ইসরাইলি কারাগারে ফিলিস্তিনি নারীদের নির্যাতন, বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪২ পিএম
ক্যাপশন: ইসরাইলি কারাগার থেকে ২০২৫ সালে মুক্তির পর এক ফিলিস্তিনি নারীকে স্বাগত জানান তার স্বজনরা। ছবি: এপি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইসরাইলের কারাগারে বন্দি ফিলিস্তিনি নারীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। তাদের হিজাব খুলতে বাধ্য করা, মারধর, নির্জন কারাবাস এবং কাঁদানে গ্যাস ও পিপার স্প্রে মারা হচ্ছে। এসব ঘটনায় বেশ কয়েকজন নারী গুরুতর স্বাস্থ্যগত জটিলতায় পড়েছেন। অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এক অন্তঃসত্ত্বা বন্দিও। তাকে চিকিৎসার জন্য কারাগারের ক্লিনিকে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রিজনার্স মিডিয়া অফিস।
সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ ও ৮ অক্টোবর এসব নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। এ সময় ইসরাইলি কারারক্ষীরা নারী বন্দিদের চুল পরীক্ষা করার জন্য হিজাব খুলতে বাধ্য করেন। পাশাপাশি তাদের মেঝেতে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকতে বাধ্য করা হয়। বন্দি কক্ষ ও গোসলখানায় রাসায়নিক উত্তেজক পদার্থ ছুড়ে মারার অভিযোগও উঠেছে।
প্রিজনার্স মিডিয়া অফিস জানায়, ১৭ জন ফিলিস্তিনি নারীকে প্রায় তিন ঘণ্টা একটি কক্ষে আটকে রেখে তাদের চুলের বেণি খুলে ফেলতে নির্দেশ দেওয়া হয়। অন্যদিকে, ১৫ জন বন্দির একটি দলকে লক্ষ্য করে পিপার স্প্রে ছোড়া হয়। এতে তারা বমি করতে থাকেন এবং তীব্র শারীরিক অস্বস্তিতে পড়েন।
বন্দিদের সঙ্গে এমন আচরণকে তাদের মর্যাদা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও শারীরিক নিরাপত্তার ওপর গুরুতর আঘাত হিসেবে অভিহিত করেছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে এ বিষয়ে জরুরি আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে তারা।
হিজাব খুলতে বাধ্য করে নির্জন কক্ষে আটক
প্রিজনার্স মিডিয়া অফিসের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৭ অক্টোবর ইসরাইলি কারাগারের এক কর্মকর্তা ফিলিস্তিনি নারী বন্দিদের চুল পরীক্ষা করার জন্য হিজাব খুলতে বাধ্য করেন।
পরীক্ষার পর ১৭ জন বন্দিকে ১৩ নম্বর কক্ষে প্রায় তিন ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। এ সময় তাদের চুলের বেণি খুলে ফেলতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
সংগঠনটি বলেছে, নারীদের চুল প্রকাশ করতে বাধ্য করা এবং পরে একটি কক্ষে আটকে রাখার ঘটনা ছিল অপমানজনক। এসব আচরণ তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মর্যাদার লঙ্ঘন।
নারী বন্দিদের বিভাগে এ ঘটনার পাশাপাশি আরও হামলা ও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয় বলে অভিযোগ করেছে সংগঠনটি।
মারধরের পর গ্যাসভর্তি কক্ষে ফেরত পাঠানোর অভিযোগ
প্রিজনার্স মিডিয়া অফিস জানায়, ইসরাইলি কারারক্ষীরা নারী বন্দিদের থাকার বিভাগের আঙিনায় কাঁদানে গ্যাস ও শব্দবোমা নিক্ষেপ করেন। এতে কয়েকজন বন্দি শ্বাসকষ্টে ভোগেন।
পরে বিভিন্ন কক্ষ থেকে বন্দিদের বের করে এনে প্রায় এক ঘণ্টা মেঝেতে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকতে বাধ্য করা হয়। এরপর গ্যাসে ভরা কক্ষগুলোতেই তাদের ফেরত পাঠানো হয় বলে অভিযোগ করেছে সংগঠনটি।
এ ছাড়া ৯ নম্বর কক্ষে পৃথক এক অভিযানের সময় কারারক্ষীরা বন্দিদের পায়ে মারধর করেন বলেও জানানো হয়েছে।
সংকীর্ণ ও আবদ্ধ স্থানে রাসায়নিক উত্তেজক পদার্থের সংস্পর্শে আসা নারীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। বিশেষ করে আগে থেকেই শারীরিক অসুস্থতায় ভোগা বন্দিদের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
পিপার স্প্রেতে বমি
প্রিজনার্স মিডিয়া অফিসের তথ্যমতে, গত ৮ অক্টোবর ইসরাইলি কারারক্ষীরা ১৫ জন ফিলিস্তিনি নারী বন্দি থাকা একটি কক্ষে প্রচুর পরিমাণে পিপার স্প্রে ছোড়েন।
এর প্রভাব পাশের কক্ষগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে। এতে বন্দিরা বমি করতে থাকেন। ওই বিভাগে আটক বয়স্ক নারীরাও আক্রান্ত হন।
একজন বন্দিকে অন্য বন্দিরা বহন করে নিয়ে যেতে বাধ্য হন। আরেকজন হাঁটতে পারছিলেন না।
সংগঠনটি আরও জানায়, গোসলখানায় থাকা নারী বন্দিদের লক্ষ্য করেও রাসায়নিক উত্তেজক পদার্থ ছোড়া হয়।
আক্রান্তদের মধ্যে এক অন্তঃসত্ত্বা নারীও ছিলেন। তার শারীরিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য অবনতি হলে তাকে চিকিৎসার জন্য কারাগারের ক্লিনিকে নেওয়া হয়। তবে তার বর্তমান অবস্থা বা কী ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি সংগঠনটি।
ইসরাইলি কারাগারে ৮৭ ফিলিস্তিনি নারী
ইসরাইলের কারাগারে ফিলিস্তিনি নারী বন্দিদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই এসব নির্যাতনের অভিযোগ সামনে এসেছে।
গত ১২ অক্টোবর দেওয়া এক বিবৃতিতে ফিলিস্তিনিয়ান প্রিজনার্স সোসাইটি জানায়, ইসরাইলের কারাগারে ৮৭ জন ফিলিস্তিনি নারী আটক রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২১ জনকে প্রশাসনিক আটকাদেশের আওতায় রাখা হয়েছে।
প্রশাসনিক আটকাদেশের মাধ্যমে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন বা বিচার ছাড়াই ফিলিস্তিনিদের আটক রাখতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে বন্দি ও তাদের আইনজীবীদের কাছ থেকে গোপন রাখা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে এ ধরনের আটকাদেশ দেওয়া হয়।
সংগঠনটি আরও সতর্ক করে বলেছে, নারী বন্দিদের নির্জন কারাবাস, দুর্ব্যবহার, অপর্যাপ্ত চিকিৎসা এবং শারীরিক অবস্থার অবনতি অব্যাহত রয়েছে। বন্দিদের মধ্যে খোসপাঁচড়ার মতো চর্মরোগ ছড়িয়ে পড়ার কথাও জানিয়েছে তারা।
নিয়মিত চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে কিংবা স্বাস্থ্যগতভাবে ঝুঁকিতে থাকা বন্দিদের নিরাপত্তা নিয়ে এসব পরিস্থিতি নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
প্রায় ৫০ দিন নির্জন কারাবাসে নারী সাংবাদিক
ফিলিস্তিনি সাংবাদিক বুশরা আল-তাওয়িলের আটকাবস্থাও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। ৩৩ বছর বয়সী এই সাংবাদিক প্রায় ৫০ দিন ধরে নির্জন কারাবাসে রয়েছেন বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনিয়ান প্রিজনার্স সোসাইটি।
সংগঠনটির অভিযোগ, এ সময়ে তিনি একাধিকবার মারধর, পিপার স্প্রে দিয়ে হামলা এবং অবমাননাকর আচরণের শিকার হয়েছেন।
গত ১২ অক্টোবর ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ তার প্রশাসনিক আটকাদেশ আরও চার মাসের জন্য নবায়ন করে। ফলে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই তার কারাবাস দীর্ঘায়িত হয়েছে।
ফিলিস্তিনিয়ান প্রিজনার্স সোসাইটি জানিয়েছে, বুশরাকে এক কারাগার থেকে অন্য কারাগারে বারবার স্থানান্তরের কারণে আইনজীবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে তার স্বাস্থ্য ও আটকাবস্থার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
তার নির্জন কারাবাস বন্ধ, যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত এবং মুক্তির দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
জরুরি আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের আহ্বান
ফিলিস্তিনি নারী বন্দিদের সুরক্ষায় অবিলম্বে পদক্ষেপ নিতে আন্তর্জাতিক মানবিক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে প্রিজনার্স মিডিয়া অফিস।
সংগঠনটি বন্দিদের ওপর শারীরিক নির্যাতন, জোরপূর্বক নির্জন কারাবাস, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনকারী তল্লাশি এবং কাঁদানে গ্যাস ও পিপার স্প্রে ব্যবহারের অবসান দাবি করেছে।
একই সঙ্গে আহত, অন্তঃসত্ত্বা, বয়স্ক ও অসুস্থ বন্দিদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং কারাগারের পরিস্থিতি স্বাধীনভাবে পর্যবেক্ষণের আহ্বান জানিয়েছে তারা।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত ব্যক্তিদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করতে হবে এবং নির্যাতনসহ নিষ্ঠুর, অমানবিক বা মর্যাদাহানিকর আচরণ থেকে তাদের সুরক্ষা দিতে হবে।
ফিলিস্তিনি নারী বন্দিদের ওপর নির্যাতনের এসব অভিযোগ ইসরাইলি কারাগারের পরিস্থিতি নিয়ে জবাবদিহি ও স্বাধীন তদন্তের দাবি আরও জোরালো করেছে। বন্দিদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, আটক নারীদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মৌলিক অধিকার রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। সূত্র: সাফা নিউজ


