Logo
Logo
×

Advertisement

জাতীয়

৩১ ঘণ্টায় ৪ বার ভূমিকম্প, কী বার্তা দিচ্ছে?

খালিদ হাসান

খালিদ হাসান

প্রকাশ: ২২ নভেম্বর ২০২৫, ০৯:৫৪ পিএম

৩১ ঘণ্টায় ৪ বার ভূমিকম্প, কী বার্তা দিচ্ছে?

Advertisement

রাজধানী ঢাকায় ও আশপাশের এলাকায় মাত্র ৩১ ঘণ্টার মধ্যে চারবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। শুক্রবার সকাল থেকে শুরু করে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এই ধারাবাহিক কম্পন ভূতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের কাছে নতুন সতর্কবার্তা—বাংলাদেশ বড় ধরনের ভূমিকম্পের উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে।

দুই সেকেন্ডে রাজধানীতে দুটি ভূমিকম্প

শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানী ঢাকায় পরপর দুটি ভূমিকম্প হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, প্রথমটি অনুভূত হয় সন্ধ্যা ৬টা ৬ মিনিট ৪ সেকেন্ডে, যার মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৩ দশমিক ৭। এর এক সেকেন্ড পর—৬টা ৬ মিনিট ৫ সেকেন্ডে—আরও একটি ভূমিকম্প হয়, যার মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৩।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, ৩ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল বাড্ডায়। আর ৪ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল নরসিংদীতে।

এর আগে একইদিন সকালে নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটে ৩ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়।

গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে ঢাকা, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা। এতে শিশুসহ ১০ জন নিহত এবং ছয় শতাধিক মানুষ আহত হন। আতঙ্কে ভবন থেকে লাফিয়ে পড়া, ভবন হেলে যাওয়া ও ফাটল সৃষ্টি হওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। সবচেয়ে বেশি—৫ জনের মৃত্যু হয় নরসিংদীতে; ঢাকায় মারা যান ৪ জন এবং নারায়ণগঞ্জে ১ জন।

পরপর ৪ ভূমিকম্প কী ইঙ্গিত দিচ্ছে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পগুলো একটি বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস। ভূতাত্ত্বিকরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে বাংলাদেশ একটি সক্রিয় প্লেট সীমান্তে অবস্থান করছে, যেখানে যেকোনো সময় বড় ধরনের কম্পন ঘটতে পারে।

বিশেষজ্ঞ মত অনুযায়ী, বাংলাদেশে বড় ধরনের ভূমিকম্পের প্রধান উৎস দুটো। এর একটি হলো ‘ডাউকি ফল্ট’, যা ভারতের শিলং মালভূমির পাদদেশে বাংলাদেশের ময়মনসিংহ-জামালগঞ্জ-সিলেট অঞ্চলে বিস্তৃত যা প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ।

আরেকটি হলো- সিলেট থেকে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, টেকনাফ পর্যন্ত যা সব মিলিয়ে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা পর্যন্ত বিস্তৃত। এই উৎসটিকে খুব ভয়ংকর বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

টেকটনিক প্লেটে বাংলাদেশের যে অবস্থান তাতে দুটো প্লেটের সংযোগস্থল রয়েছে- পশ্চিমে ইন্ডিয়ান প্লেট আর পূর্ব দিকে বার্মা প্লেট। আর বাংলাদেশের উত্তরদিকে আছে ইউরেশিয়ান প্লেট।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ সৈয়দ হুমায়ুন আখতার গণমাধ্যমে বলেন, ‘ভারতীয় প্লেটটি ধীরে ধীরে পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে বার্মা প্লেটের নিচে অর্থাৎ চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রামের নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। তলিয়ে যাওয়ার কারণে একটা সাবডাকশান জোনের তৈরি হয়েছে। আর নটরিয়াস (ভয়ংকর অর্থে) এই জোনের ব্যাপ্তি সিলেট থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত। পুরো চট্টগ্রাম অঞ্চল এর মধ্যে পড়েছে। এখানে বিভিন্ন সেগমেন্ট আছে। আমাদের এই সেগমেন্টে ৮.২ থেকে ৯ মাত্রার শক্তি জমা হয়ে আছে। এটা বের হতেই হবে।’ 

তার মতে, নরসিংদীর মাধবদীতে যে ভূমিকম্পের উৎস ছিলো সেই এই সেগমেন্টেরই এবং নরসিংদীতে দুই প্লেটের যেখানে সংযোগস্থল, সেখানেই ভূমিকম্প হয়েছে।

অধ্যাপক হুমায়ুন বলেন, ‘এখানে প্লেট লকড হয়ে ছিল। এর অতি সামান্য ক্ষুদ্রাংশ খুললো বলেই শুক্রবারের ভূমিকম্প হয়েছে। এটিই ধারণা দেয় যে সামনে বড় ভূমিকম্প আমাদের দ্বারপ্রান্তে আছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই যে বড় একটি প্লেট বাউন্ডারির খুব ক্ষুদ্র শক্তি খুলে গেলো তার মানে হলো সামনে বড় বিপদ অপেক্ষা করছে। কারণ একটু খুলে যাওয়া কিছু শক্তি বের হওয়ায় সামনে এই শক্তির বের হওয়া আরও সহজ হয়ে গেছে।’

আগের বড় ভূমিকম্পের নজির

বাংলাদেশ ও আশপাশের এই অঞ্চলে আগেও ৮ মাত্রার ওপরে বড় ভূমিকম্প হয়েছে—

  • ১৮৯৭ সালে ডাউকি ফল্টে ৮.৭ মাত্রার ভূমিকম্প
  • ১৭৬২ সালে টেকনাফ-মিয়ানমার অঞ্চলে ৮.৫ মাত্রার ভূমিকম্প
  • ১৭৯৭ সালে ভূমিকম্পে ব্রহ্মপুত্র নদীর গতিপথ বদলে যাওয়া
  • ১৮৬৮ ও ১৯২২ সালে সিলেট–মৌলভীবাজার অঞ্চলে ৭.৫ ও ৭.৬ মাত্রার বড় ভূমিকম্প

এই ইতিহাস ইঙ্গিত দেয়—অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকম্পপ্রবণ।

কেন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ঢাকা?

বিশেষজ্ঞদের মতে— ঢাকার অধিকাংশ ভবন বিল্ডিং কোড মেনে নির্মিত নয়। অতিরিক্ত ঘনবসতি ও সংকীর্ণ রাস্তার পাশাপাশি উদ্ধার ও দ্রুত প্রতিক্রিয়ার পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেই। তাই বড় ভূমিকম্প হলে সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কা এই শহরেই।

অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার বলেন, ‘মাধবদীর ভূমিকম্প দেখাচ্ছে বড় শক্তি বেরিয়ে আসার পথ খুলছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ঢাকা মৃত্যুপুরীতে পরিণত হতে পারে।’

ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের ভবনগুলোর জরুরি অডিট, বিল্ডিং কোড প্রয়োগ, উদ্ধার সক্ষমতা বাড়ানো, জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি—সবই এখন সময়ের দাবি।

সতর্কবার্তা স্পষ্ট—৩১ ঘণ্টায় ৪ দফা কম্পন জানাচ্ছে, ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়ছে এবং বড় কম্পনের সম্ভাবনাকে আর হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

ভূমিকম্প মোকাবিলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

ভূমিকম্প মোকাবিলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

শক্তিশালী ভূকম্পে কাঁপল এশিয়ার দুই দেশ

শক্তিশালী ভূকম্পে কাঁপল এশিয়ার দুই দেশ

দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে ৭.২ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প

দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে ৭.২ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প

ইতালিতে পর পর ১২টি ভূমিকম্প, জরুরি সতর্কতা জারি

ইতালিতে পর পর ১২টি ভূমিকম্প, জরুরি সতর্কতা জারি

শক্তিশালী ভূমিকম্পের তাণ্ডবে বিপর্যস্ত তিব্বত

শক্তিশালী ভূমিকম্পের তাণ্ডবে বিপর্যস্ত তিব্বত

সর্বাত্মক উদ্ধার অভিযানের নির্দেশ শি জিনপিংয়ের

তিব্বতে শক্তিশালী ভূমিকম্প সর্বাত্মক উদ্ধার অভিযানের নির্দেশ শি জিনপিংয়ের

আরও পড়ুন

দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান ধর্মমন্ত্রীর

দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান ধর্মমন্ত্রীর

চিকিৎসায় অনুদান নিলে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার শঙ্কা

চিকিৎসায় অনুদান নিলে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার শঙ্কা

পোশাকশিল্পের শ্রমিক অসন্তোষ নিয়ন্ত্রণে এসেছে: বাণিজ্যমন্ত্রী

পোশাকশিল্পের শ্রমিক অসন্তোষ নিয়ন্ত্রণে এসেছে: বাণিজ্যমন্ত্রী

এইচএসসির ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত

এইচএসসির ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম