জিন্নাহর চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে শুটিংয়ে কেন কেঁদেছিলেন ক্রিস্টোফার লি
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৪৩ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পাকিস্তানের টেলিভিশন ও মঞ্চে দেশটির প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর চরিত্রে অনেক অভিনেতাই অভিনয় করেছেন। তবে হলিউড অভিনেতা ক্রিস্টোফার লি ‘জিন্নাহ’ ছবিতে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতার চরিত্রে যে অভিনয় করেছেন, তা এখনও অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
১৯৯৮ সালে মুক্তি পাওয়া পাকিস্তান ও যুক্তরাজ্যের যৌথ প্রযোজনার ‘জিন্নাহ’ ছবিটি পরিচালনা করেন জামিল দেহলভি। ছবিটির চিত্রনাট্য লিখেছেন জামিল দেহলভি ও ড. আকবর এস আহমেদ। প্রযোজকও ছিলেন ড. আকবর এস আহমেদ।
‘ড্রাকুলা’ ধারাবাহিকে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে খ্যাতি পাওয়া এবং জেমস বন্ড সিরিজের ‘দ্য ম্যান উইথ দ্য গোল্ডেন গান’ ছবিতে স্কারামাঙ্গার চরিত্রে অভিনয় করা ক্রিস্টোফার লিকে জিন্নাহর চরিত্রে বেছে নেওয়ার ঘটনাটিও ছিল বেশ চমকপ্রদ।
যেভাবে জিন্নাহর চরিত্রে সুযোগ পেলেন ক্রিস্টোফার লি
ক্রিস্টোফার লি তার স্মৃতিকথা ‘লর্ড অব মিসরুল’-এ লিখেছেন, ১৯৯৭ সালে লন্ডনে পাকিস্তানের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ড. আকবর এস আহমেদ ও জামিল দেহলভি তাকে জিজ্ঞেস করেন, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সম্পর্কে তিনি কী জানেন।
জবাবে লি বলেন, জিন্নাহ পাকিস্তান নামে একটি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার কাছে জিন্নাহ ছিলেন অসাধারণ দৃঢ়সংকল্প ও প্রখর বুদ্ধিমত্তার অধিকারী একজন ব্যক্তি।
এরপরই তাকে প্রস্তাব দেওয়া হয়, ‘আমরা চাই, আপনি জিন্নাহর চরিত্রে অভিনয় করুন।’
প্রস্তাবটি লির কাছে ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত। পরে তিনি ধারণা করেন, জিন্নাহর উচ্চতা ও শারীরিক গঠনের সঙ্গে তার কিছুটা মিল থাকাও তাকে নির্বাচনের অন্যতম কারণ হতে পারে।
চরিত্রের প্রস্তুতি, বদলেছে চিত্রনাট্যও
চরিত্রটি গ্রহণ করার পর ক্রিস্টোফার লি জিন্নাহর জীবন ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে থাকা বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত অধ্যয়ন করেন এবং বেশ কয়েকটি বই পড়েন।
চিত্রনাট্যে একাধিক পরিবর্তনের বিষয়ে নিজের বইয়ে তিনি লিখেছেন, ‘ছবির শুটিং যত এগোচ্ছিল, ততই চিত্রনাট্য থেকে অতিরিক্ত মনে হওয়া দৃশ্যগুলো বাদ দেওয়া হচ্ছিল।’
ছবিটির শুরু হওয়ার কথা ছিল ‘লিম্বো’তে। সেখানে জিন্নাহকে একজন ফেরেশতার সামনে তার জীবনের হিসাব দিতে দেখা যাওয়ার কথা ছিল। তবে ইসলামী বিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকায় দৃশ্যটি পরিবর্তন করে একটি কাল্পনিক স্বর্গীয় গ্রন্থাগারের ধারণা আনা হয়। সেখানে জিন্নাহর জীবনের নথি খুঁজে বের করা হয়।
এই গ্রন্থাগারের তত্ত্বাবধায়কের চরিত্রে অভিনয় করেন ভারতীয় অভিনেতা শশী কাপুর। তিনি জিন্নাহকে তার জীবনের সেই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো আবার দেখান, যেসব ঘটনার মধ্য দিয়ে তিনি একজন সাধারণ নেতা থেকে ‘কায়েদে আজম’ হয়ে উঠেছিলেন।
করাচিতে প্রায় ১০ সপ্তাহ
ছবিটির শুটিংয়ের জন্য ক্রিস্টোফার লি প্রায় ১০ সপ্তাহ করাচির একটি বিখ্যাত হোটেলে অবস্থান করেন। একপর্যায়ে তার কোমরে ব্যথা হলে তাকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়।
লি জানান, করাচিতে পৌঁছানোর প্রথম দিনই হোটেলের কর্মীরা জেনে গিয়েছিলেন তিনি কে এবং কোন চরিত্রে অভিনয় করতে এসেছেন। পরদিনের মধ্যেই সংবাদপত্রের মাধ্যমে শহরেও এ খবর ছড়িয়ে পড়ে।

পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফারুক আহমেদ খান লঘারি জিন্নাহর চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তাকে স্বাগত জানিয়ে একটি চিঠিও পাঠান। তবে একই সময়ে সংবাদপত্রগুলোতে তাকে জিন্নাহর চরিত্রে নির্বাচনের সমালোচনাও শুরু হয়।
লি লিখেছেন, ওই সফরে তার সঙ্গে স্ত্রী ও মেয়ে ক্রিস্টিনাও ছিলেন। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেও তার স্ত্রী করাচির বাজার ঘুরে দেখতে সক্ষম হন। তবে লি ও তার মেয়ে গাইড বইয়ে বর্ণিত উপায়ে করাচি ঘুরে দেখতে পারেননি।
‘ড্রাকুলা, জিন্নাহ কীভাবে হতে পারেন?’
লি তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, পাকিস্তানের কয়েকটি সংবাদপত্র বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি যে একজন পশ্চিমা ও খ্রিষ্টান অভিনেতা, যিনি ড্রাকুলা ও অন্যান্য নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করেছেন, তিনি পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতার চরিত্রে অভিনয় করবেন।
লির বক্তব্য ছিল, একজন অভিনেতা তার অভিনীত চরিত্রের থেকে আলাদা। একজন অভিনেতা বিভিন্ন ছবিতে বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের চরিত্রে অভিনয় করতে পারেন। তাই অতীতে অভিনয় করা চরিত্রগুলোকে জিন্নাহর চরিত্রে অভিনয়ের বিরুদ্ধে যুক্তি হিসেবে দেখানো সঠিক নয়।
প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ শুটিং, ছিল নানা সমস্যা
লির মতে, ছবিটির শুটিংয়ের সমস্যা শুধু নিরাপত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রায় ১৫ সদস্যের একটি ছোট দলকে বিপুলসংখ্যক স্থানীয় অতিরিক্ত শিল্পীর সঙ্গে কাজ করতে হয়েছে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে শুটিং চলত। এ ছাড়া প্রযোজনা ও যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও নানা সমস্যা ছিল।
তিনি পরিচালক জামিল দেহলভির কাজের ধরন নিয়েও সমালোচনা করেন। তার মতে, দেহলভি অনেক সময় সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করতেন। এর বিপরীতে তিনি চিত্রগ্রাহক নিক নোল্যান্ডের কাজের প্রশংসা করেন।
ছবিটির অর্থায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শুটিং চলাকালে সরকার পরিবর্তনের কারণে ছবিটির অর্থায়নে সমস্যা দেখা দিয়েছিল। পরে বিষয়টির যথাযথ ব্যবস্থা করা হলে ছবিটির শুটিং সম্পন্ন হয়।
জিন্নাহর হাঁটা, হাতের অঙ্গভঙ্গি, এমনকি কাশিও অনুকরণ
ক্রিস্টোফার লি জিন্নাহর পুরোনো চলচ্চিত্রের দৃশ্য ও বেতারে প্রচারিত বক্তব্যের রেকর্ডিং শুনে তার চালচলন ও অভিব্যক্তি বোঝার চেষ্টা করেন। তিনি জিন্নাহর হাঁটার ধরন, হাতের অঙ্গভঙ্গি, কথা বলার ভঙ্গি এমনকি কাশির ধরনও পর্যবেক্ষণ করেন।
জিন্নাহর একটি বিখ্যাত ভাষণের দৃশ্য লাহোরের সেই স্থানেই ধারণ করা হয়, যেখানে ঐতিহাসিকভাবে তিনি ভাষণটি দিয়েছিলেন। তিনি জিন্নাহর সমাধিসৌধেও যান। এ বিষয়ে তিনি লিখেছেন, ‘সেদিনই আমি এই চরিত্রের দায়িত্বের প্রকৃত অনুভূতি উপলব্ধি করি।’
ছবির চূড়ান্ত পর্যায়ে দেশভাগের সময় একটি শরণার্থী কাফেলার দৃশ্য ধারণের সময় লি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। দৃশ্যটিতে একটি শিশু তার মাকে হারিয়েছিল। লির ভাষ্য অনুযায়ী, ক্যামেরার সামনে তার গড়িয়ে পড়া অশ্রু ছিল সত্যিকারের।
যারা ছিলেন লির সহশিল্পী
ছবিটিতে শিরিন শাহ ফাতিমা জিন্নাহ, রিচার্ড লিন্টার্ন তরুণ জিন্নাহ, স্যাম দস্তর গান্ধী, রবার্ট অ্যাশবি নেহরু এবং জেমস ফক্স লর্ড মাউন্টব্যাটেনের চরিত্রে অভিনয় করেন।
ভনিজা আহমেদ দিনা জিন্নাহ এবং শাকিল লিয়াকত আলী খানের চরিত্রে অভিনয় করেন।
জীবনের শেষ সাক্ষাৎকারে অভিনেতা শাকিল ‘জিন্নাহ’ ছবির অংশ হওয়াকে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তার মতে, লিয়াকত আলী খানের চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব গ্রহণের আগে তিনি তার পরিবারের কাছ থেকেও অনুমতি নিয়েছিলেন।
উর্দু সংস্করণে লির কণ্ঠ দেন গোলাম মহিউদ্দিন
ছবিটির উর্দু সংস্করণও তৈরি করা হয়। এতে ক্রিস্টোফার লির কণ্ঠের ডাবিং করেন অভিনেতা গোলাম মহিউদ্দিন।
বিশ্বজুড়ে প্রশংসা, মেলেনি বড় পরিবেশক
ছবিটির প্রাথমিক সংস্করণ নিয়ে লি পুরোপুরি সন্তুষ্ট ছিলেন না। তবে তার ভাষ্য, লন্ডন ও নিউইয়র্কে আরও সম্পাদনা ও সংগীত সংযোজনের পর ছবিটি আরও ভালো রূপ পায়।
‘জিন্নাহ’ ছবিটি নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস, লন্ডন ও কায়রোর চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়। সেখানে ছবিটি সমালোচকদের কাছ থেকে ভালো প্রতিক্রিয়া পায়। তবে পাকিস্তানের বাইরে ছবিটির জন্য বড় কোনো পরিবেশক পাওয়া যায়নি।
ক্রিস্টোফার লির স্মৃতিকথায় ছবিটিকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি মনে থাকার মতো বিষয় ছিল পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া।
তিনি লিখেছেন, স্থানীয় দোকানদার, পুলিশ সদস্য, সেনাসদস্য ও ছবির অতিরিক্ত শিল্পীরা শেষ পর্যন্ত তাকে শুধু একটি শব্দই বলেছিলেন, যে শব্দটি তিনি কখনো ভুলতে পারবেন না—সেটি ছিল ‘ধন্যবাদ’।
বিবিসি উর্দু থেকে অনুবাদ করেছেন- তানজিল আমির

