Logo
Logo
×
   

Advertisement

আন্তর্জাতিক

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন

গাজায় গণহত্যা কি আরও ভয়াবহ কিছুর ‘ট্রেলার’?

Advertisement

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০৮ পিএম

গাজায় গণহত্যা কি আরও ভয়াবহ কিছুর ‘ট্রেলার’?

ফাইল ছবি

Advertisement

গত সপ্তাহে ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। সেখানে দেখা যায়, অতিরিক্ত ওজনের ফিলিস্তিনি বন্দিদের একটি সারি কনভেয়ার বেল্টে করে কারাগারে ঢুকছে। তারা খাবার ও শিক্ষার স্বপ্ন দেখছে। বেন-গভির তাদের মাথার ওপর থাকা স্বপ্নের বুদবুদগুলো সরিয়ে দেন। এরপর বন্দিরা কঙ্কালসার ও কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে আসে।

বেন-গভির ফিলিস্তিনি বন্দিদের জন্য দর্শকদের বসার জায়গাসহ একটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের স্থান তৈরি করছেন। সম্প্রতি তিনি উত্তর ইসরাইলের ডেমন কারাগারে গিয়ে সেখানে দুর্বল পরিস্থিতির অভিযোগ করা নারী বন্দিদের উপহাস করেন। নতুন একটি উচ্চনিরাপত্তার কারাগারের চারপাশে তিনি পরিখা খনন করছেন। 

সেখানে টহলের জন্য কুমির রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সমর্থন রয়েছে। একই সঙ্গে সামরিক আদালতে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে বিবেচিত এবং প্রাণঘাতী হামলায় দোষী সাব্যস্ত ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুদণ্ডের বিধান চালুর যে আইন বেন-গভির সমর্থন করেছেন, সেটিও জনসমর্থন পাচ্ছে।

২০১৭ সালের দিকে অনেক ফিলিস্তিনি ও তাদের সমর্থক বিশ্ব গণমাধ্যমে একটি পরিবর্তন অনুভব করেছিলেন। ফিলিস্তিন নিয়ে প্রকাশিত নিবন্ধগুলোতে আগের মতো বিদ্বেষপূর্ণ চিঠি আসত না। ফিলিস্তিনিদের অধিকার সমর্থনে আয়োজিত অনুষ্ঠানেও খুব একটা বাধার মুখে পড়তে হতো না। মনে হচ্ছিল, ইসরাইল ও তার সমর্থকদের দীর্ঘদিনের প্রচার করা একটি ধারণায় মানুষ ক্রমেই কম বিশ্বাস করছে। 

সেই ধারণা ছিল, ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যে ‘পশ্চিমা মূল্যবোধের’ ধারক, বিশ্বের ‘সবচেয়ে নৈতিক সেনাবাহিনীর’ দেশ এবং কেবল আত্মরক্ষার জন্যই পদক্ষেপ নেয়। অথচ একই সময়ে গাজায় নিয়মিত হামলা এবং পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ চলছিল।

একসময় ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হতো, ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ইসরাইল কী করছে, তা গণতান্ত্রিক পশ্চিমা বিশ্বের যথেষ্ট মানুষ যদি জানতে পারে, তাহলে তারা নিজেদের সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। ফলে ইসরাইল আন্তর্জাতিক আইনের নিয়ম মানতে বাধ্য হবে। শেষ পর্যন্ত এমন একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হবে, যেখানে ইহুদি, মুসলিম ও খ্রিষ্টানরা সমান অধিকার নিয়ে বসবাস করবে। দক্ষিণ আফ্রিকাকে এর উদাহরণ হিসেবে সামনে আনা হতো। কারণ, কয়েক দশক ধরে দেশটির ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বর্ণবাদবিরোধী পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

কিন্তু নৈতিক ও যুক্তির লড়াইয়ে জয় আসছে বলে মনে হওয়ার বিপরীতে দখলদারিত্ব আরও দ্রুত এগিয়েছে। পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা বেড়েছে এবং গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর হামলাও আরও ঘন ঘন ও প্রকাশ্য হয়েছে। গত তিন বছর ছিল এরই ধারাবাহিকতা। 

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের হত্যা, আহত ও বাস্তুচ্যুত করার মাত্রা এমন পর্যায়ে নিয়ে যায়, যাকে ‘নিশ্চিত গণহত্যা’ হিসেবে বর্ণনা করা যায়। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ গাজা থেকে জাতিগত নির্মূলের প্রতি তার অঙ্গীকারের কথা বলেছেন। অন্যদিকে পশ্চিম তীরের এক ইহুদি বসতি স্থাপনকারী বিবিসিকে বলেছেন, একজন ইহুদির জীবন ১ কোটি ফিলিস্তিনির জীবনের সমান।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ইসরাইলিদের নানা বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে পড়ছে। টেলিভিশন বিতর্কের বিশ্লেষক থেকে শুরু করে ইসরাইলি সেনাদের কেউ কেউ ফিলিস্তিনিমুক্ত ফিলিস্তিন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় নানা কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে বলছেন ও করছেন।

বিশ্বের মানুষ এখন ফিলিস্তিনে কী ঘটছে, তা জানে এবং বারবার তা প্রত্যাখ্যান করছে। এরপরও পশ্চিমা অনেক গণতান্ত্রিক দেশ গণহত্যার সময়েও ইসরাইলকে অস্ত্র ও গোয়েন্দা সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ‘বোর্ড অব পিস’ ফিলিস্তিনিদের নিয়ে উপহাসের জন্ম দিয়েছে। একই সময়ে শত শত ইসরাইলি ট্রাক গাজার ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছে এবং এর সঙ্গে যুদ্ধাপরাধের প্রমাণও সরিয়ে ফেলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ফিলিস্তিনিদের জন্য ন্যায়বিচারের কিছু সুযোগ তৈরি করতে চাওয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ করছে। নিজেদের দেশের লাখো মানুষের বিক্ষোভ দমাতে পশ্চিমা গণতন্ত্রগুলো তাদের বিচারব্যবস্থায় আপস করছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং নিজেদের গণতান্ত্রিক স্বাধীনতাকে দুর্বল করছে। 

কেউ কেউ দেরিতে হলেও ইসরাইলি বসতিগুলোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। অথচ এসব অবৈধ বসতির বিরুদ্ধে বহু আগেই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল।

২০১৪ সালে প্রতিবেদনটির লেখক ফিলিস্তিনবিষয়ক রাসেল ট্রাইব্যুনালের জুরির সদস্য ছিলেন। গাজায় ছয় বছরের মধ্যে ইসরাইলের তৃতীয় যুদ্ধের পর প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনের ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন, এটি যদি গণহত্যা না হয়, তাহলে গণহত্যা খুব বেশি দূরে নয়। এখন তার প্রশ্ন, এই গণহত্যা কি সামনে আসতে যাওয়া আরও বড় কিছুর ট্রেলার?

লেখকের মতে, গণহত্যা যেমন অপ্রত্যাশিত ছিল না, তেমনি পুরোনো ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর এ বিষয়ে বিশেষ আপত্তি না থাকাও বিস্ময়ের নয়। নিজেদের ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় পশ্চিমা দেশগুলো কয়েক দশক ধরে অস্ত্র উৎপাদন এবং গোয়েন্দা ও নজরদারি প্রযুক্তিতে ইসরাইলের সঙ্গে অংশীদারত্ব করেছে। সন্ত্রাস দমন, জিজ্ঞাসাবাদ এবং বেসামরিক জনগণ নিয়ন্ত্রণের কৌশলেও পশ্চিমা দেশগুলো ইসরাইলের পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ নিয়েছে। ইসরাইলি অস্ত্রের অন্যতম প্রচার ছিল, এগুলো বাস্তবে ‘পরীক্ষিত ও ব্যবহৃত’।

এখন ইসরাইলের গণহত্যা যখন সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছে, তখন আন্তর্জাতিক ক্ষমতাকাঠামো তা দেখছে, সুরক্ষা দিচ্ছে এবং পরে সবকিছু গুছিয়ে নিতেও সহায়তা করছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এটি হয়তো একটি গবেষণা ও উন্নয়ন অনুশীলন, একটি নকশা বা ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করা উদাহরণ।

আমরা এমন এক পৃথিবীতে প্রবেশ করছি, যেখানে কিছু জনগোষ্ঠীকে অপ্রয়োজনীয় বলে বিবেচনা করা হচ্ছে—এমন অভিযোগও উঠেছে। তাদের কেউ কেউ এমন এলাকায় বাস করে, যা সম্পত্তি উন্নয়নকারীদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

এই যুদ্ধ শুধু ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলিদের বিষয় নয়। এটি আধিপত্য ও শ্রেষ্ঠত্বের এমন কিছু মতাদর্শের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা বিশ্বের মানুষ, নাগরিক সমাজ এবং টিকে থাকা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য হুমকি তৈরি করছে। আপাতত ফিলিস্তিনিরাই সেই সম্মুখসারিতে। তারাই নিহত, আহত, নির্যাতিত ও বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। কিন্তু ফিলিস্তিনিরাই একই সঙ্গে আমাদের সবাইকে এমন একটি পৃথিবীর দিকে এগিয়ে যাওয়া থেকে আটকে রেখেছে, যে পৃথিবী ইসরাইলের আদলে নতুন করে তৈরি হতে পারে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম