নাড়ির টানে তিন কোটি মানুষ
ইরানের ব্যতিক্রমী সামরিক মহড়া ও নতুন প্রতিরক্ষা কৌশল
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫৬ পিএম
ইরান ‘জানফাদায়ে ইরান’ নামে জনসংশ্লিষ্ট এক স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী তৈরি করছে। এরই মধ্যে ব্যাটালিয়ন কাঠামোও তৈরি হয়ে গেছে। ছবি: দ্য ক্রেডলের সৌজন্যে
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইরান সরকার সম্প্রতি এক ব্যতিক্রমী ও অভূতপূর্ব সামরিক মহড়ার আয়োজন করেছে, যেখানে কোনো নিয়মিত সেনাসদস্য অংশ নেননি। অংশ নিয়েছেন কেবল দেশের সাধারণ মানুষ। যে সময়ে এই মহড়া অনুষ্ঠিত হলো, তার কিছুদিন পরেই ছিল ইরান–ইরাকের ৮ বছরের যুদ্ধ শুরুর ৪৬তম বার্ষিকী। ১৯৮০ সালে ইরাকের প্রয়াত একনায়ক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন সদ্য প্রতিষ্ঠিত ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ওপর এই যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিলেন। ১৯৮০–১৯৮৮ সালের এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধকে ইরান বরাবরই ‘পবিত্র প্রতিরক্ষা’ হিসেবে অভিহিত করে থাকে।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার রাজধানী তেহরানে অবস্থিত ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত হয় ‘জানফাদায়ে ইরান’ (ইরানের জন্য আত্মত্যাগ) শীর্ষক এই মহড়া। আইআরজিসি এবং স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী বাসিজের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে হাজার হাজার পুরুষ ও নারী অংশ নেন। এর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান হাসানজাদেহ জানান, এই কর্মসূচিতে ৫ লাখ মানুষ নিবন্ধন করেছিলেন, যদিও আয়োজকদের প্রাথমিক প্রত্যাশা ছিল ৩ লাখ ১৩ হাজার মানুষের অংশগ্রহণ।
‘জানফাদায়ান-ই ইরান’ বা গণআন্দোলনের সূচনা
এই অভিযান মূলত কোনো প্রচলিত সামরিক বাহিনী গঠনের প্রচেষ্টা ছিল না, বরং ২০২৬ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে শুরু হওয়া একটি যুদ্ধকালীন নিবন্ধন কার্যক্রম ও গণআন্দোলন। এর মাধ্যমে বেসামরিক নাগরিকরা দেশের সেবায় সরাসরি নিজেদের প্রস্তুতির কথা জানানোর সুযোগ পেয়েছেন।
শুরুতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীকে সহায়তায় ইচ্ছুক স্বেচ্ছাসেবকদের শনাক্ত করাই ছিল এর মূল লক্ষ্য। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি নজিরবিহীন এক রূপ নেয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, এই ক্যাম্পেইনে ৩ কোটি ১৬ লাখেরও বেশি ইরানি নাগরিক নিবন্ধন করেছেন, যা খোদ কর্তৃপক্ষকেই বিস্মিত করেছে এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। এমনকি বিদেশ প্রবাসী ইসলামি সমর্থকেরাও এতে যোগ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এই স্বেচ্ছাসেবকদের ৩২ শতাংশই নারী এবং তাদের অধিকাংশের বয়স ৪৬ বছরের নিচে। যদিও সশস্ত্র বাহিনী এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি যে এই স্বেচ্ছাসেবকদের সরাসরি প্রতিরক্ষামূলক অভিযানে মোতায়েন করা হয়েছে কি না, তবে দক্ষিণাঞ্চলের বন্দর ও পারস্য উপসাগরের দ্বীপগুলোর আশপাশে তাদের ব্যবহারের খবর পাওয়া গেছে।
অভ্যন্তরীণ ফ্রন্ট রক্ষায় নতুন বাহিনী
অভিযান শুরুর ৬ মাস পর নীতিনির্ধারকরা এই বিশাল জনবলকে কীভাবে শহর ও জনপদ রক্ষায় কাজে লাগাতে হবে, তা নিয়ে পরিকল্পনা করছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যদি নতুন করে আক্রমণ চালায়, তবে বিচ্ছিন্নতাবাদী সেল ও সশস্ত্র অস্থিরতা মোকাবিলায় এই বাহিনীকে অভ্যন্তরীণ ফ্রন্ট ধরে রাখার কাজে ব্যবহার করা হবে। এর ফলে নিয়মিত সেনাবাহিনী ও আইআরজিসি বাইরের শত্রুর বিরুদ্ধে পূর্ণ মনোনিবেশ করতে পারবে।
২০২৬ সালের জানুয়ারির অস্থিরতার অভিজ্ঞতা থেকে এই পরিকল্পনা করা হয়েছে। সে সময় ইরানের কয়েকটি শহরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল, যার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং মোসাদের প্রত্যক্ষ উসকানি ছিল বলে তেহরানের অভিযোগ। ইসরাইলি গণমাধ্যমেও ইরানের উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে নিষিদ্ধ কুর্দি ও বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে তেল আবিবের সহযোগিতার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তেহরানের বিভিন্ন সড়কে টাঙানো বিলবোর্ডে কাঁধ থেকে নিক্ষেপযোগ্য অস্ত্র বা স্নাইপার রাইফেলের ছবি দিয়ে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল, ‘আপনি কি এগুলো চালাতে জানেন?’ এই বার্তা থেকে স্পষ্ট যে, আইআরজিসি ও বাসিজ একটি প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী গড়ে তুলতে চায়, যারা সংকটের সময় ঘরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এই স্বেচ্ছাসেবকদের ২৬ শতাংশ নিরাপত্তা ও সামরিক কাজ, ২০ শতাংশ ত্রাণ ও উদ্ধারকাজ এবং বাকি ২০ শতাংশ সামাজিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি জানিয়েছেন।
কেন এত মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ?
মার্কিন–ইসরাইলি আগ্রাসনের পর থেকে উত্তর তেহরানের এখতিয়ারিয়ে স্কোয়ারে টানা ২০০ রাতেরও বেশি সময় ধরে সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন জানাতে জড়ো হচ্ছেন। আবহাওয়া কিংবা প্রতিরক্ষা শিল্পের ভবনে হামলার ঝুঁকিও তাদের আটকাতে পারেনি।
নিবন্ধনে অংশ নেওয়া ৫৪ বছর বয়সী শিক্ষক সাদিকেহ বলেন, ‘আমি চাই শত্রু দেখুক যে ইরানিরা এখনো মাঠে আছে, তারা পিছু হটেনি।’ অপর এক অংশগ্রহণকারী ৩৯ বছর বয়সী বেসরকারি চাকরিজীবী হোসেইন বলেন, ‘এই অভিযান বিশ্বের কাছে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শক্তি, স্থিতিস্থাপকতা ও বৈধতার চিত্র তুলে ধরে।’
মধ্য তেহরানের এক মসজিদের ইমাম ও ৫১ বছর বয়সী শিয়া ধর্মীয় নেতা বাহাদোরি বলেন, ‘মাতৃভূমি না থাকলে ধর্মও থাকবে না।’ তিনি মহানবী মুহাম্মদের (সা.) সেই বাণীর কথা স্মরণ করিয়ে দেন, যেখানে বলা হয়েছে, ‘মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা ঈমানের অংশ।’
এক হাজার ব্যাটালিয়ন গঠনের পরিকল্পনা
তেহরানের গণ্ডি পেরিয়ে রাজধানী ছাড়াও অন্যান্য প্রদেশেও এই মহড়া আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক প্রশিক্ষণ শেষে স্বেচ্ছাসেবকদের সারা দেশে ১ হাজারটি ‘জাতীয় প্রতিরোধ’ ব্যাটালিয়নে সংগঠিত করা হবে। এর মাধ্যমে যুদ্ধকালীন এই গণপ্রতিশ্রুতিকে একটি সুসংগঠিত রিজার্ভ বাহিনীতে রূপ দেওয়া হবে, যা দেশের যেকোনো পরবর্তী সংঘাতে দুর্ভেদ্য প্রাচীর হিসেবে কাজ করবে।
