ট্রাম্পের ভারত সফর: আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের পূর্বাভাস
jugantor
ট্রাম্পের ভারত সফর: আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের পূর্বাভাস

  আসিফ শাহেদ  

০১ মার্চ ২০২০, ২২:১৪:৫৬  |  অনলাইন সংস্করণ

ট্রাম্পের ভারত সফর: নতুন সমীকরণের পূর্বাভাস

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দু'দিনের সফরে ভারত এমন সময় এসেছেন, যখন অধিকৃত কাশ্মীর, বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন, জাতীয় নাগরিকত্ব নিবন্ধন (এনআরসি) এবং জাতীয় জনসংখ্যা আইন নিয়ে ভারত আন্তর্জাতিক ফোরামে ভীষণ চাপে রয়েছে।

নয়াদিল্লি এবং ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে বিক্ষোভকারীদের প্রতিরোধ করার জন্য বহু চেষ্টা করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, প্রতিরোধের সময় বিজেপি (ভারতীয় জনতা পার্টি), বজরং দল ও অন্যান্য চরমপন্থী সংগঠনগুলোর প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সহযোগিতায় বিক্ষোভকারীদের ওপরে আক্রমণও চালানো হয়।

মুসলিম যুবকদের ওপরে লাঠিচার্জ ও পাথর নিক্ষেপ করা হয়। এতে অনেকের মৃত্যু পর্যন্ত হয়েছিল, এবং আহত হয়ে হাসপাতালেও পড়ে ছিল শতাধিক।

বিজেপি নেতারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, নয়াদিল্লির মুসলমানরা কেন বিজেপির পক্ষে ভোট দেয়নি, এই জন্য তাদের চরম শিক্ষা দেয়া হবে।

শত শত বিজেপি এবং বজরং দল দিল্লিতে মুসলিম জনবসতি লুটপাট করেছে, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে এবং ভাঙচুর করেছে।

মুসলমানরা সম্মান ও জীবন বাঁচাতে বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। এই সহিংসতা নৈরাজ্য এখনও চলমান। পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। অথচ বলা হচ্ছে, মুসলমানদের ওপরে নিপীড়নের কোনো প্রমাণ নাকি মেলেনি!

ডোনাল্ড ট্রাম্পও এব্যাপারে সরাসরি কোনো কথা বলা থেকে বিরত থেকেছেন।

ট্রাম্প যখন ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন, মার্কিন কর্মকর্তারা তখন ফোনে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন এবং নাম প্রকাশ না করার শর্তে এজেন্ডা এবং সম্ভাব্য আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি সরবরাহ করেন। ধারণা করা হয়েছিল, মার্কিন সাম্রাজ্য বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা সম্পর্কে প্রকাশ্যে কোনো কথা বলবে। মার্কিন কর্মকর্তাদের একটি ব্রিফিংয়ে এদিকে ইঙ্গিতও করা হয়েছিল। কিন্তু তার তেমন কিছুই ঘটেনি।

তবে আহমেদাবাদে ‘নমস্তে ট্রাম্প’ ইভেন্ট নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প খুশি হয়েছিলেন বেশ। এই সফরের প্রথম দিনটিতে কেবল মোদির ভূয়সী প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন ট্রাম্প এবং গান্ধী আশ্রম পরিদর্শনের সময়ও গান্ধীকে ভুলে গিয়ে মোদিরই প্রশংসা করছিলেন তিনি।

সফরের দ্বিতীয় দিন মোদির সঙ্গে সাক্ষাতের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট একটি প্রেস ব্রিফিংয়ে নাগরিকত্ব আইনটি প্রকাশ করে বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি মোদির সঙ্গে কথা বলেছেন। মোদি তার দেশে সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে চলেন, তাই যৌথ ব্রিফিংয়ে প্রশ্ন নেয়া সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে ট্রাম্প একক এক সাংবাদিক সম্মেলন করেছিলেন এবং অতিথি দেশটির মিডিয়ার মুখোমুখি হন।

নাগরিকত্ব আইন নিয়ে ফের আলোচনা করা হলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কথা বলেছিলেন এবং প্রতিবাদকারীদের আচরণ নিয়েই প্রশ্ন তোলেন। এভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভারতের বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপের বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন এবং বলেছেন ভারতই এ ব্যাপারে ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে ।

তবে মার্কিন ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন এবং মার্কিন কংগ্রেস ততক্ষণ পর্যন্ত মুখ খুলবে না, যতক্ষণ ভারত তাদের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত স্বার্থ পূরণ করে যাবে বা তাদের স্বার্থকে সমর্থন করতে থাকবে। একই সঙ্গে, ওয়াশিংটন এমন জায়গায় পৌঁছানো থেকেও বিরত থাকবে যেখানে মোদি এবং জাতীয়তাবাদীরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

পাকিস্তানের গণমাধ্যমগুলো কাশ্মীর ও পাকিস্তান সম্পর্কে মার্কিন প্রেসিডেন্টের অবস্থান নিয়ে খুব উত্তেজিত ছিল। অন্যদিকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো আহমেদাবাদ স্টেডিয়ামে ট্রাম্পের মুখে পাকিস্তানের নাম নেয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।

ট্রাম্পের এই সফরের বিভিন্ন উদ্দেশ্য ছিল এবং এই সফরকালে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং ভারতীয় জনগণকে খুশি করার জন্য অনেক কিছুই বলেছেন। ভারত সরকার ও জনগণের অনুভূতির জন্য পাকিস্তানকে উপেক্ষা করা আমেরিকার স্বার্থে নয়,তবুও পাকিস্তানি মিডিয়াগুলো ট্রাম্পের এমন আচরণে সন্তুষ্ট হতে পারেনি।

কারণ, আহমেদাবাদ স্টেডিয়ামে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, পাকিস্তানের বর্ডারে ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আমেরিকা এবং পাকিস্তান উভয়ে মিলেমিশেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। আবার যখন তিনি মোদির সঙ্গে সাক্ষাত করলেন, তখন বললেন তার ঠিক উল্টো কথা। যেন তিনি নিজের এই দু মুখো অবস্থানে ভারতকে খুশি করতে চাইলেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট আবারও কাশ্মীর নিয়ে মধ্যস্থতার আহ্বান জানিয়েছিলেন, কিন্তু এবার মধ্যস্থতার উপর জোর দেয়ার পরিবর্তে পাকিস্তান ও ভারত কাশ্মীর ইস্যু সমাধানের জন্য কাজ করতে চায় বেশি ।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য একটি ইতিবাচক দিক। উভয় দেশের শাসকরা এ জাতীয় কোনোর কিছুর আকাঙ্ক্ষাও করেননি।

একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট যিনি ব্যক্তিগত ব্যবসায় ও কূটনৈতিক বিষয় পরিচালনার জন্যও পরিচিত, তার এই সফরে পাক-প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এবং মোদি উভয়ই বন্ধুত্বপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়েছিল, কিন্তু মোদি এটিকে এক কঠোর অবস্থান বলে আখ্যায়িত করেছেন।

কাশ্মীরের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে মধ্যস্থতার প্রত্যাশা হ্রাস পাবে এবং ফলাফল ইসরাইযল-ফিলিস্তিনি দ্বন্দ্ব সমাধানের মতো হতে পারে। পাকিস্তান ও ভারত কাশ্মীর সমস্যা সমাধানের জন্য কাজ করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্য আরও বেশি মনোযোগী।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট কিউভয় দেশকে আলোচনার টেবিলে আনতে রাজি হয়েছেন? দু’দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীই এর উত্তর দিতে পারেন।

ট্রাম্পের এই সফরে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির প্রত্যাশা করছিল ভারত। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মোদির এজেন্ডা বাস্তবায়ন কোনো এক ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্থ হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দেশে ফিরে আসার পাশাপাশি বিশ্বের মার্কিন পণ্যগুলোর উপর আরোপিত কর ও শুল্ক হ্রাস চাচ্ছেন তিনি।

অন্যদিকে মোদি চান, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অন্যান্য ব্যবসায়ী সংস্থাগুলো ভারতে এসে ব্যবসা করুক এবং তিনি শুল্কের ক্ষেত্রে ছাড় দিতেও সম্মত আছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নভেম্বরের আগে ভারতের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি করতে চান যাতে তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে এই কৃতিত্বের বিষয়ে ভোট দিতে পারেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের সফরের আগে নাগরিকত্ব আইন এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা সম্পর্কে মার্কিন কর্মকর্তাদের দেয়া বক্তব্য মূলত ভারতকে চাপ দেয়ার জন্য ছিল।

ট্রাম্পও একই উদ্দেশ্য নিয়ে পাকিস্তানের ভূমিকা ও নাগরিকত্ব আইনের বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ২৯ ফেব্রুয়ারি দোহায় আফগান তালেবানদের সাঙ্গে একটি শান্তিচুক্তি হিসাবে পাকিস্তানের দিকে তাকিয়েছিলেন এবং পাকিস্তান ঘোষণা দিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি যুদ্ধের সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে চান তবে তা কেবল পাকিস্তানের কারণে সম্ভব হবে। যুক্তরাষ্ট্রকে তার কাঙ্ক্ষিত উপহার দেয়নি ভারত।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের সফরের আর একটি উদ্দেশ্য ছিল চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে প্রতিহত করা এবং এই উদ্দেশ্যে তিনি আংশিক সাফল্যও পেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে অ্যাপাচি হেলিকপ্টারগুলোর সঙ্গে ভারত ৩ বিলিয়ন ডলার প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে এবং এই হেলিকপ্টারগুলো ভারত মহাসাগরে চীনের শক্তি মোকাবেলায় সহায়তা করবে।

ঐতিহ্যগত দিক থেকে ভারতে রাশিয়ার অস্ত্র ক্রেতা ছিল, কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে এবং ২০০৮ সাল থেকে ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কিনেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ৫ জি নেটওয়ার্কের কথাও বলেছেন। ৫ জি ইস্যুতে বিশ্ব বিভক্ত হয়ে পড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের চীন থেকে ৫ জি প্রযুক্তি গ্রহণ করতে নিষেধ করছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রযুক্তি যুদ্ধটি কেবল বিশ্বকেই নয়, ইন্টারনেটকেও বিভক্ত করেছে। বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট পরিষেবা সরবরাহকারী বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে একটি স্বতন্ত্র নিয়ন্ত্রণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে। ভারত চায় না যে কোনও দেশই এই অঞ্চলে প্রভাব ফেলুক, কারণ ইস্যু নিয়ে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রকে এখনও কোনও আশ্বাস দেয়নি।


‘আমরা ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মুক্ত-চলাচলের জন্য সন্ত্রাসবাদ, সাইবার সুরক্ষা, সামুদ্রিক সুরক্ষার সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে চাই’ ভারত সফরকালে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন বক্তব্যের মাধ্যমে বাস্তবে ভারত মহাসাগরে চীনের প্রভাব ভেঙে ফেলা হয়েছে।

ঘোষণাটি হল, চীন ভারত মহাসাগরে তার শক্তি বৃদ্ধি করেছে এবং সমুদ্র সুরক্ষায় ভারতের প্রতিবেশীদের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়িয়েছে, যা কেবল ভারতের পক্ষে বিপজ্জনক নয় আমেরিকাও এই অঞ্চলে চীনের নেতৃত্ব মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছিলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্লু ডট নেটওয়ার্কে বেশ কয়েকটি অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছে। নীল ডট নেটওয়ার্কের লক্ষ্য ভবিষ্যতের অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলো নিরাপদ, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিতামূলকভাবে নির্মিত এবং এই অঞ্চলের দেশগুলোতে উচ্চ-মানের উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বেসরকারী খাতে স্থিতিশীল এবং নির্ভরযোগ্য বিকল্প রয়েছে তা নিশ্চিত করা।

ট্রাম্পের ভারত সফর এই অঞ্চলে সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতার নতুন পথ উন্মুক্ত করবে। এই সহযোগিতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের মধ্যে হবে, তবে আমেরিকাও এই অঞ্চলে তার উপস্থিতি বজায় রাখতে এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করবে।

এমনকি আফগানিস্তানে শান্তি চুক্তির পরেও আফগানিস্তানের পুনর্গঠন ও সন্ত্রাসবাদকে আবারও মাথাচাড়া দেয়া থেকে বাধা দেয়ার ক্ষেত্রে সহায়তার জন্য আমেরিকার সহযোগিতার প্রয়োজন হবে।

ভারত আফগানিস্তানে এমন একটি ভূমিকা চায় যা তা অবিলম্বে খুঁজে পেতে পারেনি, তবে ব্লু ডট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী অবকাঠামোর নামে যে প্রকল্পগুলো করা হবে তাতে ভারতও জড়িত থাকবে এবং যুদ্ধের কারণে আফগানিস্তান ব্লু ডট নেটওয়ার্কের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হবে। বিধ্বস্ত দেশের পুনর্নির্মাণ একটি বড় প্রকল্প এবং সমস্ত দেশ এই প্রকল্পে অংশ নিতে প্রস্তুত।

তারপরও প্রতিযোগিতাটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যেও প্রসারিত হবে যা প্রযুক্তি থেকে অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলো পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই থাকবে।

পাকিস্তানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ডন অনলাইনে লেখা আসিফ শাহেদের কলামটি উর্দূ থেকে ভাষান্তর করেছেন -মুহাম্মদ বিন ওয়াহিদ

ট্রাম্পের ভারত সফর: আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের পূর্বাভাস

 আসিফ শাহেদ 
০১ মার্চ ২০২০, ১০:১৪ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
ট্রাম্পের ভারত সফর: নতুন সমীকরণের পূর্বাভাস
ছবি: রয়টার্স

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দু'দিনের সফরে ভারত এমন সময় এসেছেন, যখন অধিকৃত কাশ্মীর, বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন, জাতীয় নাগরিকত্ব নিবন্ধন (এনআরসি) এবং জাতীয় জনসংখ্যা আইন নিয়ে ভারত আন্তর্জাতিক ফোরামে ভীষণ চাপে রয়েছে। 

নয়াদিল্লি এবং ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে বিক্ষোভকারীদের প্রতিরোধ করার জন্য বহু চেষ্টা করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, প্রতিরোধের সময় বিজেপি (ভারতীয় জনতা পার্টি), বজরং দল ও অন্যান্য চরমপন্থী সংগঠনগুলোর প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সহযোগিতায় বিক্ষোভকারীদের ওপরে আক্রমণও চালানো হয়। 

মুসলিম যুবকদের ওপরে লাঠিচার্জ ও পাথর নিক্ষেপ করা হয়। এতে অনেকের মৃত্যু পর্যন্ত হয়েছিল, এবং আহত হয়ে হাসপাতালেও পড়ে ছিল শতাধিক। 

বিজেপি নেতারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, নয়াদিল্লির মুসলমানরা কেন বিজেপির পক্ষে ভোট দেয়নি, এই জন্য তাদের চরম শিক্ষা দেয়া হবে।

শত শত বিজেপি এবং বজরং দল দিল্লিতে মুসলিম জনবসতি লুটপাট করেছে, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে  এবং ভাঙচুর করেছে। 

মুসলমানরা সম্মান ও জীবন বাঁচাতে বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। এই সহিংসতা নৈরাজ্য এখনও চলমান। পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। অথচ বলা হচ্ছে, মুসলমানদের ওপরে নিপীড়নের কোনো প্রমাণ নাকি মেলেনি!

ডোনাল্ড ট্রাম্পও এব্যাপারে সরাসরি কোনো কথা বলা থেকে বিরত থেকেছেন। 

ট্রাম্প যখন ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন, মার্কিন কর্মকর্তারা তখন ফোনে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন এবং নাম প্রকাশ না করার শর্তে এজেন্ডা এবং সম্ভাব্য আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি সরবরাহ করেন। ধারণা করা হয়েছিল, মার্কিন সাম্রাজ্য বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা সম্পর্কে প্রকাশ্যে কোনো কথা বলবে। মার্কিন কর্মকর্তাদের একটি ব্রিফিংয়ে এদিকে  ইঙ্গিতও করা হয়েছিল। কিন্তু তার তেমন কিছুই ঘটেনি। 

তবে আহমেদাবাদে ‘নমস্তে ট্রাম্প’ ইভেন্ট নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প খুশি হয়েছিলেন বেশ। এই সফরের প্রথম দিনটিতে কেবল মোদির ভূয়সী প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন ট্রাম্প  এবং গান্ধী আশ্রম পরিদর্শনের সময়ও গান্ধীকে ভুলে গিয়ে মোদিরই প্রশংসা করছিলেন তিনি। 

সফরের দ্বিতীয় দিন মোদির সঙ্গে সাক্ষাতের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট একটি প্রেস ব্রিফিংয়ে নাগরিকত্ব আইনটি প্রকাশ করে বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি মোদির সঙ্গে কথা বলেছেন। মোদি তার দেশে সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে চলেন, তাই যৌথ ব্রিফিংয়ে প্রশ্ন নেয়া সম্ভব  হয়নি। পরবর্তীতে ট্রাম্প একক এক সাংবাদিক সম্মেলন করেছিলেন এবং অতিথি দেশটির মিডিয়ার মুখোমুখি হন।

নাগরিকত্ব আইন নিয়ে ফের আলোচনা করা হলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কথা বলেছিলেন এবং প্রতিবাদকারীদের আচরণ নিয়েই প্রশ্ন তোলেন। এভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভারতের বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপের বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন এবং বলেছেন ভারতই এ ব্যাপারে ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে । 

তবে মার্কিন ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন এবং মার্কিন কংগ্রেস ততক্ষণ পর্যন্ত মুখ খুলবে  না, যতক্ষণ ভারত তাদের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত স্বার্থ পূরণ করে যাবে বা তাদের স্বার্থকে সমর্থন করতে থাকবে। একই সঙ্গে, ওয়াশিংটন এমন জায়গায় পৌঁছানো থেকেও  বিরত থাকবে যেখানে মোদি এবং জাতীয়তাবাদীরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।  

পাকিস্তানের গণমাধ্যমগুলো কাশ্মীর ও পাকিস্তান সম্পর্কে মার্কিন প্রেসিডেন্টের অবস্থান নিয়ে খুব উত্তেজিত ছিল। অন্যদিকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো আহমেদাবাদ স্টেডিয়ামে ট্রাম্পের মুখে পাকিস্তানের নাম নেয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। 

ট্রাম্পের এই সফরের বিভিন্ন উদ্দেশ্য ছিল এবং এই সফরকালে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং ভারতীয় জনগণকে খুশি করার জন্য অনেক কিছুই বলেছেন। ভারত সরকার ও জনগণের অনুভূতির জন্য পাকিস্তানকে উপেক্ষা করা আমেরিকার স্বার্থে নয়,তবুও পাকিস্তানি মিডিয়াগুলো ট্রাম্পের এমন আচরণে  সন্তুষ্ট হতে পারেনি। 

কারণ, আহমেদাবাদ স্টেডিয়ামে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, পাকিস্তানের বর্ডারে ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আমেরিকা এবং পাকিস্তান উভয়ে মিলেমিশেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। আবার যখন তিনি মোদির সঙ্গে সাক্ষাত করলেন, তখন বললেন তার ঠিক উল্টো কথা। যেন তিনি নিজের এই দু মুখো অবস্থানে ভারতকে খুশি করতে চাইলেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট আবারও কাশ্মীর নিয়ে মধ্যস্থতার আহ্বান জানিয়েছিলেন, কিন্তু এবার মধ্যস্থতার উপর জোর দেয়ার পরিবর্তে পাকিস্তান ও ভারত কাশ্মীর ইস্যু সমাধানের জন্য কাজ করতে চায় বেশি । 

মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য একটি ইতিবাচক দিক। উভয় দেশের শাসকরা এ জাতীয় কোনোর কিছুর আকাঙ্ক্ষাও করেননি। 

একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট যিনি ব্যক্তিগত ব্যবসায় ও কূটনৈতিক বিষয় পরিচালনার জন্যও পরিচিত, তার এই সফরে পাক-প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এবং মোদি উভয়ই বন্ধুত্বপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়েছিল, কিন্তু মোদি এটিকে এক কঠোর অবস্থান বলে আখ্যায়িত  করেছেন।

কাশ্মীরের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে মধ্যস্থতার প্রত্যাশা  হ্রাস পাবে এবং ফলাফল ইসরাইযল-ফিলিস্তিনি দ্বন্দ্ব সমাধানের মতো হতে পারে। পাকিস্তান ও ভারত কাশ্মীর সমস্যা সমাধানের জন্য কাজ করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্য আরও বেশি মনোযোগী। 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট কি উভয় দেশকে আলোচনার টেবিলে আনতে রাজি হয়েছেন? দু’দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীই এর উত্তর দিতে পারেন।

ট্রাম্পের এই সফরে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির প্রত্যাশা করছিল ভারত। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মোদির এজেন্ডা বাস্তবায়ন কোনো এক ক্ষেত্রে  বাধাগ্রস্থ হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দেশে ফিরে আসার পাশাপাশি বিশ্বের মার্কিন পণ্যগুলোর উপর আরোপিত কর ও শুল্ক হ্রাস চাচ্ছেন তিনি।  

অন্যদিকে মোদি চান, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অন্যান্য ব্যবসায়ী সংস্থাগুলো ভারতে এসে ব্যবসা করুক এবং তিনি শুল্কের ক্ষেত্রে ছাড় দিতেও সম্মত আছেন। 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নভেম্বরের আগে ভারতের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি করতে চান যাতে তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে এই কৃতিত্বের বিষয়ে ভোট দিতে পারেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের সফরের আগে নাগরিকত্ব আইন এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা সম্পর্কে মার্কিন কর্মকর্তাদের দেয়া বক্তব্য মূলত ভারতকে চাপ দেয়ার জন্য ছিল। 

ট্রাম্পও একই উদ্দেশ্য নিয়ে পাকিস্তানের ভূমিকা ও নাগরিকত্ব আইনের বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট  ২৯ ফেব্রুয়ারি দোহায় আফগান তালেবানদের সাঙ্গে একটি শান্তিচুক্তি হিসাবে পাকিস্তানের দিকে তাকিয়েছিলেন এবং পাকিস্তান ঘোষণা দিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি যুদ্ধের সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে চান তবে তা কেবল পাকিস্তানের কারণে সম্ভব হবে। যুক্তরাষ্ট্রকে তার কাঙ্ক্ষিত উপহার দেয়নি ভারত। 

মার্কিন প্রেসিডেন্টের সফরের আর একটি উদ্দেশ্য ছিল চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে প্রতিহত করা এবং এই উদ্দেশ্যে তিনি আংশিক সাফল্যও পেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে অ্যাপাচি হেলিকপ্টারগুলোর সঙ্গে ভারত ৩ বিলিয়ন ডলার প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে এবং এই হেলিকপ্টারগুলো ভারত মহাসাগরে চীনের শক্তি মোকাবেলায় সহায়তা করবে।

ঐতিহ্যগত দিক থেকে ভারতে রাশিয়ার অস্ত্র ক্রেতা ছিল, কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে এবং ২০০৮ সাল থেকে ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কিনেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ৫ জি নেটওয়ার্কের কথাও বলেছেন। ৫ জি ইস্যুতে বিশ্ব বিভক্ত হয়ে পড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের চীন থেকে ৫ জি প্রযুক্তি গ্রহণ করতে নিষেধ করছে। 
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রযুক্তি যুদ্ধটি কেবল বিশ্বকেই নয়, ইন্টারনেটকেও বিভক্ত করেছে। বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট পরিষেবা সরবরাহকারী বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে একটি স্বতন্ত্র নিয়ন্ত্রণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে। ভারত চায় না যে কোনও দেশই এই অঞ্চলে প্রভাব ফেলুক, কারণ ইস্যু নিয়ে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রকে এখনও কোনও আশ্বাস দেয়নি।


‘আমরা ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মুক্ত-চলাচলের জন্য সন্ত্রাসবাদ, সাইবার সুরক্ষা, সামুদ্রিক সুরক্ষার সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে চাই’ ভারত সফরকালে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন বক্তব্যের মাধ্যমে বাস্তবে ভারত মহাসাগরে চীনের প্রভাব ভেঙে ফেলা হয়েছে।

ঘোষণাটি হল, চীন ভারত মহাসাগরে তার শক্তি বৃদ্ধি করেছে এবং সমুদ্র সুরক্ষায় ভারতের প্রতিবেশীদের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়িয়েছে, যা কেবল ভারতের পক্ষে বিপজ্জনক নয় আমেরিকাও এই অঞ্চলে চীনের নেতৃত্ব মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছিলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্লু ডট নেটওয়ার্কে বেশ কয়েকটি অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছে। নীল ডট নেটওয়ার্কের লক্ষ্য ভবিষ্যতের অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলো নিরাপদ, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিতামূলকভাবে নির্মিত এবং এই অঞ্চলের দেশগুলোতে উচ্চ-মানের উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বেসরকারী খাতে স্থিতিশীল এবং নির্ভরযোগ্য বিকল্প রয়েছে তা নিশ্চিত করা।

ট্রাম্পের ভারত সফর এই অঞ্চলে সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতার নতুন পথ উন্মুক্ত করবে। এই সহযোগিতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের মধ্যে হবে, তবে আমেরিকাও এই অঞ্চলে তার উপস্থিতি বজায় রাখতে এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করবে।

এমনকি আফগানিস্তানে শান্তি চুক্তির পরেও আফগানিস্তানের পুনর্গঠন ও সন্ত্রাসবাদকে আবারও মাথাচাড়া দেয়া থেকে বাধা দেয়ার ক্ষেত্রে  সহায়তার জন্য আমেরিকার সহযোগিতার প্রয়োজন হবে। 

ভারত আফগানিস্তানে এমন একটি ভূমিকা চায় যা তা অবিলম্বে খুঁজে পেতে পারেনি, তবে ব্লু ডট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী অবকাঠামোর নামে যে প্রকল্পগুলো করা হবে তাতে ভারতও জড়িত থাকবে এবং যুদ্ধের কারণে আফগানিস্তান ব্লু ডট নেটওয়ার্কের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হবে। বিধ্বস্ত দেশের পুনর্নির্মাণ একটি বড় প্রকল্প এবং সমস্ত দেশ এই প্রকল্পে অংশ নিতে প্রস্তুত।

তারপরও প্রতিযোগিতাটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যেও প্রসারিত হবে যা প্রযুক্তি থেকে অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলো পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই থাকবে।

পাকিস্তানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ডন অনলাইনে লেখা আসিফ শাহেদের কলামটি উর্দূ থেকে ভাষান্তর করেছেন -মুহাম্মদ বিন ওয়াহিদ 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : ট্রাম্পের ভারত সফর