‘তড়িঘড়ি নয় বাণিজ্য শুল্ক সমন্বয়ে কেনা হচ্ছে ১৪ বোয়িং’
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:৩৫ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে ও নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০৩৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানি থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত উড়োজাহাজগুলো ২০৩৫ সালের মধ্যে ডেলিভারি পাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। নির্বাচনের আগেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের সিদ্ধান্তকে ‘তাড়াহুড়ো’ নয় বলে মন্তব্য করেছেন বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন। তিনি বলেন, দেশের সার্বিক স্বার্থ রক্ষায় এবং ভবিষ্যৎ সরকার যাতে উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য নিয়ে কোনো জটিলতায় না পড়ে, সেজন্যই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রোববার বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সমসাময়িক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন উপদেষ্টা।
শেখ বশিরউদ্দিন বলেন, আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এ চুক্তির মাধ্যমে বর্তমানে আরোপিত প্রায় ২০ শতাংশ শুল্ক উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য শুধু শুল্ক কমানো নয়, বরং প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক খাতে শুল্ক শূন্যে নামিয়ে আনার জন্য দরকষাকষি চালানো হবে।
উপদেষ্টা বলেন, ২০২৫ সালে আকাশপথে বাংলাদেশ থেকে ১ কোটি ৬০ লাখ যাত্রী পরিবহণ হলেও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স মাত্র ২০ লাখ যাত্রী বহন করেছে। পর্যাপ্ত উড়োজাহাজ না থাকায় দেড় কোটির বেশি যাত্রী হারিয়েছে জাতীয় সংস্থাটি। বর্তমানে বিমানের বহরে থাকা ১৪টি সচল উড়োজাহাজ দিয়ে চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। ২০৩৫ সাল নাগাদ বিমানের অন্তত ৪৭টি উড়োজাহাজ প্রয়োজন হবে, যার অংশ হিসেবে আপাতত ১৪টি বোয়িং কেনার প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে।
এ সময় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন নিয়ে ওঠা সমালোচনার জবাবও দেন শেখ বশিরউদ্দিন। তিনি বলেন, আমি আইনের বাইরে গিয়ে কোনো কাজ করিনি। অতীতেও ২২ জন মন্ত্রী একসঙ্গে বিমান পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। এখানে নতুন কিছু নেই।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সমালোচনার জবাব দেন সচিব নাসরীন জাহান। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে প্রবাসী শ্রমিকদের যৌক্তিক মূল্যে বিদেশ গমনাগমন নিশ্চিত করতেই এভিয়েশন খাতে প্রয়োজনীয় আইন ও নীতিমালা সংস্কার করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু গণমাধ্যমে এই সংস্কার কার্যক্রম ভুলভাবে উপস্থাপিত হওয়ায় বিষয়গুলো স্পষ্ট করা প্রয়োজন হয়েছে।
নাসরীন জাহান জানান, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মূয়ীদ চৌধুরী সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। সে প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ বিমান আইন অনুযায়ী প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদনক্রমে শেখ বশিরউদ্দিনকে মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিমান বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর আগেও এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের একইভাবে যুগপৎ দায়িত্ব পালনের নজির রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সচিব আরও বলেন, এয়ার টিকিট সিন্ডিকেট ও টিকিট ব্লকিং রোধে গত ১ জানুয়ারি বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬ এবং ট্রাভেল এজেন্সি নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ সংশোধন অধ্যাদেশ, ২০২৬ জারি করা হয়েছে। এর ফলে টিকিট ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেলগুলো লাইসেন্সিং ও জবাবদিহিতার আওতায় এসেছে, যা টিকিটের দামে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা-জেদ্দা রুটে যেখানে টিকিটের দাম ছিল প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার টাকা, সেখানে এ বছর তা কমে ৫৩ থেকে ৬০ হাজার টাকায় নেমে এসেছে। হজ ফ্লাইট ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে নাসরীন জাহান বলেন, এবার বিশেষ হজ ফ্লাইটের পরিবর্তে নিয়মিত ফ্লাইট ব্যবহার করে হজযাত্রী পরিবহণ করা হচ্ছে। এতে ফিরতি ফ্লাইটে মাত্র ২০ হাজার টাকায় ৮০ হাজার টিকিট বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে, যা ঈদুল আজহার সময় সৌদি আরবে কর্মরত প্রবাসীদের দেশে ফেরার সুযোগ বাড়াবে।
ইজারা নীতিমালা প্রসঙ্গে বলেন, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ল্যান্ড সাইড ও এয়ার সাইডের স্থাবর সম্পত্তি ইজারা দেওয়ার জন্য এ যাবত অনুসৃত নীতিমালায় বিভিন্ন অসংগতি থাকায় বেসামরিক বিমান চলাচল আইনের অধীনে একটি পূর্ণাঙ্গ বিধিমালা তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। প্রস্তাবিত বিধিমালায় আবেদনের ভিত্তিতে এয়ারসাইডে ইজারা দেওয়ার সুযোগ রহিত করে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে এবং নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো প্রকার আপস না করেই ইজারা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া ইজারার শর্ত প্রতিপালন হচ্ছে কিনা, তা দেখভাল করার জন্য মনিটরিং টিম গঠনেরও প্রস্তাব করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে রয়েছে মাত্র ১৯টি উড়োজাহাজ। ২০৩০ সালের মধ্যে এর মধ্যে চারটি উড়োজাহাজ অবসরে যাবে। নতুন উড়োজাহাজ সংযোজন না হলে বিদ্যমান রুট পরিচালনা ও নতুন রুট চালু করা কঠিন হয়ে পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরোপিত ৩৭ শতাংশ রিসিপ্রোকাল ট্যারিফের ফলে সৃষ্ট বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা কাটাতে ৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যেই ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলেও জানান সচিব। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে প্রতিবেশী দেশগুলো শত শত বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে। এ বাস্তবতায় বিমান বহর ও নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, উড়োজাহাজ কেনার প্রক্রিয়া ২০২৪ সালেই শুরু হয়েছে এবং এটি কোনোভাবেই তড়িঘড়ি করে নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়।
