ইউরোপ-ইসরাইলের সম্পর্কে ফাটল, নির্বাচনে কি বদল আসবে?
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১৪ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নেতানিয়াহু সরকারের প্রতি ইউরোপের সমালোচনা বাড়ছে। তবে দখলদ্বার ইসরাইলের আসন্ন নির্বাচনে সরকার পরিবর্তন হলেও ফিলিস্তিনিদের পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
একসময় ইউরোপের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ককে বন্ধুত্ব ও মিত্রতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হতো। ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল ইসরাইলের ৭৫ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ইউরোপীয় কমিশনের উরসুলা ফন ডার লেন বলেছিলেন, ইউরোপ ও ইসরাইল বন্ধুত্ব ও মিত্রতার বন্ধনে আবদ্ধ।
কূটনৈতিক সম্পর্কের বাইরেও এই বন্ধুত্বের বিস্তার ছিল। ইউরোপ আন্তর্জাতিক ফুটবলে অংশ নিত ইসরাইল। এ ছাড়া ইউরোভিশন সংগীত প্রতিযোগিতায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করত এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করত। ইউরোপের অস্ত্রশিল্পের উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গেও যুক্ত ছিল ইসরাইল।
তবে গাজায় ইসরাইলের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর সেই সম্পর্ক এখন নানা বিরোধের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এই যুদ্ধে অন্তত ৭৪ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ইসরাইলের অংশগ্রহণের প্রতিবাদে ইউরোভিশন থেকে সরে দাঁড়িয়েছে ইউরোপের কয়েকটি দেশ। ইউরোপের কিছু ফুটবলার ইসরাইলের দলের বিপক্ষে খেলতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। একসময় যে দেশগুলো বন্ধুত্বের কথা বলত, তাদের কেউ কেউ এখন ইসরাইলের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানাচ্ছে।
ফিলিস্তিনিদের ওপর নিপীড়নের সমালোচনায় দীর্ঘদিন ধরেই সরব আয়ারল্যান্ড ও স্পেন। সম্প্রতি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মাইকেল মার্টিন বলেন, গাজায ইসরাইলের কর্মকাণ্ড বিশ্বকে লজ্জিত করবে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজও গাজায় নেতানিয়াহুর অব্যাহত গণহত্যার নিন্দা জানান।
তিন বছর আগের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করলে পরিবর্তনটি স্পষ্ট। দখলদ্বার ইসরাইলের প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখা বেলফোর ঘোষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যুক্তরাজ্য সম্প্রতি অবৈধ বসতি থেকে পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনের অভিযোগও তুলেছেন।
গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) পশ্চিম তীরে তাইবেহ গ্রামের কাছে ফিলিস্তিনি জলপাইচাষিদের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া বেলজিয়াম, ফ্রান্স ও পোল্যান্ডের ইউরোপীয় কূটনৈতিক ও কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালান একদল ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী। এর আগের দিন রামাল্লার উত্তরে এক মার্কিন সাংবাদিকের ওপর হামলা হয়েছিল। এসব ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক নিন্দা জানানো হয়।
আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরাইলের নির্বাচন। তবে দেশটির সঙ্গে ইউরোপের ক্ষতিগ্রস্ত সম্পর্ক পুরোপুরি মেরামত করা সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে বিশ্লেষকদের। তাদের মতে, নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, ফিলিস্তিনিদের পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম।
নির্বাচনের ফলে কি বদলাবে ইউরোপ-ইসরাইল সম্পর্ক
লন্ডনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক ইয়োসি মেকেলবার্গ বলেন, নেতানিয়াহু যদি কট্টর ডানপন্থিদের নিয়ে আবারও সরকার গঠন করেন, তাহলে কিছু বিষয় অপরিবর্তনীয় হয়ে উঠতে পারে।
এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক নিকোলা পেরুজিনিও সতর্ক করেছেন। তার মতে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত নেতা নেতানিয়াহু আবার ক্ষমতায় ফিরলে গাজার মানুষকে বসবাসের অযোগ্য পরিস্থিতির মধ্যেই থাকতে হতে পারে।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহু যদি তুলনামূলক উদারপন্থি দলগুলোকে নিয়ে সরকার গঠন করেন, তাহলে পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণের গতি কমতে পারে। কিন্তু আইসিসির গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত কোনো প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় থাকলে ইউরোপের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্কের আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর বিদায় মানেই ইউরোপের সমালোচনার কারণ হয়ে ওঠা নীতিগুলোর অবসান নয়। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত মধ্যপন্থি ইয়াশার পার্টির নেতা ও ইসরাইলের সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকটও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছেন।
ইসরাইলের মিটভিম ইনস্টিটিউটের গত বছরের এক জনমত জরিপে দেখা যায়, দেশটির ৬৭ শতাংশ মানুষ ইউরোপীয় ইউনিয়নকে (ইইউ) বন্ধু নয়, বরং প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেন। বিপরীতে মাত্র ১৪ শতাংশ ইইউকে বন্ধু মনে করেন।
তবে মেকেলবার্গ মনে করেন, তুলনামূলক উদারপন্থি সরকার ক্ষমতায় এলে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে। তিনি বলেন, ‘ইউরোপের সঙ্গে আলোচনা আরও যুক্তিসংগত ও বাস্তবসম্মত হবে। ’ তবে রাতারাতি পরিস্থিতি বদলে যাবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকার গঠিত হলে ফিলিস্তিনিদের জন্য আরও বেশি মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের গতি কমতে পারে এবং ই১ নামের বিতর্কিত বসতি পরিকল্পনা বাতিলও হতে পারে।
তবে চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো জুলি এম নরম্যানের মতে, ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে এসব পদক্ষেপই যথেষ্ট হবে না। ইউরোপীয় সরকারগুলো ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং দখলদারত্বের অবসানের দিকে ইসরাইলের বাস্তব পদক্ষেপ দেখতে চাইবে।
জনমতের চাপে বদলাচ্ছে ইউরোপের অবস্থান
গাজায় যুদ্ধের শুরুর দিকে পশ্চিমা নেতারা ইসরাইলের সামরিক অভিযানকে সমর্থন দিয়েছিলেন। কিন্তু গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে সহিংসতা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ অব্যাহত থাকায় বিভিন্ন দেশের সরকারকে অবস্থান পরিবর্তনের চাপের মুখে পড়তে হয়েছে।
নাগরিক অধিকার সংগঠন, আন্তর্জাতিক আদালত, শ্রমিক ইউনিয়ন, পেশাজীবী সংগঠন এবং বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষের বিক্ষোভ—সব মিলিয়ে ইসরাইলের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে চাপ বাড়তে থাকে।
লন্ডনের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবাধিকার আইনের অধ্যাপক নেভে গর্ডন আল–জাজিরাকে বলেন, ‘এখন কয়েকটি দেশের শাসকগোষ্ঠী জনমতের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান মেলানোর চেষ্টা করছে। ’ তার মতে, ফিলিস্তিনপন্থি আন্দোলন সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য ও প্রচলিত রাজনৈতিক অবস্থানের ধারণায় পরিবর্তন এনেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপেও ইউরোপের কয়েকটি দেশে ইসরাইল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব বাড়ার চিত্র উঠে এসেছে। যুক্তরাজ্যে ২০২৫ সালের বসন্ত থেকে চলতি বছরের বসন্ত পর্যন্ত ইসরাইল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব পোষণকারীর হার ৬১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬৯ শতাংশ হয়েছে। ইতালিতে এই হার ৬৬ থেকে বেড়ে ৭৫ শতাংশ এবং জার্মানিতে ৬৪ থেকে ৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে। জার্মানি ইসরাইলের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র।
তবে ইউরোপে ইসরাইলের প্রতি সমর্থন পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জানিনা ডিল বলেন, জার্মানির পরপর দুটি সরকার ইসরায়েলকে কূটনৈতিক ও বস্তুগত সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে নিজেদের অবস্থানের যথার্থ সমালোচনা সত্ত্বেও পদক্ষেপ নিতে অনিচ্ছুক থেকেছে।
মেকেলবার্গের মতে, ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে হলে শান্তিপ্রক্রিয়ার দিকে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে এবং ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে। এমন পদক্ষেপ নেওয়া হলেও এত দিনে সৃষ্ট ক্ষত সহজে মুছে যাবে না।
সূত্র: আলজাজিরা



-6ad62fefea667.jpg)