এনডিটিভির বিশ্লেষণ
বরফ গলছে ভারত-চীন সম্পর্কের, নেপথ্যে যা রয়েছে
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০৮ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
২০২০ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পর প্রায় পাঁচ বছর কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক স্থবির থাকার পর অবশেষে ভারত ও চীন সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে।
২০২৫ সালের আগস্টে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তিয়ানজিনে এসসিও শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে চীন সফর করেন, যা ছিল ২০১৮ সালের পর দেশটিতে তার প্রথম সফর। এরপর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ভারত সফর করেন।
এশিয়ার দুই অর্থনৈতিক পরাশক্তির শীর্ষ নেতাদের এই মেলামেশা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
নতুন দর কষাকষি ও কূটনৈতিক কৌশল
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রশাসনের নীতির কারণে বিশ্ব রাজনীতিতে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তাতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্থিতিশীল করার এটিই মোক্ষম সময় বলে মনে করছে দিল্লি ও বেইজিং।
সীমান্ত সমস্যা থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতা—সব বিষয় নিয়েই বর্তমানে উভয় দেশের মধ্যে একটি জটিল দরকষাকষি চলছে।
ভারতের পক্ষ থেকে মূলত তিনটি বড় দাবি উত্থাপন করা হয়েছে: সীমান্তে শান্তি বজায় রাখা, ন্যায্য বাজার সুবিধা বা বাণিজ্য ঘাটতি দূর করা এবং সাপ্লাই চেইনের নিরাপত্তা। অন্যদিকে, চীন তিব্বত ও তাইওয়ানের মতো ইস্যুতে ‘এক চীন’ নীতি জোরালোভাবে মেনে নেওয়ার জন্য ভারতকে চাপ দিচ্ছে এবং স্থিতিশীল সীমান্তের বিনিময়ে বাড়তি অর্থনৈতিক সুবিধা দাবি করছে।
বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে চীনের যুক্তি হলো, ভারতের ‘চীন থেকে সরে আসার’ কৌশল ব্যর্থ হয়েছে, কারণ দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য রেকর্ড ১৫৫.৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। তবে ভারতের পালটা যুক্তি হলো, অভ্যন্তরীণ চাহিদা তৈরি করতে না পারা এবং রপ্তানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতার কারণে চীনের অর্থনীতি বর্তমানে প্রচণ্ড চাপের মধ্যে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক যখন নড়বড়ে, তখন ভারতীয় বাজার ধরে রাখা দেশটির জন্য খুবই জরুরি।
‘পারস্পরিক ছাড়’-এর সীমাবদ্ধতা
চীনকে আশ্বস্ত করতে ভারত ইতোমধ্যে বিনিয়োগ নীতি সংশোধন এবং সরাসরি ফ্লাইট চালুর মতো বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে তাইওয়ান ও তিব্বত ইস্যুতে চীনকে শক্ত হাতে প্রতিহত করছে ভারত।
ভারত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, ১৯৬৩ সাল থেকে জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখের ভারতীয় ভূখণ্ড অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে চীন। এর জবাবে ভারত সম্প্রতি অরুণাচল প্রদেশের ২৭টি জায়গার নতুন নামকরণও করেছে।
অন্যদিকে, সীমান্ত বিরোধের স্থায়ী সমাধান না হলেও বিগত দুই বছরে সীমান্তে ‘বাফার জোন’ তৈরি এবং সংকট ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বেশ অগ্রগতি হয়েছে। কৈলাশ মানসসরোবর যাত্রা পুনরায় শুরু এবং নদী সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান চালুর মাধ্যমে বেইজিংও কিছুটা সদিচ্ছা দেখিয়েছে।
ব্রিকস ও নতুন ঐকমত্য
এদিকে ডলারমুক্তকরণ বা জ্বালানি নিরাপত্তার মতো ভূরাজনৈতিক ইস্যুতে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও, বৈশ্বিক অস্থিরতার মুখে ভারত ও চীন নতুন এক ঐকমত্যে পৌঁছেছে। তাদের মূল বার্তা হলো—সব মতপার্থক্য দূর না করেও বৃহত্তর স্বার্থে প্রতিদ্বন্দ্বীরাও একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
তবে চীনের হাতে ব্রিকসের দায়িত্ব যাওয়া এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর মতো বিষয়গুলোতে ভবিষ্যতে এই দুই দেশের মধ্যকার বোঝাপড়া বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে পড়বে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, ট্রাম্প প্রশাসনের অনিশ্চয়তা এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কারণে দুই দেশের সম্পর্ক দ্রুত বদলে যাচ্ছে। তবে নিজের লাভ নিশ্চিত করে দেশ দুটি প্রতিপক্ষকে কতটুকু ছাড় দেবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়।

