ইরান সংকটের মাঝেই নিরাপত্তা নীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত কাতারের
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:০২ পিএম
সম্পর্ক পুনর্গঠনের আহ্বান
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বা কৌশলগত জোটের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেছেন কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি। খবর দ্যা মিডল ইস্ট আই-এর।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত হিলি ফোরামে তিনি এ কথা বলেন।
আরব বিশ্বের সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি কাতারে অবস্থিত। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) আঞ্চলিক সদরদপ্তর হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের সংঘাতের জেরে ইরানের পাল্টা হামলার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে কাতারের ওপর।
ফোরামে আল-আনসারি বলেন, ‘উপসাগরীয় দেশগুলোকে বুঝতে হবে, অঞ্চলে আন্তর্জাতিক বাহিনীর উপস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত জোট গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা যথেষ্ট নয়। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরশীলতাই সামনে এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের অংশীদার ও মিত্রদের প্রয়োজন রয়েছে। তবে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আমরা শুধু তাদের ওপর নির্ভর করতে পারি না।’
আল-আনসারির এ বক্তব্য এমন সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক অ্যাভ্রিল হেইনস সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন উপস্থিতি কমিয়ে আনা হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা কমানোর চেষ্টা অতীতে ইতিবাচক ফল দেয়নি।
ইরানের পাল্টা হামলার আশঙ্কায় চলতি বছরের শুরুতে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে হাজারো মার্কিন সেনা ও দূতাবাসকর্মীকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তাদের সবাই আবার ফিরবেন কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের আহ্বান
সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক সংবাদপত্র দ্য ন্যাশনাল-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আল-আনসারি বলেন, ইরানের সঙ্গে আস্থা পুনর্গঠনে সময় লাগবে, তবে তা প্রয়োজনীয়। কারণ ইরান সবসময়ই কাতারের প্রতিবেশী দেশ হিসেবে থাকবে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশগুলোতে যেমন বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব হয়েছে, তেমনি ইরানের সঙ্গেও আমরা সহাবস্থানের পথ খুঁজে নেব।’
তবে তিনি ইরানের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ভালো প্রতিবেশীসুলভ আচরণ করা এবং সামরিক চাপ প্রয়োগের নীতি থেকে সরে আসার দায়িত্ব মূলত তেহরানেরই।
আল-আনসারি বলেন, ‘সময় উপযুক্ত হলে আমরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেব। একই সঙ্গে আমরা প্রতিরোধ সক্ষমতাও ধরে রাখব এবং প্রয়োজন হলে নিজেদের রক্ষা করতে পারি—সাম্প্রতিক সংকটে আমরা সেটি দেখিয়েছি।’
সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার সুযোগ নেই
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার দাবি করলেও যে সংঘাত দ্রুত শেষ হবে, আল-আনসারি সতর্ক করে বলেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হওয়ার সুযোগ নেই।
তার ভাষায়, ‘বিশ্ব এই সংঘাত চলতে দেওয়ার সামর্থ্য রাখে না। হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকাও সম্ভব নয়। উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত থাকাও গ্রহণযোগ্য নয়।’
সম্প্রতি মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট মন্তব্য করেছিলেন, বিকল্প তেল পাইপলাইন নির্মিত হলে দুই বছরের মধ্যে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব কমে যেতে পারে। তবে আল-আনসারি এ মতের সঙ্গে একমত নন।
তিনি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি হাজার বছর ধরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। কোনো একক ঘটনা বা উদ্যোগ এর গুরুত্ব বদলে দিতে পারবে না।’
নিষেধাজ্ঞার বদলে আলোচনার পক্ষে কাতার
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা নীতিরও সমালোচনা করেন আল-আনসারি। তিনি বলেন, ইরাক, লিবিয়া ও অন্যান্য দেশে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাশিত ফল বয়ে আনেনি।
তার মতে, ‘কোনো সংকটের সরাসরি ও কার্যকর সমাধান নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে নয়, বরং আলোচনার টেবিলেই পাওয়া সম্ভব।’
কাতারের এই অবস্থান এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

