Logo
Logo
×
   

আন্তর্জাতিক

মার্কিনবিরোধী বিকল্প বিশ্বব্যবস্থা গড়তে মরিয়া চীন

Icon

আবদুস সামাদ আজাদ

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:১৫ পিএম

মার্কিনবিরোধী বিকল্প বিশ্বব্যবস্থা গড়তে মরিয়া চীন

ইউরেশিয়ার শক্তিগুলোকে একই কূটনৈতিক পরিসরে এনে নিজের প্রভাব বলয় বিস্তৃত করছে চীন।

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থায় যখন মতবিরোধ বাড়ছে, তখন চীন ইউরেশিয়ার শক্তিগুলোকে একই কূটনৈতিক পরিসরে এনে নিজের প্রভাব বলয় বিস্তৃত করছে। বেইজিংয়ের লক্ষ্য দ্বিপক্ষীয় কূটনীতি কাজে লাগিয়ে এমন একটি বহুমেরু ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে বৈশ্বিক এজেন্ডা নির্ধারণ করতে না পারে।

সম্প্রতি সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলন ও জি২০ মন্ত্রীদের সম্মেলনে দুই পরাশক্তির রেষারেষি দেখা গেছে। সেখানে চীনের মার্কিন আধিপত্যবিরোধী মনোভাব স্পষ্ট ছিল।

দ্য উইকের ভাষায়, গেল আগস্টের শেষে কিরগিজস্তানের বিশকেকে এসসিও শীর্ষ সম্মেলন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনার অ্যাশভিলে জি-২০ মন্ত্রিপর্যায়ের সম্মেলন—দুই আয়োজনেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে বৈশ্বিক নেতৃত্বের প্রশ্নে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি অবস্থান।

একদিকে চীনের নেতৃত্বে পশ্চিমবিরোধী শক্তিগুলোর সমাবেশ, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিদ্যমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো ধরে রাখার চেষ্টা—দুই সম্মেলন যেন চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার দুই বিপরীত মঞ্চ হয়ে ওঠে।

এসসিও সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে রাশিয়া ও ইরানের নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক তৎপরতায় দেখা গেছে।

আর জি-২০ বৈঠকে চীনের অর্থনৈতিক নীতিকে ঘিরে প্রকাশ্য বিরোধে জড়ায় ওয়াশিংটন। জোটটির সদস্য দেশগুলো বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা ও ‘নন-মার্কেট’ নীতি নিয়ে মার্কিন অবস্থানকে সমর্থন করলেও চীনের আপত্তিতে সর্বসম্মত যৌথ বিবৃতি আটকে যায়।

এই দুই বৈঠকের দুই ছবি যেন বিশ্বব্যবস্থার দুই বিপরীত প্রবণতাকে সামনে এনেছে। নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, চীনের এই কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে রাশিয়া। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় ইউরোপীয় বাজার থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন মস্কো এখন এশিয়াকে প্রধান বিকল্প হিসেবে দেখছে। ফলে চীন-রাশিয়া সম্পর্কও ক্রমে কৌশলগত অংশীদারত্বের বাইরে অর্থনৈতিক নির্ভরতার কাঠামো পাচ্ছে।

বিশকেক সম্মেলনের আগে শি জিনপিং ও পুতিনের বৈঠকে দুই নেতা সম্পর্ক আরও গভীর করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২’ গ্যাস পাইপলাইন নিয়ে আলোচনা সেই ঘনিষ্ঠতার অন্যতম বাস্তব উদাহরণ।

রাশিয়ার জন্য চীনের গুরুত্ব যেমন বাড়ছে, তেমনি বেইজিংয়ের কাছেও মস্কো গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে রাশিয়ার বিকল্প বাজার ও অর্থনৈতিক চ্যানেলের প্রয়োজন এবং চীনের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি চাহিদা দুই দেশের স্বার্থকে কাছাকাছি এনেছে।

রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়, ইরান-রাশিয়া-চীন সমীকরণে আবার ভিন্ন বাস্তবতা কাজ করছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সংঘাতের চাপের মধ্যে ইরান এসসিওকে রাজনৈতিক সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে পারমাণবিক শক্তি সহযোগিতা এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক প্রকল্প এগিয়ে নিচ্ছে।

অর্থাৎ, ইরানের কাছে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আদর্শগত সংহতির পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞার বাইরে টিকে থাকার বাস্তব কৌশলও।

বিশকেকে পুতিনও ইরানের প্রতি মস্কোর সমর্থন স্পষ্ট করেছেন। তিনি ইরানি জনগণের ‘সাহস ও সহনশীলতার’ প্রশংসা করে জানান, কঠিন সময়ে রাশিয়া তেহরানকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করছে। একই সম্মেলনে পুতিন এসসিওকে ‘উদীয়মান বহুমেরু বিশ্বের অন্যতম স্বাধীন ও প্রভাবশালী কেন্দ্র’ হিসেবে তুলে ধরেন।

মার্কিনবিরোধী জোটে রূপ নিচ্ছে এসসিও

এসসিওকে চীন মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বয়ান তৈরির অন্যতম প্রধান মঞ্চে পরিণত করতে চাইছে।

ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছে, তিয়েনজিনের সম্মেলন, বিশকেকের শীর্ষ বৈঠক এবং বেইজিংয়ের বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজ—এই ধারাবাহিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে বেইজিং বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার ধারণাকে সামনে আনছে।

বিশকেকে শি জিনপিং, পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফসহ বিভিন্ন দেশের নেতাদের উপস্থিতি এসসিওর ব্যাপ্তি তুলে ধরেছে।

চীনের বার্তাটি ছিল স্পষ্ট—বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্র আর শুধু ওয়াশিংটন নয়; এশিয়া ও ইউরেশিয়ার শক্তিগুলোও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।

পুতিনের বক্তব্যও এই বার্তাকে জোরালো করেছে। রুশ প্রেসিডেন্টের মতে, ‘এসসিওর সদস্যরাষ্ট্রগুলোতে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষের বসবাস—যা জোটটির বৈশ্বিক গুরুত্বেরই ইঙ্গিত দেয়।’

অ্যাশভিলে চীন-যুক্তরাষ্ট্র বিরোধ

রয়টার্স লিখেছে, অ্যাশভিলে অনুষ্ঠিত জি২০ অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধ আড়ালে থাকেনি। বৈঠকের মূল বিতর্কের একটি ছিল বৈশ্বিক বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল, বড় বাণিজ্য উদ্বৃত্তধারী দেশগুলোর ‘নন-মার্কেট’ নীতি ও অতিরিক্ত রপ্তানি-নির্ভরতার বিরুদ্ধে জি২০ একটি অবস্থান নিক।

বেইজিং এতে আপত্তি জানায়। ফলে সর্বসম্মত যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সভাপতিত্বে ‘চেয়ারস স্টেটমেন্ট’ প্রকাশ করা হয়।     

বেইজিং চাইছিল, বিবৃতির ভাষায় যেন চীনের রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি, অতিরিক্ত উৎপাদন ও রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিকে বৈশ্বিক ভারসাম্যহীনতার কারণ হিসেবে তুলে ধরা না হয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর অভিযোগ—চীনের বিপুল শিল্প উৎপাদন ও সস্তা পণ্যের রপ্তানি তাদের নিজস্ব শিল্প ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ তৈরি করছে।

বিরোধ শুধু বাণিজ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। চীনের বিরল মৃত্তিকা ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নিয়েও উদ্বেগ জানানো হয়। জাপান এ ধরনের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর বলে মন্তব্য করে। ফলে জি২০ অর্থনৈতিক ফোরামটিও বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার আরেকটি মঞ্চে পরিণত হয়েছে।

মার্কিনবিরোধী ইউরেশীয় বলয়ের প্রভাব

চীনের এই কৌশলের সবচেয়ে বড় প্রভাব হতে পারে বিশ্বব্যবস্থার দ্রুত বহুমেরুকরণ। ওয়াশিংটন যেখানে জি২০, কোয়াড ও অন্যান্য বিদ্যমান কাঠামোর মাধ্যমে নিজের প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছে, বেইজিং সেখানে এসসিও, ব্রিকস এবং দ্বিপক্ষীয় কূটনীতির সমন্বয়ে বিকল্প নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করছে।

চীনের লক্ষ্য এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে ওয়াশিংটন এককভাবে আন্তর্জাতিক এজেন্ডা নির্ধারণ করতে না পারে।

এর অর্থনৈতিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া ও ইরান পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার বাইরে বিকল্প বাজার, অর্থায়ন ও জ্বালানি সহযোগিতার পথ খুঁজছে। চীন তার বিশাল বাজার, শিল্প সক্ষমতা ও আর্থিক শক্তিকে এই প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারলেই ইউরেশিয়ায় একটি বিকল্প অর্থনৈতিক বলয় আরও শক্তিশালী হতে পারে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম