‘বড় হয়ে ইহুদিদের গুলি করতে চাই’—ইয়াহিয়া সিনওয়ারের ১০ বছরের ছেলের চিঠি
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৫ এএম
হামাসের প্রয়াত নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার ও তার ছেলের চিঠি। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
হামাসের প্রয়াত নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ারের ১০ বছর বয়সি ছেলে ইব্রাহিম সিনওয়ার বাবাকে লেখা চিঠিতে ইহুদিদের গুলি করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল বলে দাবি করেছে ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম। চিঠিতে ট্যাংক, রাইফেল ও সশস্ত্র যোদ্ধাদের ছবিও এঁকেছিল সে। সম্প্রতি চিঠির বিষয়বস্তু প্রকাশ্যে এসেছে। দুই বিশেষজ্ঞের মতে, চিঠিটি আসল হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের অক্টোবরে ইয়াহিয়া সিনওয়ার নিহত হওয়ার পরপরই তার ছেলের লেখা চিঠিটি খুঁজে পাওয়া যায়। তবে এবার ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) চিঠির বিষয়বস্তু সংবাদমাধ্যমটির কাছে প্রকাশ করেছে।
চিঠিতে ইব্রাহিম লিখেছিল, ‘বাবা, আমি বড় হয়ে কালাশনিকভ হাতে নিয়ে ইহুদিদের গুলি করতে চাই।’
চিঠিটি প্রকাশ্যে আসার পর গাজায় শিশুদের মধ্যে ঘৃণা ও সহিংসতার মানসিকতা তৈরির বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। তবে চিঠির সত্যতা এবং এর মাধ্যমে একটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মানসিকতা সম্পর্কে কী সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিঠির শুরুতে ইব্রাহিম সৃষ্টিকর্তার নামে লিখে বাবার প্রতি ভালোবাসা ও তাকে কাছে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে।
চিঠিতে সে লেখে, ‘প্রিয় বাবা, তোমাকে খুব মিস করি। তোমাকে জড়িয়ে ধরতে এবং বিজয়ী অবস্থায় দেখতে চাই। আমি যদি বড় হতে পারতাম, তাহলে কালাশনিকভ হাতে নিয়ে ইহুদিদের গুলি করতাম, বাবা।’
এরপর বাবাকে উদ্দেশ করে সে লেখে, ‘তুমি সব সময় আমার বাহুতে ঘুমাবে।’
চিঠির সঙ্গে ইব্রাহিমের আঁকা কয়েকটি ছবিও ছিল। সেগুলোর মধ্যে হিব্রু ভাষায় লেখা চিহ্নযুক্ত একটি ট্যাংক, সশস্ত্র যোদ্ধা, রকেট এবং সামরিক সীমান্ত স্থাপনার মতো দেখতে একটি অবকাঠামোর ছবি রয়েছে।
চিঠিতে আরও লেখা ছিল, ‘আমি কাগজ ও কার্ডবোর্ড দিয়ে পিস্তল, ট্যাংক এবং কালাশনিকভ তৈরি করি। হে আল্লাহ, যুদ্ধ শেষ হোক এবং আমি যেন তোমাকে সুস্থ অবস্থায় দেখতে পাই।’
শেষে বাবার নিরাপত্তার জন্য প্রার্থনা করে ইব্রাহিম লেখে, ‘হে আল্লাহ, আমার বাবাকে রক্ষা করো।’
দ্য টেলিগ্রাফের অনুসন্ধান অনুযায়ী, গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর রাফাহর একটি ভবনে চিঠিটি খুঁজে পেয়েছিলেন ইসরাইলি সেনারা। ওই শহরেই ২০২৪ সালের অক্টোবরে ইয়াহিয়া সিনওয়ার নিহত হন।
বর্তমানে ১২ বছর বয়সি ইব্রাহিম গাজা ছেড়ে তুরস্কে চলে গেছে বলে জানা গেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরুর দিকে সিনওয়ারের স্ত্রী সামার মুহাম্মদ আবু জামার ভুয়া পাসপোর্ট ব্যবহার করে রাফাহ সীমান্ত দিয়ে মিসরে প্রবেশ করেছিলেন বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। পরে তিনি সন্তানদের নিয়ে তুরস্কে চলে যান এবং সেখানে পুনরায় বিয়ে করেন।
২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ৭ অক্টোবরের হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে আবু জামারকে হামাসের একটি সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে হেঁটে যেতে। এ সময় তাঁর হাতে নকশাদার একটি দামি ব্যাগ ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চিঠিটির সত্যতা সম্পর্কে জানতে চাইলে ইসলামপন্থি রাজনৈতিক মতাদর্শবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও লেখক আহমদ মনসুর এটিকে আসল বলে মনে করেন।
দ্য টেলিগ্রাফ-কে তিনি বলেন, শিশুদের এভাবে গড়ে তোলার বিষয়টি হামাসের পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তার মতে, ফিলিস্তিনি সমাজের কিছু অংশে, বিশেষ করে গাজায়, এ ধরনের মনোভাবের শিকড় রয়েছে
মনসুরের দাবি, ইসরাইলিদের নয়, বরং ইহুদিদের লক্ষ্য করে ঘৃণা এবং তাদের হত্যার ধারণা এমনভাবে স্বাভাবিক করে তোলা হয়েছে যে ছোট শিশুরাও তা নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে।
জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের সামরিক ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড্যানি ওরবাখও চিঠিটিকে প্রায় নিশ্চিতভাবেই আসল বলে মনে করেন।
তার ভাষ্য, চিঠিটি হামাসের নেতা, সক্রিয় কর্মী এবং তাদের পরিবারের মধ্যে গড়ে ওঠা এক অস্বাভাবিক ‘মৃত্যুকেন্দ্রিক সংস্কৃতি’র ইঙ্গিত দেয়।
তবে বিশেষজ্ঞদের এই মূল্যায়ন তাদের নিজস্ব মতামত। চিঠিটির সত্যতা নিয়ে স্বাধীনভাবে বিস্তারিত যাচাইয়ের তথ্য প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়নি।
নতুন প্রকাশিত চিঠি সম্পর্কে আইডিএফের এক মুখপাত্র বলেন, ইয়াহিয়া সিনওয়ার নিহত হওয়ার দুই বছর পরও তার প্রচার করা সহিংস মতাদর্শ গাজায় প্রভাব বিস্তার করে চলেছে বলে তারা মনে করে।
মুখপাত্রের দাবি, চিঠি ও আকা ছবিগুলো দেখায়, সিনওয়ারের মতাদর্শ তার সন্তানদের বেড়ে ওঠার ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলেছে। হামাসের প্রচারিত ঘৃণা ও সহিংসতার মূল্যবোধ গাজার নতুন প্রজন্মকে প্রভাবিত করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে গাজার শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, শিক্ষাব্যবস্থার বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক সংকটের মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশুর চিঠির ভিত্তিতে পুরো গাজার শিশু বা ফিলিস্তিনি সমাজ সম্পর্কে সাধারণ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
তথ্যসূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ



