Logo
Logo
×
   

Advertisement

আন্তর্জাতিক

সৌদিসহ বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াতে চায় হুথি

Advertisement

Icon

আবদুস সামাদ আজাদ

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:২৩ পিএম

সৌদিসহ বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াতে চায় হুথি

ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের একটি দল। ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথিদের সামরিক অগ্রগতি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। লোহিত সাগরের উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও কৌশলগত অবস্থান দখলের পাশাপাশি সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি ড়িয়ে পড়াআঞ্চলিক সংঘাত আরও ছর আশঙ্কা তৈরি করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত, হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা এবং সৌদি তেল রপ্তানির বিকল্প পথ নিয়ে নতুন উদ্বেগ।

সাম্প্রতিক অভিযানে হুথিরা লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর শহর মোখা এবং এর আশপাশের এলাকা দখল করেছে। তারা বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছের পেরিম বা মায়ুন দ্বীপেও পৌঁছেছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে হুথিদের সামরিক সক্ষমতা ও প্রভাব বেড়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বাব আল-মান্দেব দিয়ে বিশ্বের সমুদ্রপথের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ চলাচল করে। 

হুথিদের অগ্রযাত্রায় ইয়েমেনের পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলেও লড়াই তীব্র হয়েছে। তেলসমৃদ্ধ মারিব প্রদেশে নতুন করে সংঘর্ষ চলছে। মারিব শহর সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত কেন্দ্র। একইভাবে পশ্চিমাঞ্চলের তাইজেও হুথিদের চাপ বেড়েছে। দ্রুত সামরিক অভিযানের কারণে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে এপি জানিয়েছে।  

২০১৪ সালে হুথিরা সানা ও উত্তর ইয়েমেনের বড় অংশ দখল করার পর সৌদি আরব সংঘাতে হস্তক্ষেপ করে। ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতির পর কয়েক বছর তুলনামূলক স্থিতাবস্থা বজায় ছিল। সাম্প্রতিক হুথি অগ্রগতি সেই পরিস্থিতিকে আবারও নড়বড়ে করে দিয়েছে। এখন তাদের লক্ষ্য ইয়েমেনের তেলসমৃদ্ধ পূর্বাঞ্চলের দিকে আরও অগ্রসর হওয়া—এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

সৌদি তেল নিরাপত্তায় দ্বিমুখী চাপ

হুথিদের সামরিক অগ্রগতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও তেল রপ্তানিতে। হুথিরা সৌদি তেল স্থাপনা ও জাহাজকে লক্ষ্য করার হুমকি দিয়েছে। একই সময়ে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলা হয়েছে। তবে এই হামলার দায় সরাসরি হুথিদের ওপর দেওয়া হয়নি। সৌদি আরব ও ইরাক জানিয়েছে, হামলাটি ইরাক থেকে হয়েছে; যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইরানকে সম্ভাব্যভাবে দায়ী করেছেন।

 প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের গুরুত্ব হলো, এর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সৌদি তেল লোহিত সাগরের বন্দর দিয়ে রপ্তানি করা যায়। সাম্প্রতিক হামলার পর পাইপলাইনটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। হামলার আগে এতে দৈনিক প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হচ্ছিল। ফলে হরমুজ ও লোহিত সাগর—দুই নৌপথেই ঝুঁকি বাড়ায় সৌদি তেল রপ্তানির ওপর চাপ আরও বেড়েছে। 

কূটনীতির পথ খুললেও সমঝোতা অনিশ্চিত

 সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। এপি জানিয়েছে, গত সপ্তাহান্তে ওমান যুক্তরাষ্ট্র ও হুথি প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠকের আয়োজন করেছে। এর আগে ট্রাম্পও বলেছিলেন, হুথিরা তার প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি সংঘাতে জড়াতে চায় না। 

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের সঙ্গে ‘নিরন্তর যোগাযোগ’ রাখার কথা জানিয়েছে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মিসর সফর এবং তুরস্কের ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে উত্তেজনা কমাতে আলোচনাও কূটনৈতিক তৎপরতাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

তবে হুথিদের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হলেও বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের সমাধান ছাড়া তা কতটা টেকসই হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।

হরমুজ ও বাব আল-মান্দেবের জটিলতা

ইয়েমেনের সংকট এখন আর শুধু অভ্যন্তরীণ যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একদিকে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত, অন্যদিকে বাব আল-মান্দেবে হুথিদের সামরিক উপস্থিতি—দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ একই সময়ে ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

হরমুজ প্রণালির প্রবাহ যুদ্ধের আগে দৈনিক প্রায় ২ কোটি ব্যারেলের বেশি ছিল। বর্তমানে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অন্যদিকে বাব আল-মান্দেবে হুথিদের অগ্রগতি সৌদি তেল রপ্তানির বিকল্প রুটকেও অনিশ্চিত করে তুলেছে। ফলে জাহাজ চলাচলের খরচ ও জ্বালানি বাজারে চাপ বাড়ছে।  

রয়টার্সের হিসাবে, সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যে ব্রেন্ট তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে এবং জাহাজ ভাড়াও বেড়েছে। ফলে ইয়েমেনে যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, তার প্রভাব শুধু সৌদি আরব বা উপসাগরীয় অঞ্চলে নয়, বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।  

সব মিলিয়ে, ইয়েমেনে কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা চললেও যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। হুথিদের সামরিক অগ্রগতি সৌদি আরবকে নিরাপত্তা ও তেল রপ্তানি—দুই দিক থেকেই চাপে ফেলেছে। আর এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত জড়িয়ে পড়ায় ইয়েমেনের স্থানীয় যুদ্ধ ক্রমেই বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের অংশ হয়ে উঠছে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম