মনে হলো ১০০ বোমা পড়েছে হাসপাতালের ছাদে
গাজার আল আহলি আরব হাসপাতালের সেদিনের সেই হামলার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরলেন অর্থোপেডিক বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. ফাদেল নাঈম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- হৃদিতা ইফরাত
Advertisement
হৃদিতা ইফরাত
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৩, ১০:৪৫ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সে সময়ের স্মৃতি মনে পড়লে এখনো আতঙ্কে গা শিউরে উঠে! বিস্ফোরণের সময় আমি হাসপাতালেই ছিলাম। একজন রোগীর অস্ত্রোপাচারের সময় আকস্মিক শব্দে চমকে উঠেছিলাম। খেয়াল করলাম হাসপাতালে ফলস ছাদ ভেঙে পড়ছে। মনে হলো প্রায় ১০০টি বোমা হাসপাতালের আশপাশে ছোড়া হয়েছিল।
এ এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। জীবনে এমন ভয়াবহ দিন আর দেখিনি। প্রায় ৩০-৪০ জন আমরা একসঙ্গে ছিলাম। আমরা শুধু কোনোরকম রাতটা পার করতে চেয়েছিলাম। সূর্য উঠার অপেক্ষায় ছিলাম যাতে জরুরি নির্দেশের মাধ্যমে আমাদের অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসক কর্মী, স্বেচ্ছাসেবক এবং নার্সদের নিয়ে দ্রুত রোগীদের চিকিৎসা শুরু করতে পারি।
রাতভর তাণ্ডবের পর সকাল থেকেই হাসপাতালের কর্মীরা মেরামত শুরু করে। করিডরের মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রক্ত এবং বর্জ্য পরিষ্কার করা হয়। বিস্ফোরণের ২৪ ঘণ্টা পর হাসপাতালটি চিকিৎসার কার্যকর হয়।
অপ্রত্যাশিত এবং অমানবিক হামলায় হাসপাতালের পরিকাঠামো, পানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ, নেট সংযোগ এবং অস্ত্রোপচারের কিছু মেশিন নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। হাসপাতালের পরিবেশ আমাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন এবং দুঃখজনক ছিল। স্বজন হারানোর বেদনায় চতুর্দিকে মানুষের আহাজারিতে হাসপাতাল প্রাঙ্গণ আরও ভারী হয়ে উঠেছিল।
অসহায় রোগী বিশেষ করে মায়েরা বুকফাঁটা চিৎকার করছিলেন। সাহায্যের জন্য বারবার আকুতি জানাচ্ছিলেন। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে আমাদের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া বেশ কষ্টকর হয়ে উঠেছিল। এতা এত আহতদের ভিড়ে আমরা কাদের ছেড়ে কাদের সাহায্য করব।
এরপর আমরা প্রথমে রক্তক্ষরণের বন্ধের চেষ্টায় কাজ করতে লাগলাম। কারও ছিল ভাস্কুলার ইনজুরি, কারও মাথায় প্রচণ্ড আঘাত লেগেছিল, কেউবা বুকে ব্যথা পেয়েছিল। বুকে আঘাতপ্রাপ্তদের টিউবের সাহায্যে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা শুরু করা হয়। অ্যাম্বুলেন্স এবং সিভিল ডিফেন্সের সহায়তায় আহত ব্যক্তিদের গাজার সবচেয়ে বড় হাসপাতাল শিফা হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। চিকিৎসা দিতে গিয়ে হাসপাতালে আমরা নানারকম অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছি।
হাসপাতালে কর্মীদের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কর্মীরা নিজ নিজ বাসস্থানে আটকা পড়েছে। পরিবহণ ব্যবস্থার সুযোগ না থাকায় অনেকে ইচ্ছা থাকা সত্বেও কর্মস্থলে ফিরতে পারছে না। হাসপাতালে এখন উপচে পড়া ভিড়। কিন্তু সে তুলনায় রয়েছে জায়গা সংকুলান। প্রয়োজনীয় বিছানা নেই।
আল আহলিয়া একটি ছোট। এখন আমরা ৪০ জন কাজ করছি এবং আমাদের ক্ষমতা সাধারণত ৫০-৮০ শয্যা। সবচেয়ে বেশী যে সমস্যায় পড়ছি তা হলো প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রের অভাব। অসংখ্য রোগীদের সামান্য চেতনানাশক আবার কখনও কখনও চেতনানাশক ছাড়াই অস্ত্রোপাচার করতে হচ্ছে।
উচ্চ রক্তচাপ, শ্বাসকষ্ট এবং দীর্ঘস্থায়ী সমস্যায় আক্রান্ত ভুক্তভোগী রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। গাজায় আরও একটি বড় সমস্যা হলো জ্বালানি ঘাটতি। জ্বালানি ছাড়া হাসপাতাল চালানো যায় না। আমাদের ১০৬৬ আইসিইউ রোগী আছে যারা পুরোপুরিভাবে মেশিনের ওপর নির্ভরশীল। এমনই চলতে থাকলে তারা মারা যাবে।
বিস্ফোরণের পর হাসপাতালে অসংখ্য মৃতদেহ ছিল যাদের শনাক্ত করা যায়নি। অজ্ঞাত মৃতদেহগুলোর ছবি তোলার পর নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এরপর শেষে তাদের গণকবরে দাফন করা হয়। বড় হামলাটির ৩ দিন আগে, ১৪ অক্টোবর হাসপাতালে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইসরাইল। হাসপাতালের পরিচালক একটি ফোন পান।
হাসপাতাল খালি করতে বলে ইসরাইল। তবে আলোচনার পর আমাদের প্রশাসন এবং জেরুজালেমের বিশপ, যিনি হাসপাতালের প্রশাসনিক পরিষদের প্রধান সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন হাসপাতাল খালি করা হবে না। কেননা সব আন্তর্জাতিক সংস্থা রেড ক্রস এবং জাতিসংঘের সংস্থাগুলো থেকে তারা আশ্বস্ত হয়েছেন হাসপাতাল নিরাপদ এবং কেউ মনে করে না এমনটি ঘটতে পারে।
আমরা এও জানি গাজার সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালকে ইসরাইলি সেনাবাহিনী সরে যাওয়ার জন্য সতর্ক করেছে। কিন্তু আমরা এটা করতে পারি না। কারণ আমাদের কাছে এমন রোগী আছে যাদের অস্ত্রোপচারের জন্য স্থানান্তর করা সম্ভব নয়। রোগীদের কেউ রেসপিরেটরি মেশিনে, কেউবা আইসিইউতে। অনেকে শুধু নিরাপত্তার জন্য হাসপাতালে এসে থাকছেন।
ডা. ফাদেল নাঈম চেয়ারম্যান, অর্থোপেডিক বিভাগ
আল আহলি আরব হাসপাতাল, গাজা, ফিলিস্তিন
