Logo
Logo
×
   

Advertisement

জাতীয়

রক্তাক্ত স্মৃতি নিয়ে নাহিদুলের আক্ষেপ

জুলাইকে ধারণকারীরাই আজ উপেক্ষিত

Advertisement

মো. জহিরুল ইসলাম

মো. জহিরুল ইসলাম

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬, ১২:৪৬ পিএম

জুলাইকে ধারণকারীরাই আজ উপেক্ষিত

নাহিদুল ইসলামের ‘মুখ চেপে রুদ্ধ করে দিতে চাওয়া স্বাধীন কণ্ঠস্বর’- সেই স্মৃতি আজও দেশের লাখো মানুষের মনে গাঁথা।

Advertisement

গত ৩১ জুলাই ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচিতে আনুমানিক দুপুর ১টার দিকে হাইকোর্টের সামনে উত্তাল হয়ে উঠেছিল রাজপথ। চারদিকে টিয়ারশেল ও পুলিশের তাণ্ডবের মধ্যে হঠাৎ একদল পুলিশ তার মুখ চেপে ধরেছিল; রুদ্ধ করে দিতে চেয়েছিল একটি স্বাধীন কণ্ঠস্বর। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সেই স্মৃতি আজও দেশের লাখো মানুষের মনে গাঁথা। 

পুলিশের সেই হিংস্র থাবাকে উপেক্ষা করে পরবর্তী সময়ে বুকচিরে বুলেটের আঘাত নিয়েও রাজপথে লড়াই চালিয়ে যাওয়া সেই বীর—নিউ মডেল ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী ও ছাত্রনেতা নাহিদুল ইসলাম।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন কিংবা ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান সরাসরি দেখার সুযোগ নাহিদের হয়নি। বইয়ের পাতায় পড়ে জেনেছেন সেসব ইতিহাস। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তিনি নিজেই রাজপথে নেমে ইতিহাসের এক সাহসী অধ্যায়ের অংশ হয়েছেন।

সম্প্রতি মুখোমুখি বসে যখন তিনি রাজপথের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোর কথা বলছিলেন, তখন বারবার তার চোখ দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল পানি। 

নাহিদের ভাষায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানটা কোনো পরিকল্পনা অনুযায়ী হয়নি। এটা কেউ পরিকল্পনা করে ঘটায়নি, ঘটাতেও পারত না। এটা ঘটেছে একটি যৌক্তিক আন্দোলনের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে। আর সেই ভিত্তির ওপর ভর করেই আমরা আমাদের সর্বশেষ গন্তব্য এক দফা আন্দোলন—অর্থাৎ হাসিনার পতনের আন্দোলনে নিয়ে গিয়েছি।

বুকের ভেতর বুলেটের ক্ষত ও দুঃসহ স্মৃতির কান্না

হাইকোর্টের সামনে পুলিশ মুখ চেপে ধরা কিংবা পরবর্তী সময়ে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নাহিদের বুলেটবিদ্ধ রক্তাক্ত ছবি দেখে শিউরে উঠেছিলেন দেশের লাখো মানুষ। কিন্তু শরীর ভেদ করে যাওয়া সেই বুলেটের ক্ষত শুধু চামড়ায় নয়, স্থায়ীভাবে জমে আছে তার বুকের গহিনে।

সেই ভয়াল স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে স্বর রুদ্ধ হয়ে আসে নাহিদের। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি জানান, ওই রাতের রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হলে এখনো রাতে ঘুমাতে পারেন না।

ওই দুঃসহ স্মৃতি যদি এখনো চোখের সামনে ভেসে ওঠে, আমি আসলে রাতে ঘুমাতে পারি না। মাঝে মাঝে ওই যে আশঙ্কায়, বিপদের চমকে মানুষ যেভাবে লাফিয়ে ওঠে—আমরা সেভাবেই আতঙ্কে জেগে উঠি। শুধু ওই স্মৃতিগুলো আমার কানে বাজে। আমার পাশের সহযোদ্ধা ও সহপাঠীরা চিৎকার করে বলছিল—‘বাঁচান, বাঁচান! মুখ জ্বলে যাচ্ছে, পিঠ জ্বলে যাচ্ছে, হাত জ্বলে যাচ্ছে!’ বুলেটের প্রত্যেকটি আঘাত হৃদয়ের এমন জায়গায় লেগে আছে, যা অতীতের ১০০ বছরের ইতিহাস দিয়েও বোঝা সম্ভব নয়।

১৬ জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর যখন চারদিকে কারফিউ এবং ২১ জুলাই হাইকোর্টের রায় নিয়ে টানটান উত্তেজনা, তখন কীভাবে কাটছিল নাহিদদের সময়—এমন প্রশ্নের জবাবে তার কণ্ঠে ফুটে ওঠে এক অদম্য সাহস।

নাহিদ বলেন, কারফিউ ভাঙার মতো ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আমাদের যা যা করতে হয়েছে, আমরা ঠিক তা-ই করেছি। কারফিউ ভাঙার মতো দুঃসাহসি সংগ্রাম একমাত্র তারাই করতে পারে, যারা চিন্তা করে—আমি আমার দেশকে ভালোবাসি এবং দেশের জন্য জীবন দিতে পারি।

ইতিহাস টেনে নাহিদ বলেন, যে কোনো গণঅভ্যুত্থানে রাষ্ট্র ও জনগণ সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধানের।

নাহিদের ভাষ্য, উনি পদত্যাগ করে যদি বাংলাদেশে থাকতেন, তাহলে উনার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারটা থাকত। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, উনি সেই জায়গাটা রাখেননি। উনি নিজের ধ্বংস নিজেই ডেকে এনেছেন। ওই কারফিউ ভাঙার মধ্য দিয়েই উনার পতন অনিবার্য ছিল এবং পতন হওয়া দরকার ছিল। যদি পতন না ঘটাতে পারতাম, তাহলে আজ আমরা বেঁচে থাকতাম না, কথা বলতে পারতাম না।

‘আমরা বিলুপ্তির পথে, মুখোশধারীরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে’

রাজপথে পুলিশের নিপীড়ন সহ্য করা এবং বুলেটে ক্ষতবিক্ষত হওয়া সেই নাহিদের বুকজুড়ে আজ স্বৈরাচারের পতনের পরও রয়েছে চরম হতাশা। রাজপথের রক্তভেজা তরুণদের আজ কতটা অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে, তা বলতে গিয়ে তার গলায় ঝরে পড়ে তীব্র ক্ষোভ।

জুলাইকে যারা ধারণ করে না, আর জুলাইকে যারা ধারণ করে—এই দুই ধরনের মানুষ আমাদের সমাজ থেকে এখন প্রায় বিলুপ্ত হওয়ার পথে। কীভাবে? আমরা ধারণ করি গুটিকয়েক মানুষ, আমাদের পাশে সরিয়ে রাখা হয়। আর যারা ধারণ করে না, তারা ইতিহাসের নিশাচরের জায়গায় নিমজ্জিত হবে। সুতরাং তারাও বিলুপ্ত, আমরাও বিলুপ্ত।

তাহলে আজ বিপ্লবের সুফল ভোগ করছে কারা? নাহিদের উত্তর ছিল স্পষ্ট—এখন মধ্যস্বত্বভোগী যারা আছেন, তারাই সুশীল সমাজের মুখোশ পরে সমাজে বিচরণ করছে। বাংলাদেশের প্রতিটি শ্রেণি-পেশাকে ধ্বংস করার যে উপক্রম চলছে, তারাই এটা করছে। আর এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক হচ্ছে রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিরা।

মুখ চেপে ধরা কিংবা বুলেটের ক্ষত বুকে নিয়ে আজও রাতে আঁতকে ওঠার পর নাহিদের চাওয়াটা খুব স্পষ্ট। তিনি চান না কেবল ক্ষমতার হাতবদল হোক। তিনি চান সাধারণ শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষের মৌলিক পরিবর্তন।

নিজের চূড়ান্ত লক্ষ্য নিয়ে নাহিদ বলেন, বাংলাদেশের মানুষের অধিকার আছে, কিন্তু ক্ষমতা এবং কর্তৃত্ব নেই। আমরা চাই শ্রমজীবী, কর্মজীবী, পেশাজীবী সহ বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকারের পাশাপাশি ক্ষমতা এবং কর্তৃত্ব—এই তিনটি জিনিসের সমন্বয়ে বাংলাদেশের মানুষ নাগরিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করুক।’

বুলেটের রক্তে ভেসে যাওয়া নাহিদের মতো যোদ্ধাদের রক্ত হয়তো রাজপথ থেকে মুছে গেছে, কিন্তু তাদের বুকচেরা আর্তনাদ, দুঃসহ স্মৃতি আর সুশীলতার মুখোশধারীদের প্রতি এই তীব্র ধিক্কার আজও এক বিরাট প্রশ্ন হয়ে তাড়া করে ফিরছে পুরো জাতিকে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম