অনেক ডিলার ব্যবসা না করে নেন কমিশন
সার সংকটের নেপথ্যে কারা
একজন ডিলার নিজ নামে, স্ত্রী-ছেলে-মেয়ে ও ভাই-বোনের নামেও ডিলারশিপ নেন * খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে ৫০ কোটি টাকা চাঁদাবজির অভিযোগ
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা সার নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন বলে অভিযোগ কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের। অন্যদিকে ডিলারশিপ পাইয়ে দেওয়ার নাম করে ৫০ কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ করেছেন খুচরা বিক্রেতারা। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) ডিলার নিয়োগ করে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান যুগান্তরকে বলেন, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা সার ব্যবসাকে বছরের পর বছর কুক্ষিগত করে রেখেছেন। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার এবং বর্তমান সরকার বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করেছে। মাঠ পর্যায়ে তদন্ত করে দেখা গেছে, প্রায় ২ হাজার ৩১১ জন ভুয়া ডিলার রয়েছেন। বিসিআইসির নিয়োগ দেওয়া ডিলার তারা। কৃষির জন্য সার খুবই জরুরি হওয়ায় সরকার তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে কৌশলে ডিলার নিয়োগ নীতিমালায় পরিবর্তন আনে। নীতিমালা হালনাগাদ করার ফলে ডিলার এবং খুচরা বিক্রেতাদের সব গোমর ফাঁস হয়ে যায়।
সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয় সব ডিলারকে এক করে মাঠে কাজ করার নীতিমালা তৈরি করে। ফলে বিসিআইসির ডিলাররা মনে করছেন, তাদের ব্যবসায় বিএডিসির ডিলাররা ভাগ বসিয়েছেন এবং তাদের ব্যবসা কমে যাবে। তারা বিভিন্ন প্রচারমাধ্যম ব্যবহার করে সার নেই বলে প্রচার করছে। কৃষি সচিব বলেন, এসব ভিত্তিহীন ও আজগুবি খবর।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, বর্তমানে দেশের গুদামে চার জাতের ১৪ লাখ ২৫ হাজার টন সার মজুত রয়েছে। এছাড়া বাজারে আরও প্রায় ১০ ধরনের সার দেশের বাজারে বিক্রি হয়। এর মধ্যে ইউরিয়া সারের মজুত ৫ লাখ ৫০, টিএসপি ৩ লাখ ৫০ হাজার, ডিএপি ৩ লাখ ৫০ হাজার এবং এমওপি সারের মজুত ১ লাখ ৭৫ হাজার টন। এছাড়া আরও প্রায় ৬ লাখ টন সার পাইপলাইনে রয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ২০০৯ সালের আগে সার ব্যবসা খুব বেশি লাভজনক ছিল না। এরপর থেকে সারের ব্যবসা লাভজনক হয়ে ওঠে। ফলে প্রথমে উপজেলায় এবং পরে ইউনিয়ন পর্যায়ে সারের ডিলার নিয়োগ দেওয়া শুরু হয়। পাশাপাশি ডিলারদের কাছ থেকে নিয়ে খুচরা বিক্রেতারাও বিক্রি শুরু করেন। বর্তমানে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একজন করে সারের ডিলার রয়েছেন। তবে নতুন নীতিমালায় প্রতি ইউনিয়নে ৩ জন করে ডিলার নিয়োগ দেওয়ার বিধান করা হয়েছে। এছাড়া ইউনিয়ন পর্যায়ে আরও তিনজন খুচরা বিক্রেতা নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে ভাবছে সরকার। নিকটভবিষ্যতে তাদের নিয়োগ দেওয়া হতে পারে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আরও জানান, ২০০৯ সালের পর থেকে একজন ডিলার নিজ নামে এবং স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে ও ভাই-বোনের নামেও ডিলারশিপ নেন। ফলে দেখা যায়, একজন ব্যক্তি বিপুল পরিমাণ সার উত্তোলনের সুযোগ পাচ্ছেন। এতে এক জেলায় সার বেশি উত্তোলন হচ্ছে। অন্য জেলায় সারের বরাদ্দ কম যাচ্ছে। এর মধ্যে অনেক ডিলারের নিজের ভাই-বোন, ছেলে-মেয়ে দেশেই থাকছেন না। তারা লন্ডন-যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। অথচ এখান থেকে সার বিক্রির কমিশন পাচ্ছেন। এসব অনিয়ম ও দুর্নীতি কৃষি মন্ত্রণালয়, বিএডিসি, বিসিআইসির শীর্ষ কর্মকর্তাদের জ্ঞাতসারেই হচ্ছে বলে জানা যায়।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগের মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধানকারীদের মাঠে পাঠানো হচ্ছে না। তাদের দিয়ে মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন শাখায় কাজ করানো হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, বর্তমানে মাঠপর্যায়ে সার নিয়ে যে আন্দোলন চলছে, এর পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছেন বিসিআইসির নিয়োগ দেওয়া ডিলার ও মাঠ পর্যায়ের খুচরা বিক্রেতারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক খুচরা বিক্রেতা যুগান্তরকে বলেন, তাদের ডিলারশিপ পাইয়ে দেওয়ার নামে এ পর্যন্ত ৫ হাজার করে চারবার টাকা নিয়েছেন নেতারা। এতে ৫০ কোটি টাকা চাঁদাবজির ঘটনা ঘটেছে।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আরও জানান, সারের খুচরা বিক্রেতাদের একটি সংগঠন রয়েছে। ওই সংগঠনের নেতাদের মধ্যে অনেকের নামে একাধিক ডিলারশিপ রয়েছে। নতুন নীতিমালায় এসব পরিষ্কার করা দরকার-একজন খুচরা বিক্রেতা কয়টি ডিলারশিপ পাবেন। কর্মকর্তারা আরও জানান, অনেক খুচরা বিক্রেতা নিজে ব্যবসা করছেন না। অন্যকে দিয়ে সারের ব্যবসা করিয়ে নিজে কমিশন বাণিজ্য করছেন।

