শরাফাত আলীর অনলাইন কুরবানি
jugantor
রম্য রচনা
শরাফাত আলীর অনলাইন কুরবানি

  মুহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ  

০১ আগস্ট ২০২০, ১১:৩৯:৫১  |  অনলাইন সংস্করণ

দেড় লাখ টাকা দামের ‘বীর বাহাদুর’ দিয়ে গত বছর কোরবানি দেয়া শরাফাত আলী এ বছর বেশ ভাবনায় পড়ে গেলেন। ব্যবসায় ভাটা পড়লেও সেই পরিমাণ টাকা তার হাতে আছে। বরং ওই দামের দু তিনটা গরু চাইলে তিনি কিনে ফেলতে পারেন। 
ফাইল ছবি

দেড় লাখ টাকা দামের ‘বীর বাহাদুর’ দিয়ে গত বছর কোরবানি দেয়া শরাফাত আলী এ বছর বেশ ভাবনায় পড়ে গেলেন। ব্যবসায় ভাটা পড়লেও সেই পরিমাণ টাকা তার হাতে আছে। বরং ওই দামের দু তিনটা গরু চাইলে তিনি কিনে ফেলতে পারেন। 

তাই ভাবনার বিষয় তার টাকা নয়, যেভাবে সামাজিক দূরত্ব বলে বলে মাথা খারাপ করে দিচ্ছে, তাতে করে গরুর হাটে গিয়ে সবচেয়ে দামি গরুটা কিনে গলায় মালা পরিয়ে শো-ডাউন দিয়ে নিয়ে আসায় বিশেষ কোনো ভরসা পাচ্ছেন না।

বন্ধু, স্বজন, স্ত্রী-পুত্র কেউ সমর্থনও করছেন না গরুর হাটে যাওয়া। তাহলে কী গতবারের মতো শোডাউন এবার হবে না! গরু কিনে যদি মানুষকে দেখানো না যায়, পথে পথে লোকের করা প্রশ্নের ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে উত্তর দেয়ার সেই পুলক কি এবার ঘরে বন্দী হয়ে থাকবে? 

শরাফত আলীর কাছে বিষয়টা মুশিকিলের মনে হলেও তিনি খুব বেশি ভাবার ফুরসত পেলেন না। মুশকিল আসান করতে ম্যানেজার জানালেন এখন নাকি গরু অনলাইনেই পাওয়া যায়। কয়েকটি পেজ ও ওয়েবসাইটে গরুও দেখিয়ে গেলেন। 

অনলাইনে গরু কেনার ব্যাপরটা শরাফত আলীকে ততট অবাক করতে পারেনি, যতটা অবাক করেছে অনলাইনে গরু কেনায় পঞ্চাশ শতাংশ ক্যাশ ব্যাক অফার। আরেক সাইট আবার কিস্তি অফার করেছে। কিস্তিতে গরুর দাম পরিশোধ ভাবা যায়!

ম্যানেজারের দীর্ঘ সময়ের মোটিভেশনাল কথাবার্তার প্যাঁচে পড়ে অবশেষে তিনি রাজি হয়ে গেলেন অনলাইনে গরু কিনতে। তবে অফার হিসেবে কিস্তিকেই বেছে নিলেন। কিস্তির বিষয়ে শরাফাত আলীর নিজস্ব দর্শন হল: একবার নিলে আর শোধ করা লাগে না। 

ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করলেই হিসাব পাওয়া যাবে কয়টি ব্যাংকে তার কতো কোটি টাকার কিস্তি খেলাপি হয়ে পড়ে আছে। গরুর ক’টা কিস্তি খেলাপি হলে তেমন কী আর অপরাধ বা পাপ হবে। পাপ যেটুকুন হবে তা কুরবানির সওয়াবে কাটাকাটি হয়ে যাবে।

বড়সড় ধাক্কাটা শরাফত আলী খেলেন অনলাইনে অর্ডার প্লেস করতে গিয়ে। ই-কমার্স কোম্পানি শর্ত জুড়ে দিয়েছে মোট দামের আশি শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিতে হবে। বাকিটা কিস্তি।

মনে মনে গালি আওড়ান দেশে যে কী হিডেন চার্জওয়ালা ব্যবসা শুরু হল। অফারে তো এই শর্ত ছিল না! ম্যানেজার বোঝালেন কিস্তির চেয়ে বরং ক্যাশ ব্যাক অফারে যাওয়াই ভালো হবে। সেখানে গিয়েও ধাক্কায় মাফ পেলেন না। 

ক্যাশ ব্যাক বলে যে অফার দেয়া হয়েছে সেটা নগদ অর্থ না। এই টাকা নাকি ওয়েবসাইটে তার অ্যাকাউন্টে ক্রেডিট হয়ে থাকবে। সেটা ব্যবহার করে তিনি তাদের সাইট থেকে যে কোনো পণ্য কিনতে পারবেন। 

শরাফাত আলীর ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসির রেখা ফুটে উঠল। যার অর্থ হল তার মতো ধান্দাবাজের অভাব দেশে নাই। ম্যানেজারের মোটিভেশনাল বক্তব্যকে টেক্কা মেরে শেষমেষ শরাফাত আলী কিস্তি অফারটি-ই লুফে নিলেন। ভিসা কার্ড দিয়ে পেমেন্টও করে দিলেন নিমিষেই। কিস্তির টাকা দিয়ে খেলা দেখানোর সুযোগ হাতে তো রইলই।

ঘরে বসেই গরু কেনার বন্দোবস্ত হওয়াতে যে ফুরফুরে মেজাজ থাকার কথা, শরাফত আলীর মনে তা নেই। এখন চিন্তা এসে ভর করেছে এই মহামারীতে গরু জবেহ করার লোক পাওয়া যাবে তো! কসাই বাড়িতে এনে কাজ করানোতেও তো ঝুঁকি। কী করা যায় ! কী করা যায়! 

ভেবে ভেবে কূলের দেখা পাচ্ছিলেন না যখন, তখন কূলের সন্ধান নিয়ে হাজির হল ছোটো ছেলে অয়ন। স্মার্টফোনের স্ক্রিন চোখের সামনে ধরে বলল, দেখ বাবা মিট প্রসেসিং কোম্পানির বিজ্ঞাপন। আমাদের কোনো চিন্তাই নেই এবার। এই কোম্পানিকে দিয়ে দিলে এরাই সব কাজ করে দেবে। জবেহ করে চামড়া ছাড়িয়ে মাংস বানিয়ে প্যাকেট করে বাসায় পৌঁছে দেবে। দারুণ আইডিয়া না!

আইডিয়া শরাফাত আলীর খুব বেশি পছন্দ না হলেও ছেলের জোরাজুরিতে রাজি হতেই হল। ছেলের খুশির কাছে চোখের সামনে মাংস বানানোর দৃশ্যের মজা হেরে গেল। মিট প্রসেসিং কোম্পানিকে অর্ডার কনফার্ম করে যেই উঠতে যাবেন অমনি ম্যানেজার এসে জানালেন আরেক চমকপ্রদ তথ্য। তিনিও স্মার্টফোনের দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, এই দ্যাখেন স্যার, এসএমএম সার্ভিস।

-এসএমএম সার্ভিস আবার কী?

-স্যার এইটা হইল গিয়া সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং সার্ভিস।

-মার্কেটিং দিয়া কী করব আমরা?

-স্যার এরা আমাদের কেনা ‘বাঘা বাহাদুর’ এর নামে পেজ খুলে যাবতীয় সেটাপ করে দেবে। এদের নিজস্ব বিউটিশিয়ান দিয়ে গরুকে সাজিয়ে দেবে। মালা পরিয়ে বিভিন্ন লোকেশানে গিয়ে ফটোশুট করবে। 

তারপর তা পেজে আপলোড করে একশ দু’শো ডলারের বুস্ট করে দেবে। ব্যাস পুরো দেশবাসী আপনার ‘বাঘা বাহাদুরকে’ চিনে যাবে।

-বাঘা বাহাদুরটা কে?

-স্যার আমরা যে গরুটা অনলাইনে কেনার জন্য কনফার্ম করলাম ওটার নাম।

-কেয়াবাৎ! দেশ তো এগিয়ে যাচ্ছে। সবকিছুই অনলাইনে পাওয়া যায়! বাথরুম পরিষ্কারের মেথরও কি অনলাইনে পাওয়া যাবে?

-সার্চ দিলে স্যার নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে।

সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিংয়ের ব্যাপারটা বেশ মনে ধরল শরাফাত আলীর। গলায় মালা পরিয়ে রাষ্ট্র ঘোরানোর স্বাদ কিছুটা হলেও এই অনলাইন ঘোলে মিটবে। এই অর্ডারও কনফার্ম করা হল। সব ব্যবস্থা অনলাইনে হয়ে যাওয়াতে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে জুমার নামাজের প্রস্তুতি নিতে গেলেন তিনি।

স্বস্তির আশি ভাগ উবে গেল মসজিদে ইমাম সাহেবের খুৎবায় । কিস্তিতে গরু কেনার ব্যাপারটা নিয়ে নাকি দেশজুড়ে আলোচনা হচ্ছে। কোনো আলেমই নাকি একে জায়েয মনে করেন না। 

তাদের বক্তব্য হল, কুরবানি ওয়াজিব হয় সামর্থ্যবানের ওপর। সব খরচ বাদ দিয়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বা সম্পদ হাতে গচ্ছিত থাকলেই কেবল কুরবানি করতে হবে। 

হাতে অর্থ আছে বলেই তো কুরবানি দিবেন। তাহলে সেটা কিস্তিতে কেন? ইমামের ফতোয়া শুনে দ্বিধায় পড়ে গেলেন শরাফাত আলী। অনলাইনে অর্ডার কনফার্ম করা হয়ে গেছে। এখন কী করবেন? পরক্ষণেই আবার ভাবলেন নিশ্চয়ই এর সমাধানও অনলাইনে পাওয়া যাবে।

বাড়িতে গিয়ে ছেলেকে ডেকে ইমামের ফতোয়ার বিষয়ে অবহিত করলেন। বললেন, দ্যখো তো বাবা এই বিষয়ক কোনো সমাধান অনলাইনে আছে কি না। অনেক খুঁজে-টুজে ছেলে সমাধান নিয়ে হাজির। 

ই-শরীয়া ডটকমের অফার বাবার কাছে তুলে ধরল ছেলে। ‘দ্যাখ বাবা, এরা কুরবানিসহ যে কোনো মাসআলার সমাধান দিয়ে থাকে, মাসআলা ক্লায়েন্টের বিপক্ষে গেলে এরা কোনো ফি নেয় না। তবে প্যাকেজ মূল্য অগ্রীম পরিশোধ করতে হবে। উত্তর নেগেটিভ হলে টাকা রিফান্ড করবে।

এই অফারও মনে ধরল বেশ। অনলাইনে অর্ডার করে দিলেন কিস্তিতে গরু কেনার জায়েজ-নাজায়েজ বিষয়ের সমাধান পেতে। ঘণ্টাখানিক পড়েই উত্তর আসল, যেহেতু আপনি মূল্য পরিশোধের অঙ্গীকার করেছেন, সেহেতু কিস্তিতেও গরু কেনা জায়েজ হবে।

সমাধান পেয়ে হাফ ছেড়ে বাঁচলেন, যদিও প্রশ্ন তার মনে থেকেই গেল। পজিটিভ উত্তর পেমেন্ট হালাল করার জন্য নয় তো! হতেও তো পারে। তার মতো লোক তো আর দেশে একটা না।

অফার তার কাছে আরো আসল। ইনস্যুরেন্স কোম্পানির অফার। কুরবানির আগ পর্যন্ত গরু হারিয়ে গেলে বা মারা গেলে তারা ক্ষতি পোষাতে ইনস্যুরেন্স কাভারেজ দিয়ে থাকে। অফারটি দেখে তাজ্জব বনে গেলেন তিনি। 

ম্যানেজার বোঝালেন স্যার অল্প কয়েক টাকার প্রিমিয়াম দিয়ে যদি গরুর নিরাপত্তা পাওয়া যায় তাহলে ক্ষতি কী! নাকে তেল দিয়ে ঘুমাতে পারবেন। শরাফাত আলী ইনস্যুরেন্সও করিয়ে নিলেন গরুর জন্য। বলা তো যায় না কখন কী হয়! দেখা গেল করোনাক্রান্ত হয়ে গরু মারা গেছে।

কুরবানির দিন ঈদের নামাজ পড়ে বাসায় এসে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন শরাফাত আলী। কখন আসবে গোশত। কষানো মাংস মুখে দিয়ে স্বাদের জগতে হারিয়ে যাবেন। 

কিন্তু তার হারানো আর হলো না মিট প্রসেসিং কোম্পানির পাঠানো ক্ষুদে বার্তা পেয়ে। লোকবল সঙ্কটের কারণে তারা আজকে গরুটি জবেহ করতে পারছেন না বলে আন্তরিকভাবে দুঃখিত। পরবর্তী শিডিউল জানতে ভিজিট করতে হবে তাদের ওয়েবসাইট।

বার্তা পড়ে হাতের সেটা আছাড় মেরে বললেন, নিকুচি করি তোদের এই অনলাইন সার্ভিসের। সবকটাকে জবাই করব আমি। ম্যানেজার কই, ম্যানেজার! তার হাঁক ডাকে বাড়ির সবাই ছুটে এলেও ম্যানেজারের দেখা মেলে না।

ম্যানেজার কেরামত ব্যাপারি তখন মিট প্রসেসিং কোম্পানির প্রতিনিধির সঙ্গে কমিশন ভাগাভাগির জটিল হিসাবে ব্যস্ত। ওদিকে ছোট ছেলে অয়ন বাঘা বাহাদুর পেজের এক মিলিয়ন রিচ দেখে খুশিতে অনলাইন পার্টির আয়োজন করেছে।

রম্য রচনা

শরাফাত আলীর অনলাইন কুরবানি

 মুহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ 
০১ আগস্ট ২০২০, ১১:৩৯ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ
দেড় লাখ টাকা দামের ‘বীর বাহাদুর’ দিয়ে গত বছর কোরবানি দেয়া শরাফাত আলী এ বছর বেশ ভাবনায় পড়ে গেলেন। ব্যবসায় ভাটা পড়লেও সেই পরিমাণ টাকা তার হাতে আছে। বরং ওই দামের দু তিনটা গরু চাইলে তিনি কিনে ফেলতে পারেন। 
ফাইল ছবি

দেড় লাখ টাকা দামের ‘বীর বাহাদুর’ দিয়ে গত বছর কোরবানি দেয়া শরাফাত আলী এ বছর বেশ ভাবনায় পড়ে গেলেন। ব্যবসায় ভাটা পড়লেও সেই পরিমাণ টাকা তার হাতে আছে। বরং ওই দামের দু তিনটা গরু চাইলে তিনি কিনে ফেলতে পারেন।

তাই ভাবনার বিষয় তার টাকা নয়, যেভাবে সামাজিক দূরত্ব বলে বলে মাথা খারাপ করে দিচ্ছে, তাতে করে গরুর হাটে গিয়ে সবচেয়ে দামি গরুটা কিনে গলায় মালা পরিয়ে শো-ডাউন দিয়ে নিয়ে আসায় বিশেষ কোনো ভরসা পাচ্ছেন না।

বন্ধু, স্বজন, স্ত্রী-পুত্র কেউ সমর্থনও করছেন না গরুর হাটে যাওয়া। তাহলে কী গতবারের মতো শোডাউন এবার হবে না! গরু কিনে যদি মানুষকে দেখানো না যায়, পথে পথে লোকের করা প্রশ্নের ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে উত্তর দেয়ার সেই পুলক কি এবার ঘরে বন্দী হয়ে থাকবে?

শরাফত আলীর কাছে বিষয়টা মুশিকিলের মনে হলেও তিনি খুব বেশি ভাবার ফুরসত পেলেন না। মুশকিল আসান করতে ম্যানেজার জানালেন এখন নাকি গরু অনলাইনেই পাওয়া যায়। কয়েকটি পেজ ও ওয়েবসাইটে গরুও দেখিয়ে গেলেন।

অনলাইনে গরু কেনার ব্যাপরটা শরাফত আলীকে ততট অবাক করতে পারেনি, যতটা অবাক করেছে অনলাইনে গরু কেনায় পঞ্চাশ শতাংশ ক্যাশ ব্যাক অফার। আরেক সাইট আবার কিস্তি অফার করেছে। কিস্তিতে গরুর দাম পরিশোধ ভাবা যায়!

ম্যানেজারের দীর্ঘ সময়ের মোটিভেশনাল কথাবার্তার প্যাঁচে পড়ে অবশেষে তিনি রাজি হয়ে গেলেন অনলাইনে গরু কিনতে। তবে অফার হিসেবে কিস্তিকেই বেছে নিলেন। কিস্তির বিষয়ে শরাফাত আলীর নিজস্ব দর্শন হল: একবার নিলে আর শোধ করা লাগে না।

ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করলেই হিসাব পাওয়া যাবে কয়টি ব্যাংকে তার কতো কোটি টাকার কিস্তি খেলাপি হয়ে পড়ে আছে। গরুর ক’টা কিস্তি খেলাপি হলে তেমন কী আর অপরাধ বা পাপ হবে। পাপ যেটুকুন হবে তা কুরবানির সওয়াবে কাটাকাটি হয়ে যাবে।

বড়সড় ধাক্কাটা শরাফত আলী খেলেন অনলাইনে অর্ডার প্লেস করতে গিয়ে। ই-কমার্স কোম্পানি শর্ত জুড়ে দিয়েছে মোট দামের আশি শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিতে হবে। বাকিটা কিস্তি।

মনে মনে গালি আওড়ান দেশে যে কী হিডেন চার্জওয়ালা ব্যবসা শুরু হল। অফারে তো এই শর্ত ছিল না! ম্যানেজার বোঝালেন কিস্তির চেয়ে বরং ক্যাশ ব্যাক অফারে যাওয়াই ভালো হবে। সেখানে গিয়েও ধাক্কায় মাফ পেলেন না।

ক্যাশ ব্যাক বলে যে অফার দেয়া হয়েছে সেটা নগদ অর্থ না। এই টাকা নাকি ওয়েবসাইটে তার অ্যাকাউন্টে ক্রেডিট হয়ে থাকবে। সেটা ব্যবহার করে তিনি তাদের সাইট থেকে যে কোনো পণ্য কিনতে পারবেন।

শরাফাত আলীর ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসির রেখা ফুটে উঠল। যার অর্থ হল তার মতো ধান্দাবাজের অভাব দেশে নাই। ম্যানেজারের মোটিভেশনাল বক্তব্যকে টেক্কা মেরে শেষমেষ শরাফাত আলী কিস্তি অফারটি-ই লুফে নিলেন। ভিসা কার্ড দিয়ে পেমেন্টও করে দিলেন নিমিষেই। কিস্তির টাকা দিয়ে খেলা দেখানোর সুযোগ হাতে তো রইলই।

ঘরে বসেই গরু কেনার বন্দোবস্ত হওয়াতে যে ফুরফুরে মেজাজ থাকার কথা, শরাফত আলীর মনে তা নেই। এখন চিন্তা এসে ভর করেছে এই মহামারীতে গরু জবেহ করার লোক পাওয়া যাবে তো! কসাই বাড়িতে এনে কাজ করানোতেও তো ঝুঁকি। কী করা যায় ! কী করা যায়!

ভেবে ভেবে কূলের দেখা পাচ্ছিলেন না যখন, তখন কূলের সন্ধান নিয়ে হাজির হল ছোটো ছেলে অয়ন। স্মার্টফোনের স্ক্রিন চোখের সামনে ধরে বলল, দেখ বাবা মিট প্রসেসিং কোম্পানির বিজ্ঞাপন। আমাদের কোনো চিন্তাই নেই এবার। এই কোম্পানিকে দিয়ে দিলে এরাই সব কাজ করে দেবে। জবেহ করে চামড়া ছাড়িয়ে মাংস বানিয়ে প্যাকেট করে বাসায় পৌঁছে দেবে। দারুণ আইডিয়া না!

আইডিয়া শরাফাত আলীর খুব বেশি পছন্দ না হলেও ছেলের জোরাজুরিতে রাজি হতেই হল। ছেলের খুশির কাছে চোখের সামনে মাংস বানানোর দৃশ্যের মজা হেরে গেল। মিট প্রসেসিং কোম্পানিকে অর্ডার কনফার্ম করে যেই উঠতে যাবেন অমনি ম্যানেজার এসে জানালেন আরেক চমকপ্রদ তথ্য। তিনিও স্মার্টফোনের দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, এই দ্যাখেন স্যার, এসএমএম সার্ভিস।

-এসএমএম সার্ভিস আবার কী?

-স্যার এইটা হইল গিয়া সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং সার্ভিস।

-মার্কেটিং দিয়া কী করব আমরা?

-স্যার এরা আমাদের কেনা ‘বাঘা বাহাদুর’ এর নামে পেজ খুলে যাবতীয় সেটাপ করে দেবে। এদের নিজস্ব বিউটিশিয়ান দিয়ে গরুকে সাজিয়ে দেবে। মালা পরিয়ে বিভিন্ন লোকেশানে গিয়ে ফটোশুট করবে।

তারপর তা পেজে আপলোড করে একশ দু’শো ডলারের বুস্ট করে দেবে। ব্যাস পুরো দেশবাসী আপনার ‘বাঘা বাহাদুরকে’ চিনে যাবে।

-বাঘা বাহাদুরটা কে?

-স্যার আমরা যে গরুটা অনলাইনে কেনার জন্য কনফার্ম করলাম ওটার নাম।

-কেয়াবাৎ! দেশ তো এগিয়ে যাচ্ছে। সবকিছুই অনলাইনে পাওয়া যায়! বাথরুম পরিষ্কারের মেথরও কি অনলাইনে পাওয়া যাবে?

-সার্চ দিলে স্যার নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে।

সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিংয়ের ব্যাপারটা বেশ মনে ধরল শরাফাত আলীর। গলায় মালা পরিয়ে রাষ্ট্র ঘোরানোর স্বাদ কিছুটা হলেও এই অনলাইন ঘোলে মিটবে। এই অর্ডারও কনফার্ম করা হল। সব ব্যবস্থা অনলাইনে হয়ে যাওয়াতে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে জুমার নামাজের প্রস্তুতি নিতে গেলেন তিনি।

স্বস্তির আশি ভাগ উবে গেল মসজিদে ইমাম সাহেবের খুৎবায় । কিস্তিতে গরু কেনার ব্যাপারটা নিয়ে নাকি দেশজুড়ে আলোচনা হচ্ছে। কোনো আলেমই নাকি একে জায়েয মনে করেন না।

তাদের বক্তব্য হল, কুরবানি ওয়াজিব হয় সামর্থ্যবানের ওপর। সব খরচ বাদ দিয়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বা সম্পদ হাতে গচ্ছিত থাকলেই কেবল কুরবানি করতে হবে।

হাতে অর্থ আছে বলেই তো কুরবানি দিবেন। তাহলে সেটা কিস্তিতে কেন? ইমামের ফতোয়া শুনে দ্বিধায় পড়ে গেলেন শরাফাত আলী। অনলাইনে অর্ডার কনফার্ম করা হয়ে গেছে। এখন কী করবেন? পরক্ষণেই আবার ভাবলেন নিশ্চয়ই এর সমাধানও অনলাইনে পাওয়া যাবে।

বাড়িতে গিয়ে ছেলেকে ডেকে ইমামের ফতোয়ার বিষয়ে অবহিত করলেন। বললেন, দ্যখো তো বাবা এই বিষয়ক কোনো সমাধান অনলাইনে আছে কি না। অনেক খুঁজে-টুজে ছেলে সমাধান নিয়ে হাজির।

ই-শরীয়া ডটকমের অফার বাবার কাছে তুলে ধরল ছেলে। ‘দ্যাখ বাবা, এরা কুরবানিসহ যে কোনো মাসআলার সমাধান দিয়ে থাকে, মাসআলা ক্লায়েন্টের বিপক্ষে গেলে এরা কোনো ফি নেয় না। তবে প্যাকেজ মূল্য অগ্রীম পরিশোধ করতে হবে। উত্তর নেগেটিভ হলে টাকা রিফান্ড করবে।

এই অফারও মনে ধরল বেশ। অনলাইনে অর্ডার করে দিলেন কিস্তিতে গরু কেনার জায়েজ-নাজায়েজ বিষয়ের সমাধান পেতে। ঘণ্টাখানিক পড়েই উত্তর আসল, যেহেতু আপনি মূল্য পরিশোধের অঙ্গীকার করেছেন, সেহেতু কিস্তিতেও গরু কেনা জায়েজ হবে।

সমাধান পেয়ে হাফ ছেড়ে বাঁচলেন, যদিও প্রশ্ন তার মনে থেকেই গেল। পজিটিভ উত্তর পেমেন্ট হালাল করার জন্য নয় তো! হতেও তো পারে। তার মতো লোক তো আর দেশে একটা না।

অফার তার কাছে আরো আসল। ইনস্যুরেন্স কোম্পানির অফার। কুরবানির আগ পর্যন্ত গরু হারিয়ে গেলে বা মারা গেলে তারা ক্ষতি পোষাতে ইনস্যুরেন্স কাভারেজ দিয়ে থাকে। অফারটি দেখে তাজ্জব বনে গেলেন তিনি।

ম্যানেজার বোঝালেন স্যার অল্প কয়েক টাকার প্রিমিয়াম দিয়ে যদি গরুর নিরাপত্তা পাওয়া যায় তাহলে ক্ষতি কী! নাকে তেল দিয়ে ঘুমাতে পারবেন। শরাফাত আলী ইনস্যুরেন্সও করিয়ে নিলেন গরুর জন্য। বলা তো যায় না কখন কী হয়! দেখা গেল করোনাক্রান্ত হয়ে গরু মারা গেছে।

কুরবানির দিন ঈদের নামাজ পড়ে বাসায় এসে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন শরাফাত আলী। কখন আসবে গোশত। কষানো মাংস মুখে দিয়ে স্বাদের জগতে হারিয়ে যাবেন।

কিন্তু তার হারানো আর হলো না মিট প্রসেসিং কোম্পানির পাঠানো ক্ষুদে বার্তা পেয়ে। লোকবল সঙ্কটের কারণে তারা আজকে গরুটি জবেহ করতে পারছেন না বলে আন্তরিকভাবে দুঃখিত। পরবর্তী শিডিউল জানতে ভিজিট করতে হবে তাদের ওয়েবসাইট।

বার্তা পড়ে হাতের সেটা আছাড় মেরে বললেন, নিকুচি করি তোদের এই অনলাইন সার্ভিসের। সবকটাকে জবাই করব আমি। ম্যানেজার কই, ম্যানেজার! তার হাঁক ডাকে বাড়ির সবাই ছুটে এলেও ম্যানেজারের দেখা মেলে না।

ম্যানেজার কেরামত ব্যাপারি তখন মিট প্রসেসিং কোম্পানির প্রতিনিধির সঙ্গে কমিশন ভাগাভাগির জটিল হিসাবে ব্যস্ত। ওদিকে ছোট ছেলে অয়ন বাঘা বাহাদুর পেজের এক মিলিয়ন রিচ দেখে খুশিতে অনলাইন পার্টির আয়োজন করেছে।