Logo
Logo
×
   

Advertisement

আন্তর্জাতিক

কালো পোশাকের ‘ফাইটার’ থেকে প্যাস্টেল স্যুটের প্রধানমন্ত্রী মেলোনি

Advertisement

জেসমিন আরা ফেরদৌস

জেসমিন আরা ফেরদৌস

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৫৪ পিএম

কালো পোশাকের ‘ফাইটার’ থেকে প্যাস্টেল স্যুটের প্রধানমন্ত্রী মেলোনি

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

একসময় ইতালির ডানপন্থি রাজনীতির প্রান্তিক কণ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন জর্জিয়া মেলোনি। কালো স্যুট, ভারী কালো বুট আর কঠোর রাজনৈতিক বক্তব্যে তাকে দেখা যেত অনেকটা প্রতিবাদী নেত্রীর মতো। কিন্তু ইতালির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর বদলেছে তার রাজনীতি, বদলেছে তার পোশাকও। এখন তার পরনে থাকে হালকা রঙের স্যুট, ঢিলেঢালা ট্রাউজার আর উঁচু হিল। ফ্যাশন ও রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, মেলোনির এই পরিবর্তন তার আরও নরম, গ্রহণযোগ্য কিন্তু কর্তৃত্বপূর্ণ ভাবমূর্তিরই প্রতিফলন।

২০২২ সালের অক্টোবরে ইতালির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সময় মেলোনি পরেছিলেন গাঢ় রঙের স্যুট ও ভারী কালো বুট। তার পোশাকের এই ধরনটি ছিল ইতালির ডানপন্থি রাজনীতির প্রান্তিক অবস্থান থেকে তার উঠে আসার এক ধরনের প্রতীক।

কিন্তু এখন মেলোনি এমন একজন নেতা, যিনি আশঙ্কা করা হয়েছিল যতটা কট্টরভাবে দেশ পরিচালনা করবেন, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি বাস্তববাদী অবস্থান নিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ইতালির দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রীও হয়েছেন। 

এখন তাকে প্রায়ই প্যাস্টেল রঙের স্যুট ও চওড়া ট্রাউজারে দেখা যায়। সেই ট্রাউজার অনেক সময় তার উঁচু হিলের জুতা ঢেকে রাখে। ফ্যাশন ও রাজনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে তার চেহারায় এমন একটি কোমলতা ফুটে ওঠে, যা সংঘাতপূর্ণ না হয়েও কর্তৃত্ব প্রকাশ করে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেয়াদের শেষ বছরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় মেলোনি এখন ডানপন্থি রাজনীতিরই আরেক নেতার কাছ থেকে ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন। তার পোশাক যেমনই হোক না কেন, এই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তার কিছু বিষয়ে তুলনামূলক মধ্যপন্থি হয়ে ওঠার বিষয়টিকে সামনে আনবে।

অবশ্য পোশাকের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ করা মেলোনির একার বিষয় নয়।


রাশিয়া ২০২২ সালে ইউক্রেনে হামলা শুরুর পর থেকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সামরিক ধাঁচের পোশাক পরে আসছেন। যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম সরকারকে শ্রমজীবী মানুষের আরও কাছাকাছি নেওয়ার নীতি তুলে ধরতে জিনস ও টি-শার্ট পরেন। আর মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেনবাউমও স্থানীয় বয়ন ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান জানাতে আদিবাসী কারিগরদের তৈরি নকশিকাঁথা ও নকশা করা পোশাক পরেন।

তবে ইতালির নেতৃত্ব দেওয়া প্রথম নারী হিসেবে মেলোনির পোশাকের গুরুত্ব হয়তো আরও বেশি।

ইতালীয়-হাইতিয়ান ফ্যাশন ডিজাইনার স্টেলা জ্যাঁ বলেন, ‘যে নারী এমন একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন, যে দেশ ফ্যাশনের জন্য বিখ্যাত এবং যার অর্থনীতিরও এটি অন্যতম স্তম্ভ, তার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।’

কর্মী থেকে প্রধানমন্ত্রী

পোস্ট-ফ্যাসিবাদী শিকড় থাকা একটি রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে মেলোনি যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন ধারণা করা হয়েছিল তিনি ইউরোপের প্রতি বিরোধিতাপূর্ণ এবং পররাষ্ট্রনীতিতে চরম অবস্থান নেবেন।

কিন্তু তিনি অনেক ক্ষেত্রেই সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করেছেন। দেশের ভেতরে রক্ষণশীল ও অভিবাসনবিরোধী নীতি অনুসরণ করলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্ষেত্রে মেলোনি বাস্তববাদী অবস্থান নিয়েছেন। রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে ইউক্রেনের অন্যতম শক্তিশালী সমর্থকও তিনি।

এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচনার মুখেও কখনো কখনো দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন মেলোনি। এতে ইউরোপের মিত্র দেশগুলোও তার পাশে দাঁড়িয়েছে।

ইতালির ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের রাজনৈতিক বিশ্লেষক রিকার্ডো আলকারো বলেন, ‘যখন তিনি একটি ছোট ডানপন্থি দলের নেতা ছিলেন, তখন তার ছোট একটি ভোটারগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে হতো। এখন তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি বড় দেশের নেতা। তাই তাকে এমন একজন বিশ্বাসযোগ্য সরকারপ্রধান হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে হয়, যার এমন কিছু ধারণা আছে, যা নিয়ে আলোচনা করা যায়।’


প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কিছুদিন পর থেকেই মেলোনি পরিপাটি করে তৈরি স্যুট এবং অপেক্ষাকৃত শান্ত রঙের পোশাক পরতে শুরু করেন। ফ্যাশন সমালোচকেরা এই পরিবর্তনকে মার্জিত বলে বর্ণনা করেন। একই সঙ্গে এতে তার মধ্যে গাম্ভীর্য ও সহজে কাছে টানার মতো একটি ভাব ফুটে ওঠে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার উপস্থিতিও তখন বাড়তে শুরু করে। এমনকি তিনি চুলের রঙও কিছুটা হালকা করেন।

ফ্লোরেন্সের ইউনিকলেজে ফ্যাশন পড়ানো মিশেলা বোনাফোনি বলেন, ‘হালকা রং আনুগত্য, কোমলতা ও মমতার ইঙ্গিত দেয়। হালকা রঙের পোশাকে মানুষকে আরও আপন করে তোলা যায়।’

মেলোনির দপ্তর তার পোশাক এবং কে তাকে ফ্যাশন বিষয়ে পরামর্শ দেন, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

ইতালির রক্ষণশীল মধ্যপন্থিদের কাছে টানার চেষ্টা

মেলোনির বর্তমান পোশাক ও রাজনৈতিক বক্তব্য তার তরুণ বয়সের চেহারা ও অবস্থানের সঙ্গে বেশ বৈপরীত্য তৈরি করে।

১৯৯৬ সালে মেলোনির বয়স যখন ১৯ বছর, তখন একটি ফরাসি টেলিভিশন চ্যানেল ডানপন্থি একটি যুব আন্দোলনের সদস্যদের সংগঠিত করার সময় তরুণ এই কর্মীকে অনুসরণ করেছিল। তখন প্রায় পুরোপুরি কালো পোশাকে থাকা মেলোনি সাক্ষাৎকারে ইতালির স্বৈরশাসক বেনিতো মুসোলিনির পক্ষে কথা বলেছিলেন। সেই বক্তব্য তার রাজনৈতিক জীবনে দীর্ঘদিন ধরে ছায়া ফেলেছে।

এরপর থেকে তিনি ইতালির অতীতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা চরমপন্থা থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন।

২০০৮ সালে প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বারলুসকোনি মেলোনিকে যুবমন্ত্রী করেন। নতুন দায়িত্বে তিনি আরও গম্ভীর ধরনের পোশাক পরতে শুরু করেন। তার পোশাকের মধ্যে ছিল মূলত গাঢ় রঙের স্যুট ও সাদা শার্ট।

২০২২ সালের নির্বাচনে জয়ের সময় মেলোনি এরই মধ্যে তার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে শুরু করেছিলেন। নির্বাচনী প্রচারের সময় এক বক্তব্যে তিনি আবেগের সঙ্গে নিজেকে ‘একজন নারী, একজন মা, একজন খ্রিষ্টান’ হিসেবে তুলে ধরেন। পরে এই বক্তব্যের ভিত্তিতে একটি ভাইরাল রিমিক্স তৈরি হয় এবং রক্ষণশীল মধ্যপন্থি ভোটারদের মধ্যে তার সমর্থন বাড়াতেও এটি ভূমিকা রাখে।


প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে তাকে খুব কমই পুরো কালো স্যুট ও বুট পরে প্রকাশ্যে দেখা গেছে। ফ্যাশনেবল দেখাতে এবং শোকের সময় কালো পোশাক ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হলেও ইতালিতে এই রঙ দীর্ঘদিন ধরে ফ্যাসিবাদের সঙ্গেও যুক্ত।

এখন মেলোনি প্রায় সব সময় ট্রাউজার পরেন। চোখে পড়ার মতো নকশা এড়িয়ে চলেন এবং প্যাস্টেলসহ বিভিন্ন নিরপেক্ষ রঙের পোশাক পছন্দ করেন। এমনকি তার উঁচু হিলের জুতাও সাধারণত চওড়া ট্রাউজারের নিচে ঢাকা থাকে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলকারো বলেন, ‘তিনি যে ভাবমূর্তি তুলে ধরতে চান, তার সঙ্গে তার চেহারায় কোনো সংঘাত থাকতে পারে না।’

তিনি উল্লেখ করেন, মেলোনির দল ব্রাদার্স অব ইতালির ভোট ২০১৮ সালের ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে প্রায় ২৬ শতাংশে পৌঁছেছিল।

জার্মান চ্যান্সেলরের নজর কাড়ে টাই

মেলোনির চেহারা ও পোশাকের পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে পর্যবেক্ষকেরা ২০২৪ সালের পুগলিয়ায় অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনের কথা উল্লেখ করেন।

ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে তার দলের ভালো ফলের পর তিনি ইতালিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতাদের স্বাগত জানান। সেদিন তার পরনে ছিল হালকা প্যাস্টেল গোলাপি রঙের স্যুট এবং পালাজ্জো প্যান্ট।

ততদিনে তিনি ইউরোপের অন্যতম রাজনৈতিকভাবে শক্ত অবস্থানে থাকা নেতা হয়ে উঠেছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তার আত্মবিশ্বাস ক্রমেই বাড়ছিল।


চলতি বছরের ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-বাঁয়ে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনেও তার সেই আত্মবিশ্বাস দেখা যায়। সেদিন মেলোনির পরনে ছিল বেইজ রঙের স্যুটের সঙ্গে একই রঙের টাই। তার এই পোশাক জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেরৎসেরও নজর কাড়ে।

খোলা মাইক্রোফোনে মেরৎসকে মেলোনিকে বলতে শোনা যায়, ‘আজ আপনি টাই পরেছেন।’

মেলোনি জবাব দেন, ‘হ্যাঁ, তাই আপনি আমাকে একজন যোদ্ধা হিসেবে ভাবতে পারেন।’

মেলোনির এই পোশাকের পরিবর্তন তাই কেবল ফ্যাশনের গল্প নয়। কালো স্যুট ও ভারী বুট থেকে প্যাস্টেল রঙের স্যুট ও চওড়া ট্রাউজারে তার যাত্রা যেন ইতালির রাজনীতির প্রান্ত থেকে ক্ষমতার কেন্দ্র পর্যন্ত তার নিজের পথচলারও এক দৃশ্যমান প্রতিচ্ছবি।

তথ্যসূত্র: এপি

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম