সাঈদীর মামলার সাক্ষী সুখরঞ্জনকে অপহরণকারী পুলিশ কর্মকর্তা কারাগারে
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ১০:২৯ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জামায়াত নেতা প্রয়াত আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষের সাফাই সাক্ষী সুখরঞ্জন বালীকে গুমের ঘটনায় জড়িত অভিযোগে এক সহকারী পুলিশ সুপারকে (এএসপি) গ্রেফতার করা হয়েছে। তার নাম ফজলুর রহমান। বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর বাড্ডার নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। শুক্রবার তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেছেন, ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণ থেকে সুখরঞ্জনকে অপহরণের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন ফজলুর রহমান। বালি হাইকোর্ট এলাকায় গাড়ি থেকে নামলে তাকে থাপ্পড় মেড়ে শার্টের কলার ধরে ডিবির গাড়িতে তুলে নিয়ে যান তিনি। শুক্রবার বিকালে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন শফিকুল ইসলাম।
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে এসে ২০১২ সালে নিখোঁজ হয়েছিলেন সুখরঞ্জন। পরে ভারতের কারাগারে তার খোঁজ মেলে।
ডিবি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, ট্রাইব্যুনাল আমাদের একটা রিকুইজিশন দিয়েছিল। তার ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে বাড্ডার নিজ বাসভবন থেকে ফজলুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হস্তান্তর করা হয়েছে। এরই মধ্যে তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা জানতে পেরেছি, আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলায় সুখরঞ্জনকে অপহরণের সঙ্গে তিনি সরাসরি জড়িত ছিলেন। ডিবির এ কর্মকর্তা আরও বলেন, ঘটনার সময় ফজলুর রহমান ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশে (ডিবিতে) কর্মরত ছিলেন। ঘটনার দিন ভুক্তভোগী সুখরঞ্জন হাইকোর্ট এলাকায় গাড়ি থেকে নামলে তাকে একটা থাপ্পড় মারেন ফজলুর রহমান। এরপর শার্টের কলার ধরে টেনে হিঁচড়ে তাকে ডিবির গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ঘটনায় ফজলুর ও তার টিম প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল।
আদালতের হাজতখানার ইনচার্জ মো. মোরশেদুল ইসলাম বলেন, শুক্রবার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত কর্মকর্তা মো. হেলালুল ইসলাম মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আসামি ফজলুর রহমানকে জেলহাজতে রাখার আবেদন করেন। তবে শুনানিকালে আসামিকে এজলাসে ওঠানো হয়নি। বিকালে শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব আলম আসামিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
আটকের আবেদনে বলা হয়, ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর সকাল সাড়ে ৯টার সময় দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর পক্ষের সাক্ষী সুখরঞ্জন তার আইনজীবীসহ ট্রাইব্যুনালের (পুরাতন হাইকোর্ট ভবন) মূল ফটকের সামনে গাড়িযোগে এসে থামেন। সঙ্গে সঙ্গে সাদা পোশাকধারী বাহিনীর লোকজন তাকে গাড়ি থেকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে জোরপূর্বক একটি সাদা ডাবল কেবিন গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে যায়। এরপর ভিকটিম সুখরঞ্জনকে চোখবাঁধা অবস্থায় ২ মাস ধরে শারীরিক নির্যাতন করে অন্ধকার বন্দিশালায় আটকে রাখা হয়। পরবর্তীতে ভারতের দমদম কেন্দ্রীয় কারাগারে ৫ বছর আটক থাকার পর সেখানকার গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ পায়। তখন বাংলাদেশ থেকে তার ছেলে অপূর্ব ভারতে গিয়ে কারাগার থেকে তার বাবাকে জামিনে মুক্ত করে নিয়ে আসেন।
আবেদনে আরও বলা হয়, মামলাটির তদন্তকালে এবং প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য-প্রমাণে জানা গেছে, ঘটনার দিন ডিবি থেকে ২টি ডাবল কেবিন গাড়িযোগে আসামি ফজলুর রহমান ও তার সঙ্গীয় অফিসার ও ফোর্স অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সম্মুখ থেকে ভিকটিমকে জোরপূর্বক আটক করে মিন্টু রোডের ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যান। সেখানে হাজতখানায় রাখার পর তাকে সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনার সঙ্গে ফজলুর রহমানের জড়িত থাকার বিষয়ে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে।
পরিবার, স্বজন ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, সুখরঞ্জনকে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে অপহরণ করা হলেও সে সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে তাকে সীমান্ত এলাকায় পাওয়ার দাবি করা হয়। তবে শুরু থেকে পরিবার ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো পুলিশের দাবিকে প্রত্যখ্যান করেছিল। ঘটনাটি সে সময় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
এদিকে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনার সরকারের পতনের পর ওই মাসেরই ২১ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর কার্যালয়ে একটি অভিযোগ দায়ের করেন সুখরঞ্জন। এতে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহাসহ ৩২ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। আসামি তালিকায় ট্রাইব্যুনালের সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম, সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ, সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, ট্রাইব্যুনালের সাবেক বিচারক বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবির, সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন এবং পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম আউয়ালের নামও রয়েছে।
