Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

ইসরাইলি হামলায় আরও ঐক্যবদ্ধ ইরানি জনসাধারণ

Advertisement

Icon

মোহাম্মদ ইসলামি ও ইব্রাহিম আল-মারাশি

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ইসরাইলি হামলায় আরও ঐক্যবদ্ধ ইরানি জনসাধারণ

Advertisement

ইসরাইল দৃশ্যত ১৯৮০ সালের ইরানের ইরাক আক্রমণ থেকে কোনো শিক্ষাই গ্রহণ করেনি। তারা বরং ইরানের শাসক পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে। আর এতে করে দেশটির জনসাধারণের ধর্মীয় এলিটদের প্রতি ভালোবাসা না থাকলেও ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির পেছনেই সংঘবদ্ধ হচ্ছে। অর্থাৎ ইরানে ইসরাইলের হামলার ফলে দেশটির অভ্যন্তরীণ বিভেদ না বাড়িয়ে বরং জাতীয়তাবাদী অনুভূতি চাঙা করছে। আর তা তারা শাসকদের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করার জন্য নয়, বরং জাতির প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ছে।

তারা ব্যাপক উপস্থিতিতে ইসরাইলি হামলায় নিহতদের জন্য শোক পালন করছে, অনলাইনে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা হচ্ছে। এমনকি যারা একসময় ‘ওম্যান, লাইফ, ফ্রিডমে’র মতো স্লোগানের ব্যানারে আন্দোলনে জড়িত ছিল, তারা এখন ‘দেশের রক্ষাকারী’ সংগঠনের মাধ্যমে সংহতি প্রকাশ করছে। আবার শ্রমজীবী ও গ্রামীণ এলাকাগুলোতে বিরোধী আন্দোলন আগে তেমন গুরুত্ব পেত না। এখন সেখানে দেশ রক্ষার আবেগ আগের চেয়ে জোরালো হয়েছে।

ফলে ইরানি জনগণকে বিভক্ত করার ইসরাইলি চেষ্টা অন্তত বর্তমান সময়ের জন্য হলেও হিতে বিপরীত হয়েছে। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের টার্গেট করাকে অনেক ইরানিই জাতীয় সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি হামলা হিসাবে অভিহিত করছে।

ইসরাইলি হামলায় ইরানি সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ মোহাম্মদ বাঘেরি, ইসলামিক রেভ্যুলশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) প্রধান হোসেইন সালামি, আইআরজিসির অ্যারোস্পেস ফোর্সের কমান্ডার আমির আলী হাজিজাদেহসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন। এর ফলে ইরানি সামরিক বাহিনীর শীর্ষ স্তরটিতে প্রবল ঝাঁকুনি লাগে। তারা প্রান্তিক কোনো ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। তারাই ছিলেন ইরানের আঞ্চলিক প্রতিরোধের স্থপতি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করাটা ইসরাইলি অভিযানের প্রকৃতি ও লক্ষ্য সম্পর্কে বিশেষ ইঙ্গিত দেয়।

তবে এ হামলা কেবল ইরানের পরমাণু শক্তি অর্জনকে ভণ্ডুল করার উদ্দেশ্যে হয়নি। বরং ইসরাইল চেয়েছে ইরানের কৌশলগত কমান্ড কাঠামোকে উড়িয়ে দিতে। তারা আশা করেছিল, এর ফলে ইরানি সাধারণ মানুষ কোনো বাধা ছাড়াই শাসকদের পরিবর্তনের জন্য মাঠে নামবে।

কিন্তু ইসরাইল সম্ভবত অনিচ্ছাকৃতভাবেই ইসলামি প্রজাতন্ত্রটিকে শক্তিশালী একটি রাজনৈতিক উপহার দিয়ে ফেলেছে। আর তা হলো একটি অভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে ইরানিদের মধ্যে সংহতি সৃষ্টি।

ইসরাইল অনেক বছর ধরেই একটি শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও ভূখণ্ডগতভাবে অখণ্ড ইরানকে তার ভূ-রাজনৈতিক হুমকি হিসাবে বিবেচনা করে আসছে। ইরানকে ইসরাইল কেবল একটি বৈরী দেশই মনে করে না, বরং সেই সঙ্গে আঞ্চলিক সভ্যতাগত প্রতিদ্বন্দ্বীও বিবেচনা করে। এ কারণে ইসরাইল চায় ইরানকে সংযত রাখতে। কেবল পরমাণু কর্মসূচিতেই নয়, বরং রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক সংহতির দিক থেকেও ইরানকে দমন করতে চায় ইসরাইল।

এ কারণেই কয়েক দশক ধরে ইরানকে টার্গেট করে গোপন অভিযান পরিচালিত হয়েছে, কূটনৈতিকভাবে দেশটিকে একঘরে করার চেষ্টা চালানো হয়েছে, অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হয়েছে। একইসঙ্গে সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যও নির্ধারণ করে রেখেছে, ইরানকে ভেঙে কয়েকটি টুকরা করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

এ ধরনের পরিকল্পনাগুলো একসময় ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের শীর্ষ পর্যায়ের যুদ্ধংদেহীদের কাগজপত্রে সীমিত ছিল। কিন্তু ২০২২ সালে মাশা আমিনির মৃত্যুর পর ইরানজুড়ে বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে এগুলো সামনে চলে আসে। ‘ওম্যান, লাইফ, ফ্রিডম’ স্লোগানের আওতায় ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করা হতে থাকে।

এটাকে সুযোগ মনে করে যুক্তরাষ্ট্রও ইসরাইলবিরোধী গ্রুপগুলোর প্রতি তাদের সমর্থন জোরদার করে। প্রবাসী ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভিসহ অনেকেই প্রতীকী চরিত্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। রেজা পাহলভির ইসরাইল সফর ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। তার বিবৃতিগুলোতে প্রকাশ্যে ইসলামি প্রজাতন্ত্রটিকে উৎখাত করার জন্য সমন্বিত সমর্থনের আহ্বান জানানো হয়। এমন আহ্বান ছিল নজিরবিহীন।

ইসরাইলের পক্ষ থেকে বলা হতে থাকে, এ যুদ্ধ ইরানের বিরুদ্ধে নয়, বরং ইরানের শাসকদের বিরুদ্ধে। একইসঙ্গে এ অভিযানের প্রতি জনসাধারণের সমর্থনও কামনা করা হয়। পাহলভি এবং সাবেক ফুটবলার আলী কারিমিসহ প্রবাসী অনেকেই এ আহ্বানের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেন। তারা সরকার পতনের আন্দোলনে শরিক হতে ইরানিদের প্রতি আহ্বান জানান। সুস্পষ্টভাবে এ ধরনের বক্তব্য রাখা হলেও ইরানের মানুষ তাতে সাড়া দেয়নি।

ইসরাইলি নেতারা এবং তাদের মিত্ররা যেটাকে সম্ভবত অবমূল্যায়ন করেছিলেন, সেটা হলো ইরানের জনসাধারণের মধ্যে গভীরভাবে থাকা তাদের ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রতিরোধের আগ্রহ। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরোধিতা ব্যাপকভাবে প্রধানত তরুণ জনগোষ্ঠী ও শহুরে লোকজনের মধ্যে সীমিত ছিল। তবে বিদেশি সামরিক বাহিনী কর্তৃক ইরানের মাটিতে ইরানি কমান্ডারদের হত্যা তাদের ওই মনোভাবে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটায়।

বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইরানিদের মনোভাবে এ পরিবর্তন স্রেফ প্রতীকী কোনো বিষয় নয়। ২০১৯ সালে জ্বালানি নিয়ে বিক্ষোভ কিংবা আমিনিকে নিয়ে যে প্রতিবাদ হয়েছিল, এবারের ঘটনা সেগুলোর সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা এখন সাময়িকভাবে হলেও অভ্যন্তরীণ ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এ আক্রমণের মাধ্যমে আসলে সাদ্দাম হোসেনের পর্যায়ে নেমে গেছেন। সাদ্দামও একই ভুল করেছিলেন। ১৯৮০ সালে তিনি ইরান আক্রমণ করেছিলেন। আর তা আয়তুল্লাহ খামেনির পতন ঘটায়নি। বরং ইরানের বিভিন্ন বিপ্লবী গ্রুপের মধ্যে খামেনির টলটলায়মান অবস্থানকে সুসংহত করে দিয়েছিল।

অবশ্য ইরানের এ ঐক্য স্থায়ী হবে এমনটি বলার সময় এখনো আসেনি। প্রজন্মগত, মতাদর্শগত এবং অর্থনৈতিক বিভাজনরেখায় ইরানি সময় গভীরভাবেই বিভক্ত রয়েছে। তবে এখন পরিষ্কার, ইসরাইলি হামলা ইরানি সরকারের পতনকে ত্বরান্তিত করছে না। বরং এ হামলা ইরানি সরকারের পতনকে বিলম্বিত করছে। আর দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনায় ইসরাইলের সর্বশেষ এ অভিযানকে সে কী কী ধ্বংস করতে পেরেছে, সেজন্য মনে রাখা হবে না, বরং অনিচ্ছাকৃতভাবে কী কী সুসংহত করেছে, সেজন্যই স্মরণ করা হবে।

মিডল ইস্ট আই থেকে অনূদিত

মোহাম্মদ ইসলামি : সহকারী অধ্যাপক, ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স, মিনহো বিশ্ববিদ্যালয়, পর্তুগাল; ভিজিটিং ফেলো, ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি, ডাবলিন সিটি ইউনিভার্সিটি, আয়ারল্যান্ড

ইব্রাহিম আল-মারাশি : সহযোগী অধ্যাপক, মিডল ইস্ট হিস্টোরি, ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি স্যান মারকোস, যুক্তরাষ্ট্র

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

ফ্রান্সের পথ ধরে এবার বড় ধরনের শঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র, নেপথ্যে দুই কারণ

ফ্রান্সের পথ ধরে এবার বড় ধরনের শঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র, নেপথ্যে দুই কারণ

দেশের শত্রুদের পরাজিত করতে হবে: মোদি

দেশের শত্রুদের পরাজিত করতে হবে: মোদি

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে হামলা, জরুরি সতর্কতা জারি

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে হামলা, জরুরি সতর্কতা জারি

ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনার পর নেতানিয়াহু ইরানের সরকার পতনে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ

ইরানের সরকার পতনে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম