Logo
Logo
×
   

Advertisement

জাতীয়

তেল, দুধ, চিনি থেকে কতটা মাইক্রোপ্লাস্টিক আপনার শরীরে ঢুকছে?

Advertisement

Icon

বিবিসি বাংলা

প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৫৫ পিএম

তেল, দুধ, চিনি থেকে কতটা মাইক্রোপ্লাস্টিক আপনার শরীরে ঢুকছে?

Advertisement

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা থাকার বিষয়টি সামনে আসার পর থেকেই বাংলাদেশে এ নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। এবার দুধ, চিনি ও সয়াবিন তেলেও অধিক মাত্রায় এই উপাদানের উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকরা।

নিত্যদিনের খাদ্য তালিকায় থাকা পণ্যেও অধিক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকার বিষয়টি সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

এসব গবেষণা তথ্য সামনে আসার পর, মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে গেলে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে? একজন মানুষ নিয়মিত কী পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ করছেন, প্রতিকারের উপায় কী- এমন নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন অনেকেই।

গবেষকরা বলছেন, কেবল সয়াবিন তেলের মাধ্যমেই একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতিদিন গড়ে ১৭ দশমিক ৬৫টি এবং বছরে প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি প্লাস্টিক কণা বিভিন্ন খাবারের সঙ্গে গ্রহণ করছেন।

শিশুদের ক্ষেত্রে এই অবস্থা আরও খারাপ বলেই মত গবেষকদের। তারা বলছেন, একজন শিশু প্রতিদিন গড়ে ৭৭ দশমিক ২১টি অর্থাৎ বছরে প্রায় ২৮ হাজার ১৮০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করছে।

খাবারে মাইক্রোপ্লাস্টিক আসার তিনটি পথ নির্ধারণ করেছেন গবেষকরা। তারা বলছেন, প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেট এবং বস্তা থেকে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা খাবারে অধিক হারে মিশছে।

এছাড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় কারখানার মেশিন, পাইপ, কনভেয়ার বেল্ট ক্ষয়ে গিয়েও কণা তৈরি হচ্ছে। আর পরিবেশ দূষণের কারণে প্লাস্টিক বর্জ্য ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিক হয়ে পানি, মাটি ও বাতাসে মিশছে।

গবেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় আট হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়, যার অর্ধেকের বেশিই সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা হয় না। সেই বর্জ্য ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিক হয়ে খাদ্যচক্রে ঢুকছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিভিন্ন পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকা এবং সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়টি দেশি-বিদেশি নানা গবেষণায় উঠে আসলেও, কতটুকু মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের ফলে শরীরের কোন অঙ্গে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, এর বিস্তারিত গবেষণা এখনও হয়নি।

তবে ১৩০ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট কণাগুলো সরাসরি রক্তেও মিশে যেতে পারে বলে মনে করেন চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা। যার ফলে পরিপাকতন্ত্রের জটিলতা, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, প্রদাহ ও কোষের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হতে পারে বলে মত তাদের।

জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি বা ইউএনইপি- এর বাস্তুতন্ত্র বিভাগের পরিচালক সুসান গার্ডনার বলছেন, পণ্যগুলোকে এমনভাবে নতুন করে ডিজাইন করা, যাতে সেগুলোতে প্লাস্টিকের পরিমাণ ও প্লাস্টিক ফাইবার কম থাকে এবং ব্যবহারের শেষে তা পরিবেশে নির্গত না হয়।

বিভিন্ন পণ্য পরিবহন ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধের পরামর্শও দিচ্ছেন তিনি।

দুধ, চিনি ও তেলেও মাইক্রোপ্লাস্টিক

সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় বাংলাদেশের বাজারে প্রচলিত টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি ধরা পড়েছিল। যেখানে ১৯টি ব্রান্ডের ৩৪টি নমুনার মধ্যে ২৬টিতেই মিলেছে প্লাস্টিক কণা।

এমনকি শিশুদের জন্য তৈরি ছয়টি টুথপেস্টের মধ্যে চারটিতেই পাওয়া গেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক।

এই তথ্য পাওয়ার পর অনেকেই বেশ নড়েচড়ে বসেছেন। সামাজিক মাধ্যম কিংবা গণমাধ্যমেও এ নিয়ে নানা আলোচনা চলছে।

এমন প্রেক্ষাপটেই এবার দুধ, চিনি এবং সয়াবিন তেলের মধ্যেও প্লাস্টিক কণা পাওয়ার দাবি করেছেন গবেষকরা। পৃথক তিনটি গবেষণায় উঠে এসেছে এসব তথ্য।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কাঁচা দুধ ও সুপারশপের প্রক্রিয়াজাতকরণ দুধ সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছেন, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক মো. ওমর ফারুক এর নেতৃত্বে একটি গবেষক দল।

গবেষণা তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০ মিলিলিটার প্রসেসড দুধে গড়ে ১৫৬ দশমিক ০৬টি এবং কাঁচা দুধে গড়ে ৯৩ দশমিক ৩৯টি কণা পাওয়া গেছে।

অধ্যাপক মো. ওমর ফারুক বলছেন, খামার থেকে দুধ সংগ্রহের পর প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের পাইপে পরিবহন, কারখানায় প্রক্রিয়াজাতকরণ, কর্মীদের প্লাস্টিকের গ্লাভস এবং সবশেষে প্লাস্টিকের বোতল বা প্যাকেটে সংরক্ষণের প্রতিটি ধাপেই প্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসছে দুধ।

গবেষণাগারে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে দেখা যায়, প্রাপ্ত কণাগুলোর অধিকাংশ ছিল স্বচ্ছ এবং আঁশের মতো তন্তু আকৃতির। দুধে শনাক্ত হয়েছে পিটিএফই বা টেফলন, পিইটি, নাইলন-৬, পিভিসহ একাধিক ক্ষতিকর পলিমার।

গবেষণায় বলা হয়েছে, ৪ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের খাদ্যে দুধের নির্ভরতা বেশি। ফলে তাদের দেহে এই প্লাস্টিক কণা প্রবেশের হারও সর্বাধিক।

অন্যদিকে, জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন এন্ড অ্যানালিসিস নামের আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় ঢাকার বিভিন্ন খুচরা বাজার থেকে সংগ্রহ করা খোলা এবং প্যাকেটজাত সাত ধরনের চিনি পরীক্ষা করেছেন একদল গবেষক।

যেখানে, ব্রান্ডেড চিনির প্রতি কেজিতে গড়ে কমবেশি ৩২২টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা এবং খোলা চিনিতে প্রতি কেজিতে গড়ে প্রায় ৪০৩টি কণা পাওয়া গেছে।

গবেষকরা বলছেন, পরিসংখ্যানগত দিক দিয়ে পার্থক্য খুব বেশি না হলেও খোলা চিনিতে দূষণ তুলনামূলক বেশি। শনাক্ত হওয়া কণাগুলোর আকার ১২ মাইক্রোমিটার থেকে তিন দশমিক ১৯ মিলিমিটার পর্যন্ত।

প্লাস্টিকের বস্তা, প্রক্রিয়াজাতকরণ যন্ত্রপাতি, পরিবহন ও সংরক্ষণের সময় পরিবেশ থেকে ছড়িয়ে পড়া প্লাস্টিকই এর মূল উৎস বলে মত গবেষকদের।

সয়াবিন তেল পরীক্ষায় উঠে এসেছে আরও ভয়াবহ তথ্য। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের যৌথ গবেষণাপত্রটি সম্প্রতি জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন এন্ড অ্যানালিসিস জার্নাল -এ প্রকাশ হয়েছে।

গবেষকরা ঢাকার তেজগাঁও, উত্তরা ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকার সুপারশপ ও খোলা বাজার থেকে ৬০টি সয়াবিন তেলের নমুনা সংগ্রহ করেন।

যেখানে, খোলা সয়াবিন তেলে প্রতি লিটারে গড়ে প্রায় ৪৫ হাজার থেকে ৭০ হাজার এবং বোতলজাত তেলে প্রতি লিটারে গড়ে প্রায় ৪৪ হাজার থেকে ৫৪ হাজারটি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও গবেষণা দলের প্রধান ড. শফি মুহাম্মদ তারেক বলছেন, শিল্পকারখানার আধিক্য, টেক্সটাইল ও প্লাস্টিক কারখানার কাছাকাছি অবস্থান এবং খোলা তেল সংরক্ষণে পাত্রের বারবার ব্যবহারের কারণে এমনটা হচ্ছে। মাইক্রোপ্লাস্টিকের যে মাত্রা পাওয়া গেছে সেটি ভয়াবহ। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে এ নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন এবং কীভাবে এটি কমানো যায় তাও ভাবা দরকার। 

মাইক্রোপ্লাস্টিক কী?

মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো প্লাস্টিকের এমন যে-কোনো কণা, যার প্রস্থ এক ন্যানোমিটার থেকে পাঁচ মিলিমিটারের মধ্যে।

জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি বা ইউএনইপি- এর বাস্তুতন্ত্র বিভাগের পরিচালক সুসান গার্ডনার এর মতে, এর দুটি প্রধান উৎস রয়েছে। কিছু প্লাস্টিক ছোট করে তৈরি করা হয়- যেগুলো প্রাইমারি মাইক্রোপ্লাস্টিক নামে পরিচিত, যেটি ফেস ওয়াশ এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে যোগ করা হয়।

কিন্তু বেশিরভাগ মাইক্রোপ্লাস্টিক আসে বড়ো আকারের প্লাস্টিক পণ্য পচনের ফলে, যার মধ্যে রয়েছে প্লাস্টিকের মোড়ক, টেকঅ্যাওয়ে কন্টেইনার, পলিয়েস্টারের পোশাক, টায়ার, রঙ এবং কৃত্রিম ঘাস। এগুলো সেকেন্ডারি মাইক্রোপ্লাস্টিক নামে পরিচিত।

ইউএনইপি এর তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীতে কেবল ২০২০ সালেই প্রায় ২৭ লক্ষ টন মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিবেশে মিশেছিল। ধারণা করা হচ্ছে যে, ২০৪০ সালের মধ্যে এই পরিমাণ দ্বিগুণ হতে পারে।

ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের পণ্য- যেমন পানির বোতল ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হতে পারে। পলিয়েস্টারের মতো সিন্থেটিক কাপড় ধোয়ার সময়ও মাইক্রোপ্লাস্টিকের আঁশ ঝরে পড়তে পারে।

এছাড়া, মানুষ যখন এই কণা মিশ্রিত পণ্য ব্যবহার করে, তখনও মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিবেশে নির্গত হয়। পানি, মাটি এবং বাতাসেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায় বলে দাবি ইউএনইপি এর।

২০১৯ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি তাদের অবস্থান এবং কার্যকলাপের উপর নির্ভর করে বছরে গড়ে ৩৯ হাজার থেকে ৫২ হাজার পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করতে পারেন।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম