নতুন বিশ্ব মানচিত্রে ভারতসহ ৩ দেশ কেন উদ্বিগ্ন?
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪১ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গত সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নতুন বিশ্ব মানচিত্র ব্যবহারে উৎসাহিত করার পক্ষে ভোট দিয়েছে। এসব মানচিত্রে মহাদেশগুলোর প্রকৃত আয়তন তুলনামূলকভাবে আরও সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
আফ্রিকান ইউনিয়নের কয়েক মাসের প্রচারণার পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেই আফ্রিকান ইউনিয়ন একটি মানচিত্রের প্রস্তাবনা দেয়। জাতিসংঘের মোট ১৬৪টি দেশ এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয় এবং ৬টি দেশ এর বিপক্ষে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র দেশ যারা প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেছে। ভোটাভুটির আগে দেশটির কূটনীতিবিদ ইয়ারিনা ফেরেনসেভিজ বলেন, এ ধরনের প্রস্তাবের কারণেই সংস্থাটি তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোতে মনোযোগ দেওয়ার পরিবর্তে তারা ১৬ শতকের মানচিত্র নিয়ে আলোচনা করছে। তবে প্রস্তাবটি অনুমোদনের পরও অন্তত তিনটি দেশ— ভারত, ইউক্রেন ও জাপান মানচিত্রে আনা পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
নতুন মানচিত্র প্রক্ষেপণের বিষয়ে দেশ তিনটি সরাসরি বিরোধিতা করছে না। তবে বিতর্কিত কিছু ভূখণ্ডকে মানচিত্রে কীভাবে উপস্থাপন করা হবে তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
কেন নতুন মানচিত্র?
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বিশ্ব মানচিত্রে মার্কেটর প্রক্ষেপণের পরিবর্তে ইকুয়াল আর্থ প্রক্ষেপণ ব্যবহারে উৎসাহ দিয়ে একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। মার্কেটর প্রক্ষেপণ বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বহুল ব্যবহৃত মানচিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম।
তবে এই প্রস্তাবের মাধ্যমে মার্কেটর প্রক্ষেপণ নিষিদ্ধ করা হয়নি কিংবা কোনো নির্দিষ্ট মানচিত্র ব্যবহারে বাধ্য করা হয়নি। বরং দেশগুলোকে ইকুয়াল আর্থ মানচিত্র ব্যবহারে উৎসাহিত করা হয়েছে। ২০১৮ সালে তিনজন গবেষক এই মানচিত্রের নকশা করেছিলেন।
ফ্লেমিশ মানচিত্রকার জেরার্ডাস মার্কেটর ১৫৬৯ সালে মার্কেটর প্রক্ষেপণ তৈরি করেন। সে সময় পশ্চিমা দেশগুলো নতুন নতুন অঞ্চল দখল ও জয়ের প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত ছিল। ত্রিমাত্রিক পৃথিবীকে দ্বিমাত্রিক সমতলে দেখানোর চেষ্টা থেকেই এই মানচিত্রের নকশা তৈরি হয়।
দীর্ঘদিন ধরে মানচিত্র বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন, মার্কেটর প্রক্ষেপণে আফ্রিকা মহাদেশের প্রকৃত আয়তন তুলনামূলকভাবে অনেক ছোট করে দেখানো হয়। একইভাবে উন্নয়নশীল দেশের আয়তনও অনেক ছোট করে দেখানো হয়। বিপরীতে, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক বড়ো মনে হয়।
নতুন মানচিত্র নিয়ে ইউক্রেনের উদ্বেগ কেন?
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে (ইউএনজিএ) নতুন মানচিত্র অনুমোদনের ভোটে বিরত থাকা ছয়টি দেশের একটি ছিল ইউক্রেন। একই ভোটে ইউক্রেনের প্রতি সংহতি জানিয়ে বিরত ছিল এস্তোনিয়া, জর্জিয়া, মলদোভা, সার্বিয়া ও লিথুয়ানিয়াও।
ইউক্রেনের অভিযোগ, নতুন মানচিত্রে ব্যবহৃত ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন রাশিয়ার দখলে থাকা ক্রিমিয়া উপদ্বীপকে ইউক্রেনের মূল ভূখণ্ডের তুলনায় আলাদা ও অপেক্ষাকৃত হালকা রঙে দেখানো হয়েছে।
২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া অবৈধভাবে ক্রিমিয়া দখল করে এবং পরে নিজেদের ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার ঘোষণা দেয়। নতুন মানচিত্রে ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকেও আলাদা রঙে দেখানো হয়েছে। তবে উপদ্বীপটির হলদেটে রঙটি ইউক্রেনের চেয়ে রাশিয়ার মানচিত্রের রঙের সঙ্গেই বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ।
জাতিসংঘে ইউক্রেনের স্থায়ী প্রতিনিধি আন্দ্রি মেলনিক বলেন, খসড়া প্রস্তাবে যে মূল বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে নীতিগতভাবে ইউক্রেন তার বিরোধিতা করে না।
মেলনিক বলেন, ভোটের আগে মানচিত্রে প্রয়োজনীয় সংশোধনের জন্য কিয়েভ অনুরোধ জানিয়েছিল। কিন্তু তাতে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।
তার মতে, নতুন এই মানচিত্র ভবিষ্যতে প্যান্ডোরার বাক্স খুলে দেওয়ার মতো ঘটনা হতে পারে। এর ফলে বিশ্ব মানচিত্রের অপব্যবহার ও বিকৃতির সুযোগ তৈরি হবে।
মেলনিক আরও বলেন, ভৌগোলিকভাবে দেশ ও মহাদেশের উপস্থাপনায় কোনো ঐতিহাসিক অবিচার সংশোধনের চেষ্টা করতে গিয়ে যদি খসড়া প্রস্তাবের ভাষার এমন একটি গভীর উদ্বেগজনক ব্যাখ্যার সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে সেটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের জন্য একটি মারাত্মক ভুল হবে।
জাপানের দাবি কী?
এদিকে বৃহস্পতিবার জাপান জানিয়েছে, নতুন মানচিত্রের পক্ষে ভোট দিলেও ইকুয়াল আর্থ প্রক্ষেপণে সংশোধন আনার অনুরোধ জানিয়েছেন তারা। টোকিওর অভিযোগ, মানচিত্রটিতে রাশিয়ার ভূখণ্ড এবং বিতর্কিত কুরিল দ্বীপপুঞ্জকে একই রঙে দেখানো হয়েছে।
কুরিল দ্বীপপুঞ্জের চারটি দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাশিয়া ও জাপানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ রয়েছে। রাশিয়ায় দ্বীপপুঞ্জগুলো দক্ষিণ কুরিল এবং জাপানে উত্তর ভূখণ্ড নামে পরিচিত।
কাশ্মীর নিয়ে ভারতের অস্বস্তি কেন?
ভারতও ইকুয়াল আর্থ প্রেক্ষাপণের পক্ষে ভোট দিয়েছে। তবে রোবরার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিতর্কিত সীমান্ত অঞ্চল কাশ্মীরকে কিভাবে দেখানো হয়েছে সে বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কাশ্মীর নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এর আগে এই অঞ্চলটি ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ছিল। এরপরে অনেকবার ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে এই অঞ্চল নিয়ে যুদ্ধও হয়।
সূত্র: আল-জাজিরা।


-6aa7ffa5616e7.jpg)
