Logo
Logo
×
   

অন্যান্য

বিমানের সেই শাহজাহানের ক্ষমতার জোর কোথায়?

একই স্টেশনে বহাল স্ত্রীর বিরুদ্ধেও অভিযোগের পাহাড়

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২০ পিএম

বিমানের সেই শাহজাহানের ক্ষমতার জোর কোথায়?

বিমানের কুয়েত স্টেশন ম্যানেজার মো. শাহজাহান।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কুয়েত বিতর্কিত ও আলোচিত স্টেশন ম্যানেজার মো. শাহজাহানের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়। তবুও বীরদর্পে বহাল আছেন দায়িত্বে। ‘ধরাকে সরা জ্ঞান’ মনে করে নানা অনিয়ম করে যাচ্ছেন দিনের পর দিন। তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠার পর কয়েক দফায় তদন্তও হয়। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না এক অদৃশ্য ‘ক্ষমতার প্রভাবের’ কারণে। 

তার সর্বশেষ ক্ষমতার জোর দেখা গেল স্ট্যান্ড রিলিজ ও মুভমেন্ট অর্ডার ঘিরে। তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ ও মুভমেন্ট অর্ডার দেওয়ার ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়। কোনো স্পষ্ট কারণও জানানো হয়নি। উলটো অভিযোগের মুখে থাকা শাহজাহানকে কুয়েত স্টেশনেই বহাল রাখা হয়েছে। 

শাহজাহানের বিরুদ্ধে মানব পাচার, অতিরিক্ত ব্যাগেজের নামে অনিয়ম, সরকারি ফি ও রসিদ ছাড়াই লাগেজ পার করে দেওয়াসহ গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই তাকে সরানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এ ঘটনায় বিমানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাদের প্রশ্ন, নানা অভিযোগের ভিত্তিতে একজন কর্মকর্তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হলো। সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের নেপথ্যে কোনো অদৃশ্য প্রভাব কাজ করেছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, কারো বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ থাকার পর তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করে আবার আগের পদে পুনর্বহাল করা হলে তা স্পষ্টতই ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির শামিল। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। অবশ্যই দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো অদৃশ্য ক্ষমতার প্রভাবে স্ট্যান্ড রিলিজের আদেশ পরিবর্তন করা হয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ মহাব্যবস্থাপক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মহিউদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, এটি মূলত প্রশাসনিক বিষয়। বিমানের নির্দিষ্ট প্রয়োজন অনুযায়ী কাউকে কোনো দায়িত্বে রাখা বা সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। ম্যানেজমেন্ট মনে করেছে, আপাতত তাকে সেখানেই রাখা প্রয়োজন। সে কারণেই হয়তো সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বিমানের কুয়েত স্টেশনের ম্যানেজার মো. শাজাহান (পি-৩৬৪৮৯) কে স্ট্যান্ড রিলিজ ও মুভমেন্ট অর্ডার দেওয়া হয়। কিন্তু পরদিন বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) কোনো স্পষ্ট কারণ না জানিয়েই সেই আদেশ বাতিল করে তাকে কুয়েত স্টেশনেই বহাল রাখা হয়েছে।

যুগান্তরের হাতে হাতে আসা বিমানের গ্রাউন্ড সার্ভিসেসের ভারপ্রাপ্ত ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার ফারহানা আক্তারের স্বাক্ষরিত এক দাপ্তরিক চিঠিতে (স্মারক নং-৩০.৩৪.০০০০.০১৯.১৪.০০৫.২৬) বৃহপতিবার আগের আদেশ প্রত্যাহারের কথা জানানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কুয়েতে বিমানের স্টেশন ম্যানেজার মো. শাহজাহানের বুধবার ইস্যুকৃত মুভমেন্ট/রিলিজ অর্ডারটি বাতিল করা হয়েছে।

মাত্র এক দিনের ব্যবধানে একই কর্মকর্তাকে নিয়ে বিমানের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের এমন নাটকীয় পরিবর্তন নজিরবিহীন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যদি তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ গুরুতর হয়ে থাকে, তাহলে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কেন স্ট্যান্ড রিলিজ বাতিল করা হলো— এ প্রশ্ন উঠছে।

১৪ মধ্যে ১২ জনের ব্যাগেজেই অনিয়ম

কুয়েত থেকে ঢাকাগামী বিজি-৩৪৪ ফ্লাইটে বিমানের নিরাপত্তা বিভাগের ডিজিএমের ঝটিকা তল্লাশিতে কুয়েত স্টেশনের ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনার গুরুতর অনিয়মের চিত্র উঠে আসে। তদন্তে তল্লাশি করা ১৪ জন যাত্রীর মধ্যে ১২ জনের কাছেই বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত ব্যাগেজ পাওয়া যায়। অভিযোগ রয়েছে, এসব অতিরিক্ত ব্যাগেজের বিপরীতে নিয়ম অনুযায়ী সরকারি ফি আদায় করা হয়নি। দেওয়া হয়নি কোনো সরকারি রসিদও। অতিরিক্ত ব্যাগেজের নামে যে অর্থ আদায় হয়, সরকারি রাজস্বে জমা না পড়ে অন্য পথে যাওয়ার অভিযোগ উঠে। এ ঘটনা শুধু আর্থিক অনিয়মের অভিযোগেই সীমাবদ্ধ নয়। উড়োজাহাজের নির্ধারিত ওজনসীমা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার দিক থেকেও বিষয়টি গুরুতর। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে একটি ফ্লাইটে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত ব্যাগেজ কীভাবে নিয়মিত প্রক্রিয়ার বাইরে পার হলো—এ প্রশ্নের জবাবও মেলেনি।

স্বামী-স্ত্রী একই স্টেশনে

কুয়েত স্টেশন ঘিরে আরেকটি বিতর্ক শাহজাহান ও তার স্ত্রী শামিমা পারভীনের একই স্টেশনে পদায়ন ঘিরে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রভাব খাটিয়ে তারা দুজনই একই বিদেশি স্টেশনে পদায়ন ধরে রেখেছেন। একই স্টেশনে স্বামী-স্ত্রীর দায়িত্ব পালন নিয়ে বিমানের ভেতরে আগে থেকেই নানা আলোচনা থাকলেও কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। এ অবস্থায় স্টেশনটির ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসায় স্বামী-স্ত্রীর দায়িত্ব পালন নিয়েও প্রশ্ন উঠে।

তদন্তেই ‘দায়সারা’ অভিযোগ

কুয়েত স্টেশনের অনিয়ম খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও তদন্তের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ, ঢাকায় বসে কুয়েতের ঘটনা পুরোপুরি তদন্ত করা সম্ভব নয়— এমন যুক্তিতে তদন্তের পরিধি সীমিত রাখার চেষ্টা হয়েছে। তবে ঝটিকা তদন্তে ১৪ জনের মধ্যে ১২ জনের অতিরিক্ত ব্যাগেজ পাওয়া যাওয়ার মতো তথ্য সামনে আসার পরও যদি মাঠপর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত না হয়, তাহলে অনিয়মের মূল হোতাদের শনাক্ত করা কঠিন বলে মনে করছেন তারা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিগত আওয়ামী সরকারের সময়ে সর্বোচ্চ সুবিধাভোগীদের অনেকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও বিমানের ভেতরে প্রভাবশালী অসাধু চক্রের মাধ্যমে বহাল রয়েছেন। কুয়েত স্টেশন ম্যানেজারের ক্ষেত্রে মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ঘটনা সেই অভিযোগেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম