীয় পানি কোম্পানি মেকোরোতের তথ্য অনুযায়ী, রোববার দেশের ছয়টি উপকূলীয় ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টের মধ্যে পাঁচটিই বন্ধ হয়ে যায়। 

এসব প্ল্যান্ট সমুদ্রের পানিকে সুপেয় পানিতে রূপান্তর করে। বেসরকারি মালিকানাধীন ও পরিচালিত এসব প্ল্যান্টের কিছু কিছু আংশিকভাবে চালু হয়েছে, তবে বৃহস্পতিবার মাত্র একটি প্ল্যান্টই পুরোপুরি সক্ষমতায় চলছিল।

মেকোরোতের মুখপাত্র লিয়র গুতমান বলেন, ‘এমন ঘটনা ইসরাইলে আগে কখনো ঘটেনি। এটি অত্যন্ত বিরল একটি ঘটনা।’ সুপেয় পানির জন্য ইসরাইল ডিস্যালিনেশনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। শুষ্ক এই দেশটিতে নেই বড় কোনো নদী, নেই পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতও। তবে এই প্রযুক্তিতে দক্ষতার কারণেই দেশটি হয়ে উঠেছে এক ‘পানি পরাশক্তি’। বর্তমানে দেশটির অন্তত ৬৫ শতাংশ সুপেয় পানি আসে ডিস্যালিনেশন থেকে। এসব প্ল্যান্টের বেশিরভাগই ভূমধ্যসাগরের উপকূলে অবস্থিত।

সমস্যার শুরু সপ্তাহান্তে। ইসরাইলের বেন-গুরিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি গবেষণা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এদো বার-জিভ বলেন, ইসরাইলের উপকূলজুড়ে ‘বিক্ষিপ্ত অথচ বিশাল দূষণের ঘটনা’ ঘটে। তিনি ও অন্য বিজ্ঞানীরা কাছ থেকে বিষয়টি খতিয়ে দেখে জানতে পারেন, এটি আসলে মাইক্রোঅ্যালজি বা ক্ষুদ্র শৈবাল। এই ক্ষুদ্র জীব সূর্যালোক, কার্বন ডাইঅক্সাইড আর পানির পুষ্টি উপাদান খেয়ে দ্রুত বেড়ে ওঠে।

বার-জিভের হিসাব অনুযায়ী, এই শৈবাল অন্তত ১২ মাইলজুড়ে ছড়িয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এটির উৎপত্তি নীল নদের ব-দ্বীপে, এরপর সমুদ্রের স্রোতের সঙ্গে উত্তর দিকে ইসরাইলের উপকূল ধরে এগিয়ে এসেছে। ২০ বছর ধরে উপকূলের পানি পরীক্ষা করে আসা বার-জিভ বলেন, ‘এত বড় পরিসরে এমন কিছু আমি এই প্রথম দেখলাম।’

দেশটির বেশিরভাগ ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টে ব্যবহার করা হয় ‘রিভার্স অসমোসিস’ নামের একটি প্রযুক্তি। এখানে প্রথমে পানি থেকে বড় দূষণকারী উপাদান সরিয়ে প্রাথমিক শোধন করা হয়। এরপর পানিকে ঠেলে পাঠানো হয় বিশেষ পর্দার মধ্য দিয়ে, যা লবণ, ব্যাকটেরিয়া আর অন্যান্য কণা ছেঁকে ফেলে সুপেয় পানি তৈরি করে।

উটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডল ইস্ট সেন্টারের পরিচালক মাইকেল ক্রিস্টোফার লো বলেন, শৈবাল আর তার তৈরি উপাদান ওই পর্দাগুলোকে নষ্ট ও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। পানিতে যদি খুব বেশি পরিমাণ ভাসমান উপাদান থাকে, তাহলে শোধন প্রক্রিয়া তা সামলাতে পারে না।

এমন ঘটনা আগেও ঘটেছে। ২০০৮ ও ২০০৯ সালে ওমান উপসাগরে এক ভয়াবহ ‘রেড টাইড’ বা ক্ষতিকর শৈবাল বিস্তারের ঘটনায় সেই অঞ্চলের অনেক ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

ইসরাইলে প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে সৃষ্ট ঘাটতি পূরণে সরকারি পানি ব্যবস্থা এগিয়ে এসেছে বলে জানান মেকোরোতের গুতমান। এর মধ্যে আছে গ্যালিলি সাগর থেকে পানি তোলা, ভূগর্ভস্থ কূপ চালু করা এবং জাতীয় পানি মজুত ব্যবহার করা।

কিছু শহরে স্বল্পমেয়াদি স্থানীয় বিধিনিষেধ দেখা গেছে, যেমন বাগানে সেচ আর সুইমিং পুল ভরার ক্ষেত্রে। তবে গুতমান জানান, মূল প্রভাব পড়েছে সেই কৃষকদের ওপর, যারা সেচের জন্য খাবার পানির মানের পানি ব্যবহার করেন, পুনর্ব্যবহৃত পানি ব্যবহারকারীদের ওপর নয়।

সময়টাও সমস্যা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। তিনি বলেন, ‘গ্রীষ্মকালে যখন ইসরাইলে পানির চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে’, তখনই এটি ঘটল। ইসরাইলের সমুদ্র বিজ্ঞান ও লিমনোলজি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সামুদ্রিক বাস্তুবিজ্ঞানী তামার গাই-হাইম বলেন, পানিতে পরিবেশগত বিভিন্ন উপাদানের সঠিক মিশ্রণ ঘটলেই এমন শৈবাল বিস্তার ঘটে। এসব উপাদানের মধ্যে আছে পুষ্টি উপাদান, তাপমাত্রা, আলো, স্রোত আর মিশ্রণ প্রক্রিয়া।

মেকোরোত জানায়, সাম্প্রতিক এই শৈবাল বিস্তারের পেছনে ছিল ‘অত্যন্ত অস্বাভাবিক কিছু উপাদানের মিশ্রণ’। এর মধ্যে ছিল একটি সমুদ্র ঝড়, যা পানির ঘোলাত্ব বাড়িয়ে দেয় এবং সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয় ৮৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি পর্যন্ত।

এই বিপর্যয়ের ব্যাপ্তি রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। শৈবাল বা জেলিফিশের কারণে আগেও ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট বন্ধ হতে বাধ্য হয়েছে। তবে বেন-জিভ বলেন, ‘আমাদের উপকূলের এত বড় অংশজুড়ে একসঙ্গে একাধিক প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যাওয়া নিশ্চিতভাবেই অস্বাভাবিক ঘটনা।’

এই সমস্যা কীভাবে মোকাবিলা করতে হবে, তা দেশটিকে বের করতে হবে, আর তারা তা করবেও বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘এটা যুক্তিসংগতভাবেই ধরে নেওয়া যায় যে, এটি জীবনে একবারই ঘটার মতো কোনো ঘটনা হবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও বেশি বেশি ঘটবে বলে ধরে নেওয়া যায়।’

মানুষের জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে পৃথিবী উষ্ণ হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সাগরও বদলে যাচ্ছে। তাপমাত্রা এখন রেকর্ড উচ্চতায়, স্রোতের গতিপথ বদলে যাচ্ছে, আর শক্তিশালী ঝড়ের কারণে পানিতে মিশছে আরও বেশি দূষণকারী পদার্থ, যার মধ্যে আছে পয়ঃবর্জ্য আর সার। এসব কারণে বড় ধরনের শৈবাল বিস্তার ঘটতে পারে।

এই সাময়িক সংকট আরও একটি বড় উদ্বেগের বিষয় সামনে এনেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। জলবায়ু সংকটের কারণে তীব্র তাপ আর খরা বেড়ে যাওয়ায় পানি নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে ডিস্যালিনেশনের জনপ্রিয়তা ক্রমেই বাড়ছে। 

তবে একটি কেন্দ্রীভূত প্রযুক্তিগত সমাধানের ওপর এমন ক্রমবর্ধমান নির্ভরতার সঙ্গে আছে ঝুঁকিও। লো বলেন, ‘এই ঘটনা যথেষ্ট উদ্বেগ তৈরি করেছে, এমনকি কিছু সমালোচনাও হয়েছে যে এই ব্যবস্থা বড় ধরনের বিঘ্নের সামনে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।’

এটি প্রাকৃতিক বা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঘটনাও হতে পারে, তবে সামরিক ও সাইবার হুমকির সম্ভাবনাও আছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের সময় উপসাগরীয় অঞ্চলের ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টগুলো লক্ষ্যবস্তু হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এই প্রযুক্তির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল একটি অঞ্চলে এতে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। হ্যাকাররাও পানি স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করেছে, যুক্তরাষ্ট্রেও এমন ঘটনা ঘটেছে।

তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাও একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। বেন-জিভ বলেন, ‘ডিস্যালিনেশন স্থাপনার আশপাশে তেল ছড়িয়ে পড়বে কি না, সেটা প্রশ্ন নয়, বরং কখন ছড়াবে, সেটাই প্রশ্ন।’ অনেক প্ল্যান্ট এমন দেশে অবস্থিত, যেখানে পানির ঘাটতি আছে কিন্তু একই সঙ্গে তারা বড় তেল উৎপাদনকারীও, যেমন উপসাগরীয় দেশগুলো।

তিনি আরও বলেন, তেল ছড়িয়ে পড়লে তা এই মাইক্রোঅ্যালজি বিস্তারের চেয়েও অনেক বেশি সময়ের জন্য প্ল্যান্টগুলো বন্ধ করে দিতে পারে। তিনি বলেন, ‘সেটাই আমার কাছে আরও বেশি উদ্বেগের বিষয়।’

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম