বুখারেস্টে সিআইএর গোপন বন্দিশিবিরে নির্যাতন: নতুন করে কাঠগড়ায় রোমানিয়া
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০১ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দীর্ঘ বিলম্বের পর ৯/১১ হামলার মামলার বিচারপ্রক্রিয়া যখন আলোর মুখ দেখতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই বুখারেস্টে সিআইএর একটি গোপন বন্দিশিবিরে ভয়াবহ নির্যাতনের নতুন প্রমাণ সামনে এল। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে’ রোমানিয়ার ভূমিকা নিয়ে বিশ্বজুড়ে আবার নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
আম্মার আল-বালুচির মনে সেই বন্দিদশার স্মৃতি আজও এক গভীর ক্ষতের মতো জেগে আছে। সেখানে তাকে প্রায় বিবস্ত্র অবস্থায় আটকে রাখা হতো। ঘরজুড়ে সারাক্ষণ জ্বলত তীব্র টিউবলাইট। নিজের সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হতো যেন আমি কোনো ফ্রিজের ভেতরে বাস করছি’।
৯/১১ হামলার মূল পরিকল্পনাকারী খালিদ শেখ মোহাম্মদের ভাগ্নে আল-বালুচিসহ ১২ জনকে ২০০৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে বুখারেস্টের এক গোপন কারাগারে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয় বলে ধারণা করা হয়। সিআইএ পরিচালিত ‘ডিটেনশন সাইট ব্ল্যাক’ নামের ওই স্থাপনায় বন্দিদের ওপর চালানো অবর্ণনীয় নির্যাতনের বিশদ বিবরণ সম্প্রতি গুয়ানতানামো সংক্রান্ত মার্কিন সামরিক আদালতের নথিতে উঠে এসেছে।
নথির তথ্য অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টা আলো জ্বালানো কক্ষে নিদ্রাহীন অবস্থায় দিনের পর দিন হাতকড়া পরা রাখা হতো বন্দিদের। বরফ-শীতল পানি ঢালা, জোরপূর্বক দাড়ি কামিয়ে দেওয়া এবং শারীরিক অত্যাচার করা সেখানে নিয়মিত ঘটনা ছিল।
২০২৪ সালে বালুচির আইনজীবীর মাধ্যমে গণমাধ্যমে একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী ছবি প্রকাশিত হয়। গোপন আটককেন্দ্রে তোলা ছবিতে তাকে সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় দেখা যায়। ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ চলাকালে সিআইএ পরিচালিত কোনো গোপন বন্দিশিবিরের এটিই প্রথম ছড়িয়ে পড়া ছবি, যা প্রায় এক হাজার গোপনীয় ছবির নথি থেকে সামনে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বালুচির আইনি প্রতিনিধিত্বকারী ব্রিটিশ ব্যরিস্টার বেন কিথ ‘মিডল ইস্ট আই’কে বলেন, ‘আমরা জানি, তাদের ওপর কী পরিমাণ ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হয়েছে। শত শত দিন ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে নির্যাতন চলায় ঠিক কোন ঘটনাটি কখন ঘটেছে, তা হয়তো সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন। তবে কাউকে গোপন কোনো আটককেন্দ্রে আটকে রাখার উদ্দেশ্য কেবল সাধারণ জিজ্ঞাসাবাদ ছিল না।’
যে নাইন-ইলেভেন হামলা বিশ্বজুড়ে মার্কিন ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ আর আফগানিস্তান-ইরাকে এক রক্তক্ষয়ী আগ্রাসনের পথ তৈরি করেছিল—যার প্রত্যক্ষ ফলে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৯ লাখ ৪০ হাজার মানুষ—অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সেই হামলার বিচার শুরুর দিনক্ষণ বেঁধে দিয়েছেন এক মার্কিন সামরিক বিচারক।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাইকেল শ্রামা চলতি মাসে এক রুলিংয়ে জানান, খালিদ শেখ মোহাম্মদ, বালুচি, ওয়ালিদ বিন আতাশ ও মুস্তফা আল-হাওসাউইর বিরুদ্ধে বহুল আলোচিত মামলার আনুষ্ঠানিক বিচারপ্রক্রিয়া নির্ধারিত তারিখে শুরু হবে। শ্রামা হলেন এই মামলার পঞ্চম সামরিক বিচারক। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মামলাটি স্থবির হয়ে ছিল। প্রমাণের আইনি গ্রহণযোগ্যতা, জাতীয় নিরাপত্তার গোপনীয়তা এবং গুয়ানতানামোতে পাঠানোর আগে বন্দিদের নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা স্বীকারোক্তি সাক্ষ্য হিসেবে ব্যবহার করা যাবে কি না—এসব জটিল আইনি আইনি বিতর্কে বিচার থমকে থাকে।
আর এই সব বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু গিয়ে ঠেকেছে বুখারেস্টের সেই গোপন বন্দিশিবিরের বেসমেন্টে, যেখানে অভিযুক্তদের দীর্ঘকাল আঁধারে রেখে নির্যাতন করা হয়েছিল।
২০২৫ সালের এপ্রিলে গুয়ানতানামোর এক সামরিক বিচারক এক ঐতিহাসিক রায়ে জানান, ২০০৭ সালে এফবিআইয়ের কাছে বালুচি যে জবানবন্দি দিয়েছিলেন, তা ছিল সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত এবং আদালতের বিচারে অগ্রহণযোগ্য। সিআইএ হেফাজতে রোমানিয়াসহ বিভিন্ন দেশের গোপন বন্দিশিবিরে তার ওপর চালোনো অমানুষিক, নিষ্ঠুর ও অবমাননাকর আচরণের কারণে ওই স্বীকারোক্তি পুরোটাই কলুষিত ও প্রভাবিত ছিল বলে মত দেন আদালত।
বিচারক আরও বলেন, গুয়ানতানামোয় আনার পর বালুচির শারীরিক বা মানসিক অবস্থার সামান্য পরিবর্তন হলেও, আগের সেই ধারাবাহিক নির্যাতনের স্থায়ী প্রভাব বা ‘লেগারিং টেইন্ট’ মুছে ফেলার জন্য তা যথেষ্ট ছিল না।
রোমানিয়ার এই গোপন আস্তানাটি ছিল ৯/১১-এর পর সিআইএ গঠিত বৈশ্বিক বন্দিশিবির নেটওয়ার্কের একটি অংশ। থাইল্যান্ড, পোল্যান্ড, লিথুয়েনিয়া ও রোমানিয়াজুড়ে পরিচালিত এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে সন্দেহভাজনদের গোপন বিমানে এক দেশ থেকে অন্য দেশে হস্তান্তর ও জিজ্ঞাসাবাদ চালানো হতো, যা আনুষ্ঠানিকভাবে ২০০৯ সালে বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
‘মিডল ইস্ট আই’ পর্যালোচনা করা আদালতের নথি ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, রোমানিয়ার এই বন্দিশিবির ২০০৩ সালের শরতে চালু হয়। তবে ২০০২ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়েই রোমানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সিআইএ এই গোপন চুক্তিতে পৌঁছায়। ২০০৩ সালের জানুয়ারিতেই বুখারেস্টে নিযুক্ত সিআইএ স্টেশন কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা চলছিল—কীভাবে রোমানীয় প্রশাসনকে এই অনৈতিক সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা জানানো যায়।
সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের সায় ছিল
সুইস সিনেটর ডিক মার্টি ২০০৭ সালে কাউন্সিল অব ইউরোপে সিআইএর এই গোপন বন্দিশিবির নেটওয়ার্ক নিয়ে প্রথম ও সবচেয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন জমা দেন। তিনি নিশ্চিত করেছিলেন, রোমানিয়া ও পোল্যান্ডে এসব বন্দিশিবির সক্রিয় ছিল। সাধারণ মানুষ কিছু না জানলেও, দুই দেশেরই সর্বোচ্চ সরকারি মহলের সম্পূর্ণ সায় ও জ্ঞাতসারেই সিআইএ তাদের ভূখণ্ডে অবৈধ কর্মকাণ্ড চালায়।
পরবর্তী সময়ে ‘রেন্ডিশন প্রজেক্ট’-এর গবেষণাতেও স্পষ্ট হয়, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়ন ইলিয়েস্কু কিংবা নিরাপত্তা উপদেষ্টা ইয়ান তালপেশ ছাড়াও পরবর্তী প্রেসিডেন্ট ত্রায়িয়ান বাসিসকুসহ শীর্ষ কর্তারা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
তবে মন্তব্যের জন্য তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বাসিসকুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তার সাড়া মেলেনি। ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে যুক্ত হওয়া নতুন তথ্য বলছে, ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বরে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও বুখারেস্টের সিআইএ প্রধান যৌথভাবে রোমানিয়ার শীর্ষ কর্মকর্তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে এই গোপন অভিযানের বিবরণ দেন, যেখানে বন্দিদের ওপর নির্যাতনের বিস্তারিত তথ্য খোলাখুলি উপস্থাপন করা হয়েছিল।
গবেষণা সংস্থা ‘রেন্ডিশন প্রজেক্ট’-এর সহ-লেখক স্যাম রাফলি ব্ল্যাক সংক্ষেপে স্পষ্ট করেন, ‘নির্যাতনের রোমহর্ষক বিবরণ, বিপুল অঙ্কের গোপন লেনদেন আর নির্দিষ্ট বন্দিদের উপস্থিতির সব তথ্য-প্রমাণই নিশ্চিতভাবে জানান দেয়—এই নৃশংসতার দায় রোমানিয়ার ওপরই বর্তায়।’
