ব্রিকসের যৌথ ঘোষণা
একতরফা শুল্কের নিন্দা, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির প্রত্যাশা
Advertisement
কলকাতা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৮ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ব্রিকসের ১৮তম সম্মেলনে ব্লকটির নেতারা সর্বসম্মতিক্রমে নয়াদিল্লি ঘোষণা-২০২৬ গ্রহণ করেছেন।
এতে কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করে একতরফা শুল্কনীতির সমালোচনা করে বৈশ্বিক বাণিজ্যে ন্যায্যতা ও সমতার কথা বলা হয়েছে। শনিবার এ ঘোষণায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদসহ বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত হালনাগাদের আহ্বান জানানো হয়েছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সর্বসম্মত নথিটি ঘোষণা করেন। এ ঘোষণায় ‘একতরফা যুদ্ধমূলক কর্মকাণ্ড’ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথগুলো এবং নাবিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ব্রিকস পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা বৃদ্ধিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের, বেসামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোর সুরক্ষা এবং স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে সংলাপ ও কূটনীতির আহ্বান জানিয়েছে।
এ ঘোষণায় বিশ্ব বাণিজ্য, সরবরাহ শৃঙ্খল ও জ্বালানির প্রবাহ বজায় রাখারও আহ্বান জানানো হয়েছে। ফিলিস্তিনের গাজার ক্ষেত্রে যুদ্ধবিরতি মেনে চলা, অবাধ মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে।
পাশাপাশি এতে একটি দ্বিরাষ্ট্রিক সমাধান ও ফিলিস্তিনের জন্য জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্য পদের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, দুই দশকে ব্রিকস বিশ্বমঞ্চে নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছে। এখন এ জোট আরও পরিণত হওয়ার পর্যায়ে আছে। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও পরস্পরের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি সম্মান দেখিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে এগিয়ে যেতে হবে। ব্রিকসের ঘোষণাপত্রে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধেও অবস্থান নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা সংশ্লিষ্ট দেশের উন্নয়ন, খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্য এবং মানবাধিকারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে উদ্বেগ জানানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংঘাতের সমাধানে কূটনীতি ও আলোচনার ওপরও জোর দিয়েছে ব্রিকস। সম্মেলনে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে সংস্কারের দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরে মোদি বলেন, নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারে আর দেরি করা চলবে না। দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য পদের দাবি জানিয়ে আসছে ভারত।
সম্মেলনের প্রথম দিন ব্রিকস আলোচনায় বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
মোদি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো। অথচ আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা এখনো সীমিত। তিনি আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোকে একটি পিরামিডের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, পিরামিডের শীর্ষে থাকা কয়েকটি দেশই অধিকাংশ সিদ্ধান্ত নেয়। আর নিচের দিকে থাকা দেশগুলো সেই সিদ্ধান্তের প্রভাব বহন করে। এ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার প্রয়োজন রয়েছে।
নয়াদিল্লির ওই সম্মেলনে আরও অংশ নিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহীম, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোবো সুবিয়ান্তো, মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা, আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান, ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ প্রমুখ।
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ বিশ্বের স্বার্থের পক্ষে না: শি
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সংঘাত নিয়ে এক মন্তব্যে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, পশ্চিম এশিয়ার এ যুদ্ধ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাধারণ স্বার্থের পক্ষে না।
শনিবার ব্রিকস সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন। এনডিটিভি জানিয়েছে, চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমে দেওয়া উদ্ধৃতিতে শি বলেছেন, ‘চীন পশ্চিম এশিয়া ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা অর্জনে যথাযথ ভূমিকা পালনের জন্য ব্রিকসের অন্য সদস্যদের সঙ্গে কাজ করতে ইচ্ছুক। এ যুদ্ধ ওই অঞ্চলজুড়ে জনগণের গুরুতর ক্ষয়ক্ষতির কারণ হচ্ছে; আর এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাধারণ স্বার্থের পক্ষে না।’
তিনি বলেন, ব্রিকস দেশগুলোর উচিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বহুমুখী বাণিজ্য ব্যবস্থাকে সমর্থন করা এবং সব ধরনের সুরক্ষাবাদ প্রত্যাখ্যান করা। ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোকে সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের বিরোধিতা করারও আহ্বান জানান তিনি।
সাত বছর পর ভারতে যাওয়া চীনের প্রেসিডেন্ট ব্রিকস দেশগুলোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে সহযোগিতা গভীর করার আর এই নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে নব শিল্পায়নকে এগিয়ে নেওয়ার একটি উদ্যোগ প্রস্তাব করেন।
শি শনিবার দুপুরে নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপম সম্মেলন কেন্দ্রে শুরু হওয়া ব্রিকস সম্মেলন ২০২৬-এ যোগ দেন। সেখানেই এবারের সম্মেলনের সভাপতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি তাকে স্বাগত জানান। সন্ধ্যায় সম্মেলনের ফাঁকে দুই নেতা এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন।
ব্লকের দেশগুলোর বাণিজ্যে নিজস্ব মুদ্রা চান ইরানের প্রেসিডেন্ট
শুক্রবার ব্রিকস বিজনেস ফোরামে পেজেশকিয়ান বলেন, বিশ্ব বর্তমানে এক জটিল সময় ও ভ‚রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এ জোটের সদস্য দেশগুলোর জন্য পারস্পরিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নিজস্ব মুদ্রা ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসন ও নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করেন।
পেজেশকিয়ান বলেন, ব্রিকসকে এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কোনো দেশ আর্থিক ব্যবস্থার ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে অন্য কোনো দেশের বৈধ বাণিজ্যে ব্যাঘাত ঘটাতে না পারে।
জাকির নায়েকের প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গ আলোচনায় ছিল: আনোয়ার ইব্রাহিম
ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণ করতে ভারতে সফরে থাকা মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বলেছেন, নয়াদিল্লিতে আলোচনার সময় ইসলামি বক্তা জাকির নায়েককে ভারতের প্রত্যর্পণের বিষয়টিও উঠেছিল।
শনিবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করা ইব্রাহিম ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে বলেন, ‘ব্যক্তিগত আলোচনায় অবশ্যই এসব বিষয় নিয়ে কথা চলতে থাকে।’
তিনি এও বলেন, ‘আমরা মনে করছি, উভয় দেশের স্বার্থ রক্ষায় বিষয়টি অত্যন্ত গোপন রাখা উচিত। তবে দুই দেশের মধ্যে আস্থা ও সম্পর্ক বজায় রাখার স্বার্থে আমরা অবশ্যই এটিকে অগ্রাধিকার তালিকায় রেখেছি।’
জাকির নায়েকের ভারতে প্রত্যর্পণ বিষয়ে আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, ‘এ বিষয়ে (প্রত্যর্পণের দাবি) আমাদের কিছুটা বোঝাপড়া রয়েছে। কিন্তু আমাদের এটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে করতে হবে। আইনের শাসন এবং এ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্বকে সম্মান করতে হবে।’
