ইরানে ভূপাতিত মার্কিন পাইলটকে উদ্ধারের গল্পে ‘বিজয়ের’ বার্তা খুঁজছে ওয়াশিংটন?
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:০৫ পিএম
ইরান যুদ্ধে ভূপাতিত এক মার্কিন পাইলটকে উদ্ধারের অভিযানকে বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে ওয়াশিংটন।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর প্রায় সাত মাস পর ভূপাতিত এক মার্কিন পাইলটকে উদ্ধারের অভিযানকে বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে ওয়াশিংটন। তবে সমালোচকদের মতে, এটি কেবল একটি সফল উদ্ধার অভিযান নয়; বরং যুদ্ধের প্রকৃত ফলাফল নিয়ে প্রশ্নের মুখে থাকা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য ‘বিজয়ের গল্প’ নির্মাণের প্রচেষ্টা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ধারণা করেছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক, বিমান ও প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব দ্রুতই যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেবে এবং ইরানকে ওয়াশিংটনের শর্ত মানতে বাধ্য করবে। কিন্তু দীর্ঘ সাত মাস পরও যুদ্ধের কৌশলগত লক্ষ্য কতটা অর্জিত হয়েছে, সে প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না।
এমন প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রশাসন সম্প্রতি ইরানের ভেতরে ভূপাতিত এক মার্কিন যুদ্ধবিমানের পাইলটকে উদ্ধারের অভিযান নিয়ে বিস্তারিত ভিডিও ও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে বিশেষ বাহিনীর অভিযান, সামরিক বিমান, আহত পাইলট এবং দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পরিচালিত জটিল উদ্ধার তৎপরতাকে নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই বর্ণনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আড়ালে চলে যাচ্ছে—উদ্ধার অভিযানের আগে মার্কিন যুদ্ধবিমানটি ইরানের ভূখণ্ডে ভূপাতিত হয়েছিল। তাদের প্রশ্ন, যুদ্ধের মূল লক্ষ্য অর্জনের বদলে কেন একটি উদ্ধার অভিযানকে এত গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হচ্ছে?
প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, পাইলটের পিঠ, হাত ও কাঁধে গুরুতর আঘাত ছিল। একই সঙ্গে দাবি করা হয়েছে, দুর্ঘটনার পর তিনি প্রায় সাত হাজার ফুট উচ্চতার একটি পাহাড়ি রিজে পৌঁছাতে সক্ষম হন। এই দুই তথ্যের মধ্যে কিছু অসঙ্গতি রয়েছে বলে সমালোচকদের ধারণা। তাদের মতে, ঘটনাটি বাস্তবতার সম্পূর্ণ চিত্র নাকি একটি ‘নায়কোচিত’ বর্ণনা—সেই প্রশ্নও উঠছে।
তবে উদ্ধার অভিযানের জটিলতা বা দক্ষতা নিয়ে খুব বেশি বিতর্ক নেই। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, একটি সফল সামরিক অভিযান আর পুরো যুদ্ধের বিজয় এক বিষয় নয়। তাদের ভাষ্য, যখন একটি উদ্ধার অভিযানকে পুরো যুদ্ধের সাফল্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়, তখন সেটি রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমভিত্তিক বর্ণনার অংশ হয়ে ওঠে।
মার্কিন জনমতের সাম্প্রতিক জরিপগুলোও ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কুইনিপিয়াক ইউনিভার্সিটির এক জরিপে ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান এর ব্যয়ের তুলনায় সার্থক ছিল না। মাত্র ৩৪ শতাংশ এর বিপরীত মত দিয়েছেন। একই জরিপে ৪৫ শতাংশ মনে করেন, এই যুদ্ধের ফলে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল হয়েছে; বিপরীতে শক্তিশালী হয়েছে বলে মনে করেন ৩৩ শতাংশ।
অন্যদিকে সিবিএস ও ইউগভের এক জরিপে ৬৯ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, যুদ্ধটি এর খরচের তুলনায় মূল্যবান ছিল না। ৫৭ শতাংশের মতে, এই যুদ্ধ সমাধানের চেয়ে নতুন সমস্যাই বেশি সৃষ্টি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এসব পরিসংখ্যান গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখতে প্রশাসনের প্রয়োজন এমন একটি বর্ণনা, যেখানে যুদ্ধকে ব্যর্থ বা ব্যয়বহুল উদ্যোগ হিসেবে নয়, বরং সফল ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা যাবে।
এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ভূপাতিত এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের ক্রুদের জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘৬০ মিনিটস’-এ উপস্থিত করাতে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের দপ্তর সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিল। যদিও পেন্টাগন এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, অংশগ্রহণ সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবী ছিল।
সমালোচকদের মতে, এসব ঘটনাকে একসঙ্গে বিবেচনা করলে এটি কেবল একজন সেনাসদস্যের গল্প থাকে না; বরং রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমভিত্তিক একটি বর্ণনায় পরিণত হয়। সেখানে ভূপাতিত যুদ্ধবিমান পেছনে চলে যায়, আহত পাইলট নায়ক হয়ে ওঠেন এবং উদ্ধার অভিযান শক্তির প্রতীক হিসেবে সামনে আসে।
তাদের প্রশ্ন, যদি যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই যুদ্ধে বড় ধরনের কৌশলগত বিজয় অর্জন করে থাকে, তাহলে সেই অর্জনের প্রমাণ কোথায়? ইরান কি ওয়াশিংটনের প্রধান দাবিগুলো মেনে নিয়েছে? আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য কি স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে বদলেছে? যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও মানবিক খরচ কি যুক্তিযুক্ত হয়েছে?
আগস্টে রয়টার্স ও ইপসোসের এক জরিপে ট্রাম্পের কাজের প্রতি সন্তুষ্টি নেমে আসে ৩৩ শতাংশে, যা তখন পর্যন্ত তার প্রেসিডেন্সির সর্বনিম্ন পর্যায়। একই সঙ্গে অনেক মার্কিন নাগরিক যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এ কারণেই পাইলট উদ্ধারের ঘটনাকে ঘিরে তৈরি করা ভিডিও ও প্রচারণা কেবল একটি সামরিক সাফল্যের গল্প নয়; বরং যুদ্ধের অর্থ ও সাফল্যকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার প্রচেষ্টা। তাদের দাবি, যুদ্ধক্ষেত্রে দৃশ্যমান কৌশলগত বিজয় না থাকলে একটি উদ্ধার অভিযানকে বিজয়ের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা সহজ, কিন্তু তা যুদ্ধের সামগ্রিক ফলাফল বদলে দিতে পারে না।
তাদের ভাষায়, ভূপাতিত যুদ্ধবিমান এখনও ভূপাতিতই রয়েছে, যুদ্ধের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য এখনও বিদ্যমান, আর জনমনে যুদ্ধ নিয়ে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তা কয়েক মিনিটের নাটকীয় ভিডিও দিয়ে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।
সূত্র: মেহের নিউজ এজেন্সি

