Logo
Logo
×
   

Advertisement

আন্তর্জাতিক

হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলছে, ঝুঁকিতে ভারতের অর্থনীতি

Advertisement

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫২ এএম

হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলছে, ঝুঁকিতে ভারতের অর্থনীতি

হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ায় অঞ্চলটির হিমবাহজাত হ্রদগুলো ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে।

Advertisement

হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ায় অঞ্চলটির হিমবাহজাত হ্রদগুলো ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই পার্বত্য অঞ্চল একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা।

সম্প্রতি নেপাল ও তিব্বতে ভয়াবহ বন্যায় ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানি এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনার পর প্রকাশিত এক নতুন গবেষণায় এ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। গবেষকদের মতে, দ্রুত পরিবর্তিত জলবায়ু হিমালয় অঞ্চলে পরিবেশগত ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে তুলছে।

বৈশ্বিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সিস্টেমিকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক দশক আগের তুলনায় বর্তমানে হিমালয়ের হিমবাহগুলো ৬৫ শতাংশ দ্রুত হারে আকার হারাচ্ছে। ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ইনিশিয়েটিভের সঙ্গে যৌথভাবে প্রস্তুত করা এ গবেষণায় কারিগরি সহযোগিতা দিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিমড) এবং জি বি পন্ত ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হিমালয়ান এনভায়রনমেন্ট।

তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, হিমালয়-কারাকোরাম অঞ্চলের প্রায় ৪০ হাজার হিমবাহের মধ্যে মাত্র ২১টির বিস্তারিত ও ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে গবেষণাটি করা হয়েছে। ফলে বহু হিমবাহের প্রকৃত অবস্থা এখনো পর্যবেক্ষণের বাইরে রয়েছে। গবেষকদের আশঙ্কা, দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি নজরের আড়ালেই থেকে যেতে পারে।

হিমবাহ গলে যাওয়ার ফলে সেসব স্থানে বড় বড় হ্রদের সৃষ্টি হচ্ছে, যেগুলো সাধারণত ভঙ্গুর পাথর ও বরফের বাঁধ দিয়ে আটকে থাকে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে পারমাফ্রস্ট বা স্থায়ীভাবে জমাট মাটি এবং উচ্চ পার্বত্য ঢালগুলোও দুর্বল হয়ে পড়ছে। এতে ভূমিধস, আকস্মিক বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে।

ভারতে ইতোমধ্যে এই ঝুঁকির প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দেশটির মোট ভূখণ্ডের প্রায় ১৮ শতাংশ হিমালয় অঞ্চলে হলেও প্রায় ৩৫ শতাংশ দুর্যোগ এই এলাকাতেই ঘটে। ভারত সরকার জানিয়েছে, ২০২৫ সালে মূল্যায়ন করা ১৮৯টি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হ্রদের মধ্যে ৫৬টিকে ‘অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এ ছাড়া ১০ হেক্টরের বেশি আয়তনের ২ হাজার ৪৮৫টি হিমবাহজাত হ্রদ বর্তমানে ভারতের কেন্দ্রীয় পানি কমিশনের পর্যবেক্ষণে রয়েছে।   

হিমবাহজাত হ্রদ ভেঙে সৃষ্ট দুর্যোগের ভয়াবহতা অতীতেও দেখা গেছে। ২০২৩ সালে সিকিমে একটি হিমবাহজাত হ্রদের আকস্মিক প্লাবনে অন্তত ৭০ জন নিহত হন এবং সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে ব্যাপক ক্ষতি হয়। ২০২১ সালে উত্তরাখণ্ডে একই ধরনের আরেকটি দুর্যোগে ২০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঝুঁকি শুধু বড় ধরনের বন্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হিমালয় দক্ষিণ এশিয়ার বিশাল নদী ব্যবস্থার উৎস, যা কোটি কোটি মানুষের পানির চাহিদা পূরণ করে। আইসিমডের তথ্য অনুযায়ী, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের অধিকাংশ নদী অববাহিকায় এই শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে হিমবাহ গলিত পানির প্রবাহ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। এরপর হিমবাহের ভর কমতে থাকায় পানির প্রবাহও হ্রাস পাবে।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, হিমালয় থেকে আসা পানির ওপর ভারতের অর্থনীতির বড় একটি অংশ নির্ভরশীল। দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এই পানি সম্পদের সঙ্গে সম্পর্কিত। গম, ধান, চা উৎপাদন, জলবিদ্যুৎ এবং তীর্থভিত্তিক অর্থনীতি এ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ লর্ড নিকোলাস স্টার্ন হিমালয়কে ‘তৃতীয় মেরু’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, আর্কটিক বা অ্যান্টার্কটিকার বিপরীতে এই অঞ্চলের নিচে শত শত মিলিয়ন মানুষ বসবাস করে। তাই এখানকার পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হলে তার প্রভাব সরাসরি মানুষের জীবন ও অর্থনীতির ওপর পড়বে।

গবেষণায় হিমবাহ গলনের অন্যতম কারণ হিসেবে ব্ল্যাক কার্বন দূষণের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। সিস্টেমিকের মতে, হিমালয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হিমবাহ গলনের জন্য দায়ী এই দূষণ, যার বড় অংশ সমতল এলাকার ইটভাটা থেকে উৎপন্ন হয়। তুষার ও বরফের ওপর জমে থাকা কালো কণাগুলো বেশি সূর্যালোক শোষণ করে, ফলে গলন প্রক্রিয়া দ্রুততর হয়।

প্রতিবেদনের প্রধান লেখক ও সিস্টেমিকের সিনিয়র ডিরেক্টর অরুশি চোপড়া বলেন, ‘হিমালয় একটি সংকটজনক মোড়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে লাখ লাখ মানুষের জীবন ও জীবিকা ঝুঁকির মুখে। এক দশক আগের তুলনায় হিমবাহ এখন অনেক দ্রুত গলছে।’

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় গবেষণায় ১০টি অগ্রাধিকারভিত্তিক পদক্ষেপের সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্ল্যাক কার্বন নির্গমন কমানো, হিমবাহ পর্যবেক্ষণ সম্প্রসারণ, দুর্যোগের আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা উন্নত করা, দুর্যোগ প্রস্তুতি জোরদার করা এবং পাহাড়ি অঞ্চলে টেকসই পর্যটন ব্যবস্থার উন্নয়ন।

গবেষকদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষা, আগাম সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা এবং সীমান্তপারের তথ্য বিনিময় এখন সময়ের দাবি। কারণ হিমালয় অঞ্চলের দুর্যোগ কোনো একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

আইসিমডের মহাপরিচালক পেমা গ্যাৎসো বলেন, ‘হিমবাহের আকার কমছে, বরফ গলছে এবং উচ্চ পার্বত্য ঢালগুলো আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। ফলে ভাটির জনপদ ও অবকাঠামো ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে পড়ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের বিপদ জাতীয় সীমানা মানে না। কোনো একক দেশ একা এসব ঝুঁকি মোকাবিলা করতে পারবে না। জীবন ও জীবিকা রক্ষায় সীমান্তপারের সহযোগিতা, তথ্য বিনিময় এবং যৌথ বিনিয়োগ এখন অত্যন্ত জরুরি।’

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম