Logo
Logo
×
   

Advertisement

জাতীয়

বাংলাদেশকে মুসলিম দেশগুলোর জন্য নমুনা হিসেবে গড়ে তুলুন: সাজ্জাদ নোমানী

Advertisement

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬, ১০:৫৩ পিএম

বাংলাদেশকে মুসলিম দেশগুলোর জন্য নমুনা হিসেবে গড়ে তুলুন: সাজ্জাদ নোমানী

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে বয়ান করছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামী স্কলার আল্লামা ড. খলিলুর রহমান সাজ্জাদ নোমানী।

Advertisement

বাংলাদেশকে মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি আদর্শ ও অনুসরণযোগ্য রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামী স্কলার আল্লামা ড. খলিলুর রহমান সাজ্জাদ নোমানী।

তিনি বলেন, একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন ও স্থায়ী শান্তির ভিত্তি হলো নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা এবং সর্বস্তরে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা। ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র প্রতিটি স্তরে ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও কুরআনের শিক্ষা অনুসরণের মাধ্যমেই একটি সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে উঠতে পারে।

শুক্রবার (১৭ জুলাই) জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে জুমার নামাজের আগে গুরুত্বপূর্ণ বয়ানে তিনি এসব কথা বলেন। পরে জুমার নামাজ শেষে জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি আবদুল মালিকের অনুরোধে দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় বিশেষ দোয়া পরিচালনা করেন তিনি।

বয়ানের শুরুতে আল্লাহতাআলার প্রশংসা এবং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠ করেন সাজ্জাদ নোমানী। এরপর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক, বায়তুল মোকাররমের খতিব এবং সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

একটি সমৃদ্ধ, উন্নয়নশীল ও আদর্শ রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতে গিয়ে তিনি পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নাহলের ১১২ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করে তিনি বলেন, আল্লাহতাআলা একটি নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত জনপদের উদাহরণ দিয়েছেন, যেখানে চারদিক থেকে পর্যাপ্ত জীবিকা পৌঁছে আসে। এ আয়াতের আলোকে তিনি বলেন, একটি উন্নত রাষ্ট্র গঠনের জন্য দুটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সব মানুষের খাদ্য ও জীবিকার নিশ্চয়তা দেওয়া। এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মানুষ ভীত-সন্ত্রস্ত থাকবে না এবং কেউ অভুক্ত থাকবে না।

রাষ্ট্রের স্বাভাবিক পরিবেশ কেমন হওয়া উচিত, সে প্রসঙ্গে তিনি হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সেই ঐতিহাসিক দোয়ার কথা উল্লেখ করেন, যা সূরা ইবরাহিমের ৩৫ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, নিরাপদ সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য নবী-রাসুলরাও আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন। নিরাপত্তা একটি বড় নেয়ারমত, যা আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে।

বাংলাদেশের জনগণের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ দেশ পেয়েছেন। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বড় নেয়ামত। এ প্রসঙ্গে তিনি সূরা ইবরাহিমের ৭ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করে বলেন, মানুষ যদি আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে, তবে আল্লাহ সেই নেয়ামত আরও বৃদ্ধি করে দেন।

সাজ্জাদ নোমানী দেশের আলেম-উলামা, শিক্ষাবিদ, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, পেশাজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলীসহ সর্বস্তরের মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সবাই মিলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যা বিশ্বের সামনে আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

তিনি রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সরকার, বিরোধী দল, প্রধানমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, আইনজীবী এবং সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মুসলিম নারী-পুরুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রত্যেকে যেন প্রতিদিন কুরআনের কিছু অংশ অর্থসহ পড়েন এবং কুরআনের শিক্ষা বোঝার জন্য প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ করেন।

তিনি বলেন, দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে এবং এমনভাবে দেশ গড়ে তুলতে হবে, যাতে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, শয়তান যেন বিভেদ সৃষ্টি করতে না পারে। উলামায়ে কেরামের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক বজায় রাখারও আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, আল্লাহতাআলা মানবজাতিকে অসংখ্য নেয়ামত দান করেছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো একটি দেশের শান্তি, নিরাপত্তা ও স্বস্তির পরিবেশ। মানুষ তখনই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে, যখন তার জান-মাল, ইজ্জত-আবরু ও মৌলিক অধিকার নিরাপদ থাকে এবং জীবিকার পথ উন্মুক্ত থাকে।

তিনি বলেন, এ শান্তি কেবল শক্তি, ক্ষমতা কিংবা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না; বরং এর প্রকৃত ভিত্তি হলো ন্যায়বিচার, সমতা ও ইনসাফ। সমাজে যখন বৈষম্য, জুলুম, বেইনসাফি ও অধিকার হরণের সংস্কৃতি বিস্তার লাভ করে, তখন শান্তি নষ্ট হয়, মানুষের মধ্যে ভয় ও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তিনি আবারও সূরা আন-নাহলের ১১২ নম্বর আয়াত উদ্ধৃত করে বলেন, নিরাপত্তা ও জীবিকার প্রাচুর্য একটি আদর্শ সমাজের মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

এরপর সূরা কুরাইশের আয়াত তিলাওয়াত করেন তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা কুরাইশদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, ক্ষুধা থেকে মুক্তি এবং ভয় থেকে নিরাপত্তা মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় দুটি প্রয়োজন। তাই মানুষের কর্তব্য হলো আল্লাহর বিধান অনুসরণ করা এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা।

তিনি বলেন, ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গন সব ক্ষেত্রেই ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হলে মানুষের অধিকার নিশ্চিত হবে, ভয় দূর হবে এবং স্থায়ী শান্তি ফিরে আসবে।

এ সময় তিনি কুরআনের দুটি আয়াত উদ্ধৃত করে বলেন, প্রত্যেক মানুষের উচিত আত্মসমালোচনা করা নিজের প্রতি, পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি আল্লাহ প্রদত্ত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা হচ্ছে কিনা। অর্থনীতি, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, শিক্ষা ও সমাজের প্রতিটি স্তরে ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হলে দেশে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

তিনি বলেন, সমাজ পরিবর্তনের সূচনা রাষ্ট্র থেকে নয়; বরং ব্যক্তি ও পরিবার থেকেই শুরু হয়। প্রত্যেকের সংকল্প হওয়া উচিত নিজের কারণে যেন কোনো মানুষ কষ্ট না পায়।

প্রতিবেশীর হক আদায়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, প্রতিবেশী মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কিংবা অন্য যেকোনো ধর্মাবলম্বী হোক না কেন, তার পাশে দাঁড়াতে হবে, খোঁজ নিতে হবে এবং প্রয়োজন হলে সহযোগিতা করতে হবে।

তিনি প্রত্যেককে প্রতিবেশীর কাছে গিয়ে নিজের ফোন নম্বর দিয়ে বলার আহ্বান জানান, আপনার কোনো বিপদ, অসুবিধা বা প্রয়োজন হলে আমাকে জানাবেন। আমি আমার সামর্থ্য অনুযায়ী আপনার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।

তিনি বলেন, এমন মানবিক আচরণ বহু বছরের দূরত্ব ও অবিশ্বাস দূর করতে পারে। মানুষের হৃদয় জয় করার সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হলো উত্তম চরিত্র, সুন্দর আচরণ এবং বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানো।

তিনি আরও বলেন, একটি উন্নত, আদর্শ ও নিরাপদ জনপদ গড়তে প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রতিবেশীর অধিকার বাস্তবায়নের পাশাপাশি সরকারি সম্পদ নষ্ট করা থেকে বিরত থাকতে হবে, ছোটখাটো বিষয় নিয়ে মারামারি, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা যাবে না, সড়কে চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করা যাবে না এবং কারো সম্পদের ক্ষতি করা যাবে না।

একই সঙ্গে নারীদের সর্বোচ্চ সম্মান নিশ্চিত করা, রাস্তাঘাটে তাদের উত্যক্ত না করা, পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও মানবিক আচরণ বজায় রাখা এবং প্রত্যেক মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

সাজ্জাদ নোমানী বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় যে সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা শক্তি বা ভয়ের মাধ্যমে নয়; বরং ইনসাফ, ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও মানবিক আচরণের মাধ্যমে গড়ে উঠেছিল। আজও যদি সেই নববী আদর্শ ব্যক্তি জীবনে ধারণ করা যায়, তবে ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে রাষ্ট্র সব স্তরেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

তিনি বলেন, কুরআনের ভাষায় নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা অনুযায়ী মানবিকতা ও প্রতিবেশীর হক আদায়ের সমন্বয়েই একটি আদর্শ সমাজ গড়ে ওঠে।সুতরাং আসুন, আমরা নিজেদের জীবন থেকে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার যাত্রা শুরু করি। কারণ যেখানে ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানেই শান্তি আসে; যেখানে ন্যায়বিচার কায়েম হয়, সেখানেই নিরাপত্তা ফিরে আসে; আর যেখানে আল্লাহর বিধান কার্যকর হয়, সেখানেই সমৃদ্ধি ও কল্যাণের দ্বার উন্মুক্ত হয়।

উর্দু ভাষা থেকে বয়ানের অনুবাদ করেছেন- মাওলানা সলিমুদ্দিন মাহদী কাসেমী ও মাওলানা আশরাফ আলম কাসেমী নদবী।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম