Logo
Logo
×
   

Advertisement

আন্তর্জাতিক

অভিন্ন মুদ্রার পরিকল্পনা ব্রিকসের, তবে যে কারণে মার্কিন ডলার ছাড়বে না ভারত

Advertisement

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:০৫ পিএম

অভিন্ন মুদ্রার পরিকল্পনা ব্রিকসের, তবে যে কারণে মার্কিন ডলার ছাড়বে না ভারত

Advertisement

২০২৬ সালের ব্রিকস সম্মেলনের আয়োজক দেশ ভারত। তবে সম্মেলনের আগে জোটের সবচেয়ে আলোচিত একটি বিষয়ে দিল্লির অবস্থান বেশ স্পষ্ট—মার্কিন ডলার থেকে সরে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা ভারতের নেই।

চীন ও রাশিয়া কৌশলগতভাবে ডি-ডলারাইজেশন বা ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভাও বিষয়টি নিয়ে সরব। তবে ব্রিকসের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি ভারত এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থান ধরে রেখেছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে ভারত ব্রিকসের আর্থিক সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ থেকে সরে যাচ্ছে। বরং দেশটি অপেক্ষাকৃত সীমিত ও কারিগরি একটি প্রস্তাব সামনে আনছে—ব্রিকস সদস্য দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রার (সিবিডিসি) মধ্যে সংযোগ তৈরি করা। এর লক্ষ্য হবে জোটের মধ্যে বাণিজ্য ও পর্যটন-সংক্রান্ত লেনদেন আরও সহজ করা। অর্থাৎ এটি মুদ্রাব্যবস্থায় বিপ্লবের চেয়ে অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থার উন্নয়নেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

ডলার ছাড়ার পথে যাবে না ভারত

ওয়াশিংটনে কার্নেগি এনডাওমেন্টে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করে বলেছেন, ডলারকে লক্ষ্যবস্তু করা ভারতের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা কৌশলগত নীতির অংশ নয়। ডলারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে ভারতের উদ্বেগ রয়েছে, তবে উদ্বেগ থাকা আর ডলারকে সরিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা এক বিষয় নয়।

গত দুই বছর ধরেই ভারতের অবস্থান মোটামুটি একই রয়েছে। ২০২৪ সালের পর ব্রিকসে মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত যোগ দেওয়ায় জোট আরও বৈচিত্র্যময় হয়েছে। এসব দেশের অনেকেরই ডলারের আধিপত্য নিয়ে ভিন্ন মাত্রার উদ্বেগ রয়েছে। তবে ভারত এখনো ডলারবিরোধী কোনো অভিন্ন প্রকল্পে সরাসরি যুক্ত হয়নি।

গ্র্যান্ট থর্নটন ভারত-এর অংশীদার ও অর্থনৈতিক পরামর্শ বিভাগের প্রধান ঋষি শাহ বলেন, একটি দেশের মতো রাজনৈতিক ও আর্থিক ঐক্য না থাকলে ব্রিকসের মতো বৈচিত্র্যময় জোটে প্রচলিত অর্থে একটি মুদ্রা ইউনিয়ন গঠন অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিকভাবে যৌক্তিক নয়। তবে বাণিজ্যের জন্য সহজ ও অভিন্ন কোনো ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা যেতে পারে।

কী তৈরি করতে চাইছে ভারত

ভারতের উদ্যোগের মূল জায়গা হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা বা সিবিডিসি। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর সিবিডিসির মধ্যে সংযোগ স্থাপনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব সম্মেলনের আলোচ্যসূচিতে রাখার সুপারিশ করেছে ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক।

প্রস্তাবটি গৃহীত হলে প্রথমবারের মতো ব্রিকস নেতাদের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে এমন একটি পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হবে।

২০২৫ সালে রিও ডি জেনেইরো সম্মেলনে ব্রিকস দেশগুলোর অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থার মধ্যে আন্তঃসংযোগ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল। ভারতের বর্তমান উদ্যোগ সেই সাধারণ ঘোষণাকে একটি নির্দিষ্ট কারিগরি প্রস্তাবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা।

এর মাধ্যমে জোটের সদস্যদের মধ্যে সীমান্তপারের বাণিজ্য ও পর্যটন লেনদেনে খরচ, সময় ও জটিলতা কমানোর লক্ষ্য রয়েছে।

তবে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে বেশ কিছু বাধাও রয়েছে। সিবিডিসি ব্যবস্থার মধ্যে সংযোগ তৈরি করতে অভিন্ন প্রযুক্তিগত মান, পরিচালন কাঠামো ও নীতিমালায় ঐকমত্য প্রয়োজন। পাশাপাশি সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অসম বাণিজ্য প্রবাহ কীভাবে সামলানো হবে, সেটিও বড় প্রশ্ন।

ভারত এর আগে রাশিয়ার সঙ্গে রুপিতে বাণিজ্য বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েও সমস্যায় পড়েছিল। রাশিয়ার কাছে বিপুল পরিমাণ রুপি জমা হলেও তা সহজে ব্যয় করার সুযোগ ছিল না। পরে রিজার্ভ ব্যাংক রাশিয়াকে ওই অর্থ ভারতীয় সরকারি বন্ডে বিনিয়োগের সুযোগ দেয়।

এ ধরনের সমস্যা এড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় মুদ্রা বিনিময় চুক্তি বা কারেন্সি সোয়াপ লাইন চালুর বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। এর মাধ্যমে কোনো দেশ এমন মুদ্রা জমা করে ফেলবে না, যা পরে ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে।

ভারতের ২২৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি

ব্রিকসের অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনায় ভারতের বিপুল বাণিজ্য ঘাটতিই বড় বাস্তবতা হিসেবে সামনে আসছে।

পরামর্শ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান কোয়ান্টিভ অ্যাডভাইজরি এলএলপির প্রতিষ্ঠাতা সোহম ব্যানার্জি বলেন, ব্রিকসের অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা প্রায়ই ডি-ডলারাইজেশনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু প্রকৃত সুযোগ রয়েছে লেনদেনের খরচ, নিষ্পত্তিতে বিলম্ব এবং সীমিত কয়েকটি সীমান্তপারের অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমানোর মধ্যে।

তার মতে, ব্রিকসের বাকি দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি ২২৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ ভারত জোটের সদস্য দেশগুলো থেকে যতটা পণ্য ও সেবা কেনে, তার তুলনায় কম বিক্রি করে।

এই অসম বাণিজ্য স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেনের বড় বাধা। কারণ এক পক্ষ দীর্ঘদিন উদ্বৃত্তে থাকলে অন্য পক্ষের মুদ্রা জমতে থাকে। পরে সেই মুদ্রা কোথায় বিনিয়োগ বা কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়।

ফলে ডলারের বদলে রুপি বা ইউয়ানে লেনদেন শুরু করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। এতে মূল বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা দূর না হয়ে শুধু মুদ্রার নাম পরিবর্তন হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর ব্রিকস অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা, তারল্য সহায়তা, অভিন্ন নিষ্পত্তি মান, যথাযথ বিধিবিধান এবং জমে থাকা মুদ্রা কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট কাঠামো প্রয়োজন।

ভারতের জন্য তাই একক কোনো ডলার বিকল্পের বদলে ধাপে ধাপে এগোনোই বেশি বাস্তবসম্মত। যেখানে ডলার কার্যকর, সেখানে তা ব্যবহার করা, উপযুক্ত বাণিজ্যপথে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন বাড়ানো, তারল্য ব্যবস্থাপনায় সোয়াপ লাইন ব্যবহার এবং সীমিত কয়েকটি বাণিজ্যপথে সিবিডিসি সংযোগ পরীক্ষার মাধ্যমে ধীরে ধীরে ব্যবস্থা সম্প্রসারণের পক্ষে বিশেষজ্ঞরা।

ব্রিকসের অভিন্ন মুদ্রার স্বপ্নে প্রভাব

ভারতের এই অবস্থান ব্রিকসের অভিন্ন মুদ্রা চালুর পরিকল্পনাকে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতার মধ্যে রাখছে। এমন একটি মুদ্রা চালু করতে হলে জোটের বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে অভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান প্রয়োজন। চীন যেখানে ডলারকেন্দ্রিক ব্যবস্থার বিকল্প তৈরিতে আগ্রহী, সেখানে ভারত চীনের প্রভাবকেন্দ্রিক কোনো মুদ্রাব্যবস্থা তৈরির ব্যাপারে সতর্ক।

তাই ভারত যতক্ষণ এটিকে মুদ্রার পরিবর্তে অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থার সমস্যা হিসেবে দেখবে, ততক্ষণ ব্রিকসের অভিন্ন মুদ্রার বিষয়টি বাস্তব প্রকল্পের চেয়ে আলোচনার বিষয় হিসেবেই থাকবে।

ভারতের প্রস্তাবকে সরাসরি ডলারবিরোধী উদ্যোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে না। সিবিডিসি সংযোগের মূল লক্ষ্য হবে বাণিজ্য নিষ্পত্তিকে দ্রুত, সস্তা ও কার্যকর করা। অর্থাৎ এটি ডলারের বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রার মর্যাদা চ্যালেঞ্জ করার চেয়ে লেনদেনের অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ।

তবে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি কমানো না গেলে শুধু সিবিডিসি সংযোগ দিয়েও সমস্যার সমাধান হবে না। ডিজিটাল মুদ্রা লেনদেনের সময় ও খরচ কমাতে পারে, কিন্তু যেখানে পারস্পরিক বাণিজ্য প্রবাহ অসম, সেখানে তা ভারসাম্য তৈরি করতে পারে না।

সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের ব্রিকস সম্মেলনে ভারতের মূল বার্তা হতে পারে—ডলারকে সরিয়ে দেওয়ার চেয়ে বিকল্প অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা তৈরি করাই এখন বেশি বাস্তবসম্মত। ব্রিকস ডিজিটাল মুদ্রার মধ্যে সংযোগ স্থাপনের প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিলেও ভারতের লক্ষ্য আপাতত ডলারকে বিদায় জানানো নয়; বরং ডলারের পাশাপাশি আরও দ্রুত, সস্তা ও কার্যকর লেনদেন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

সূত্র: এনডিটিভি

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম