সৌদি-ইরান সংঘাত: কোন পথে হাঁটবে পাকিস্তান?
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৭ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সৌদি আরব ও ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ায় কঠিন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে পাকিস্তান। এতে রিয়াদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখা এবং তেহরানের সঙ্গে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা ধরে রাখার ইসলামাবাদের প্রচেষ্টা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বছরের বেশিরভাগ সময় পাকিস্তান সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের পাশাপাশি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। তবে সাম্প্রতিক সংঘাতের তীব্রতা ইসলামাবাদের জন্য এই ভারসাম্য রক্ষা আরও কঠিন করে তুলেছে।
পাকিস্তানের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে, কারণ সম্প্রতি সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে দেশটির প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব সম্প্রসারিত হয়েছে। ত্রিপক্ষীয় ওই চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
পাকিস্তান জ্বালানি ও বাণিজ্যপথের ওপরও নির্ভরশীল, যেগুলো ইরান ও হুথিদের কারণে বিঘ্নিত হতে পারে। তাই সংঘাত যাতে আর না বাড়ে, সে বিষয়ে ইসলামাবাদ বিশেষভাবে সতর্ক।
প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি নিয়ে নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ
সাম্প্রতিক সংঘাত সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের নিরাপত্তা অংশীদারত্বের জন্য নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
সৌদি আরব-ইয়েমেন সীমান্তের কাছে ইতোমধ্যে পাকিস্তানি সেনারা মোতায়েন রয়েছে। এর আগে দ্বিপক্ষীয় সামরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার জন্যও পাকিস্তান পরিচিত ছিল।
তাই এই সংঘাতের কারণে পাকিস্তান আগের তুলনায় আরও জটিল পরিস্থিতিতে পড়বে। এর আগে ইরান সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালালেও বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন মাত্রার চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
সংঘাত আরও তীব্র হলে এবং রিয়াদ পাকিস্তানের কাছে আরও সামরিক সহায়তা চাইলে, ইসলামাবাদকে তার নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে বলে প্রত্যাশা করা হবে। তবে এ ধরনের পদক্ষেপ তেহরানের সঙ্গে ইতিবাচক কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার পাকিস্তানের কৌশলের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।
ভারতের সঙ্গে সীমান্তে উত্তেজনা এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে অন্যান্য নিরাপত্তা ইস্যুর কারণে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী বর্তমানে বেশ চাপের মধ্যে রয়েছে। তাই উপসাগরীয় অঞ্চলে দায়িত্ব ও প্রতিশ্রুতি আরও বাড়ানো হলে তা পাকিস্তানের জন্য কূটনৈতিক ও রসদগত উভয় দিক থেকেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
ইরানকে সতর্ক করলেও সংলাপের পক্ষে পাকিস্তান
পাকিস্তান নিরপেক্ষ অবস্থান নেওয়ার পর্যায়ে যাওয়ার আগেই সংকটটি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে মনে হচ্ছে।
ইসলামাবাদ ইরানের কাছে সৌদি আরবের একটি সতর্কবার্তা পৌঁছে দিয়েছে। এতে ইরানকে তার মিত্র হুথিদের সংযত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সময়ে পাকিস্তানের সামরিক নেতারা তাদের ইরানি সমকক্ষদের সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছেন।
তবে পাকিস্তান সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করলে এর প্রভাব শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এতে পাকিস্তানও পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের সীমান্তে উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকার সীমাবদ্ধতা
পাকিস্তানের বিস্তৃত কূটনৈতিক ভূমিকা নিয়ে এমন কিছু প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে যে, ইসলামাবাদ অঞ্চলটির প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর মধ্যকার বিরোধে মধ্যস্থতা করতে পারে। তবে মধ্যস্থতার জন্য উভয় পক্ষের কাছেই বিশ্বাসযোগ্যতা থাকা জরুরি।
ইসলামাবাদের কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রশংসা করলেও ইরান সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে পারে। এখানেই তৈরি হয়েছে একটি বৈপরীত্য।
একদিকে, সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাকিস্তানের গুরুত্বের অন্যতম কারণ হলো উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা। অন্যদিকে, একই বিষয়গুলো তেহরানের কাছে ইসলামাবাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করতে পারে।
ঝুঁকি হলো, পাকিস্তান যদি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে এই কূটনৈতিক সুবিধা হারাতে পারে।
মধ্যস্থতাকারী থেকে যোদ্ধা
কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততার মধ্যে পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান সংঘাতে নিজের অবস্থান না বদলিয়েও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।
কিন্তু সামরিক গোয়েন্দা তথ্য, আকাশ প্রতিরক্ষা ও সামরিক অভিযানে সহায়তা দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এ ধরনের পদক্ষেপ পাকিস্তানকে সংঘাতে মধ্যস্থতাকারী একটি পক্ষ থেকে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি পক্ষের পরিণত করতে পারে।
এর ফলে তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা ইসলামাবাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে এবং পাকিস্তানের নিজস্ব স্বার্থও হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বাড়াতে পাকিস্তানের অনাগ্রহের পেছনেও একই ধরনের যুক্তি রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে—এমন বিস্তৃত সামরিক চুক্তিতে ইসলামাবাদ আপত্তি জানিয়েছে বলে জানা গেছে।
এরপর কী হতে পারে?
সংঘাত যতক্ষণ পর্যন্ত তা সম্ভব হতে দেবে, পাকিস্তান সম্ভবত মধ্যপন্থা অবলম্বনের চেষ্টা চালিয়ে যাবে।
এর অর্থ হলো, সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বজায় রাখা, তবে হুথি ও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলায় সরাসরি জড়িয়ে না পড়া।
তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। বিশেষ করে ইসলামাবাদ যদি মনে করে, সৌদি আরবের সঙ্গে তার সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে ইরানকে সংযত হওয়ার জন্য প্রভাবিত করা সম্ভব।
তবে সংকট আরও গভীর হলে পাকিস্তানের কূটনৈতিকভাবে কৌশল বদলানোর সুযোগ কমে যাবে।
সৌদি ভূখণ্ডে সরাসরি হামলা, গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস কিংবা বড় ধরনের সামরিক সহায়তার আহ্বান পাকিস্তানের ওপর হস্তক্ষেপের চাপ বাড়াবে।
তখন ইসলামাবাদকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, সৌদি আরবের সঙ্গে জোটের কৌশলগত গুরুত্ব ইরান ও তার মিত্রদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকির তুলনায় কতটা মূল্যবান।
প্রভাব ও বিশ্লেষণ
পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, অত্যন্ত মেরুকৃত একটি অঞ্চলে পরস্পরবিরোধী শক্তিগুলোর সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কী ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে।
পাকিস্তান তার কৌশলগত অবস্থানকে একদিকে ইরান ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে প্রভাব তৈরির হাতিয়ার হিসেবে, অন্যদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে সামরিক সম্পর্কের মাধ্যমে দেশটির সঙ্গে ওয়াশিংটনের সেতুবন্ধ হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করেছে।
তবে বর্তমানে একই সম্পর্কগুলো থেকেই পাকিস্তানের সামনে পরস্পরবিরোধী প্রত্যাশা তৈরি হচ্ছে।
প্রশ্নটি হওয়া উচিত, পাকিস্তান সৌদি আরব নাকি ইরানের পক্ষ নিচ্ছে, তা নয়; বরং প্রশ্ন হলো, উভয় পক্ষের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ থাকার মতো পর্যাপ্ত কৌশলগত স্বাধীনতা পাকিস্তান ধরে রাখতে পারছে কি না।
এই মুহূর্তে এর উত্তর ইতিবাচক। তবে তা সম্ভব হবে কেবল তখনই, যদি পাকিস্তান তার সামরিক সম্পৃক্ততা সীমিত রাখে এবং কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেয়।
এই সংঘাতে পাকিস্তান সরাসরি সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আমূল বদলে যাবে। এতে পাকিস্তানের কূটনৈতিক গুরুত্ব কমবে, দেশটির সেনাবাহিনী আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং পশ্চিম সীমান্তে নতুন নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হবে।
পাকিস্তান চাইলে সৌদি আরবের সঙ্গে তার সামরিক সম্পর্ককে সামরিক হস্তক্ষেপের অজুহাত হিসেবে নয়, বরং কূটনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
শেষ পর্যন্ত মূল বার্তা হলো, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে ওঠার সঙ্গে কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। উপসাগরীয় অংশীদারদের প্রতি ইসলামাবাদ যত বেশি নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নেবে, এসব অংশীদার ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়ালে পাকিস্তানের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তত কমে যাবে।
এই সংকট শুধু পাকিস্তানের সামরিক সম্পৃক্ততার সক্ষমতাকেই পরীক্ষার মুখে ফেলছে না, বরং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার দেশটির সামগ্রিক কৌশলকেও পরীক্ষার মুখে ফেলছে।
পাকিস্তানের ইসলামাবাদভিত্তিক গবেষক উমাইর খানের নিবন্ধ
