আল-জাজিরার বিশ্লেষণ
কেন বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ কিনছে চীন?
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মাঝে চীন তাদের স্বর্ণের মজুদ রেকর্ড পরিমাণে বাড়িয়ে চলেছে। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আমেরিকান ডলারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো এবং বৈশ্বিক আর্থিক ও ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি থেকে নিজেদের রক্ষা করার কৌশল হিসেবেই বেইজিং এই পদক্ষেপে জোর দিয়েছে। একই সময়ে, চীনের সাধারণ পরিবারগুলোও অর্থনৈতিক অস্থিরতা থেকে নিজেদের সঞ্চয় বাঁচাতে ব্যাপকভাবে সোনা কেনার দিকে ঝুঁকছে।
চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘পিপলস ব্যাংক অব চায়না’ টানা ২৩ মাস ধরে স্বর্ণ কেনার রেকর্ড গড়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে তারা একবারে প্রায় ২৩ টন স্বর্ণ কিনেছে, যা গত প্রায় তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় মাসিক কেনাকাটা। এই নতুন ক্রয়ের মাধ্যমে দেশটির মোট স্বর্ণের মজুদ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২,৪১০ টনে। চীনের মোট রাষ্ট্রীয় রিজার্ভে সোনার অবদান যেখানে গত ২০২৪ সালের শেষ দিকে ছিল ৫.৫ শতাংশ, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর নাগাদ তা বেড়ে ৮.৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে সাধারণ চীনা নাগরিকরাও পিছিয়ে নেই; চীন গোল্ড অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে বার ও কয়েন আকারে স্বর্ণ কেনার পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৮.৪ শতাংশ বেড়েছে।
চীন কেন এত বিপুল পরিমাণে সোনা মজুদ করছে—এর পেছনে মূলত শক্তিশালী কয়েকটি আন্তর্জাতিক ও অর্থনৈতিক কারণ কাজ করছে:
আমেরিকান ডলার ও ঋণের ঝুঁকি হ্রাস
চীনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণের (ট্রেজারি বন্ড) ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে আনা। মার্কিন সরকারের দেনা বর্তমানে রেকর্ড ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ক্ষমতার তুলনায় বেশ উদ্বেগজনক। বেইজিংয়ের বিশাল পরিমাণ সম্পদ ডলার-ভিত্তিক হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির কোনো বড় বিপর্যয় চীনকে বড় আর্থিক ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। স্বর্ণ কেনায় সেই ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসে।
নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণের ভয়
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা বিশ্ব যখন রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক সম্পদ ফ্রিজ বা বাজেয়াপ্ত করে, তখন তা বিশ্বের উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর চোখ খুলে দেয়। বেইজিং আশঙ্কা করছে, ভবিষ্যতে ওয়াশিংটনের সাথে কোনো বড় ধরনের সংঘাত তৈরি হলে তাদের বৈদেশিক সম্পদও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞায় পড়তে পারে। কিন্তু নিজের দেশে স্বর্ণ মজুদ রাখলে তার ওপর অন্য কোনো দেশের সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকে না।
অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা
চীনের সাধারণ মানুষের জন্য স্বর্ণ কেনা একটি নিরাপদ সঞ্চয় মাধ্যম হয়ে উঠেছে। দেশটির শেয়ার বাজারের মন্দাভাব এবং আবাসন খাতের চরম সংকট ও দেনার কারণে মানুষ জমি বা শেয়ারে টাকা না ঢেলে স্বর্ণ কিনে নিজেদের সঞ্চয় সুরক্ষিত রাখতে চাচ্ছেন।
তবে বিশ্বব্যাংক ও অর্থনীতিবিদদের অভিমত, চীনের স্বর্ণ কেনার এই উদ্যোগ বৈশ্বিক বাণিজ্যে আমেরিকান ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য রাতারাতি শেষ করে দেবে না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চালনা ও লেনদেনের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে এখনও আমেরিকান ডলারই সবচেয়ে সহজলভ্য ও প্রয়োজনীয় মুদ্রা।
সুতরাং, চীন হঠাৎ করেই ডলার বর্জন করছে না; বরং তারা অত্যন্ত ধীরগতিতে ও সতর্কতার সাথে তাদের সম্পদের ঝুঁকি কমানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, এই প্রবণতায় একা চীন নয়, পোল্যান্ডের মতো উদীয়মান অর্থনৈতিক ক্ষমতার দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকও এখন নিজেদের রিজার্ভে সোনা যুক্ত করতে শুরু করেছে।


