Logo
Logo
×
   

জাতীয়

বিন্না ঘাস কী- কেন সরকার এই ঘাসের ব্যবহার বাড়াতে চায়?

Icon

যুগান্তর ডেস্ক

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৩:২৮ পিএম

বিন্না ঘাস কী- কেন সরকার এই ঘাসের ব্যবহার বাড়াতে চায়?

গ্রামাঞ্চলের কোথাও কোথাও এই ঘাসটি বেন্না ঘাস, খসখস কিংবা ছন নামেও পরিচিত।

বাংলাদেশের মাঠে-ঘাটে কিংবা পরিত্যক্ত জমিতে এক ধরনের লম্বা ঘাস দেখা যায়।  বাংলায় যার নাম বিন্না ঘাস। পতিত জমিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এই ঘাসকে ব্যাপকহারে ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। 

মূলত বিভিন্ন দেশে পাহাড়ের ক্ষয়রোধ ও পাহাড়ধস বন্ধে পার্শ্বঢালে এই বিন্না ঘাস লাগানো হয়ে থাকে।  যে কারণে বিন্না ঘাস কোন কোন প্রকল্পে ব্যবহার করা যায় তা পর্যালোচনার জন্য সোমবার সরকার একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করেছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের শিক্ষক ও গবেষক অধ্যাপক মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম প্রায় দুই দশক ধরে এই ঘাস নিয়ে গবেষণা করছেন।  যে কারণে সরকার এই ঘাসের উপযোগিতা যাচাই করতে যে কমিটি গঠন করেছে সেখানেও যুক্ত করা হয়েছে অধ্যাপক ইসলামকে।

মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম বলছিলেন, এই ঘাসের লম্বা মূল বা শেকড় খুব দ্রুত মাটির গভীরে ঢুকে, মাটিকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রাখে। যে কারণে প্রকৌশল বিদ্যায় এই ঘাস ব্যবহার করে রাস্তা ঘাট, পাহাড় ধ্বস, নদীর ভাঙনও রক্ষা করা হয়।  যে কারণে বর্তমান সরকারও এই ঘাসটি কোন কোন খাতে ব্যবহার করতে পারে সে জন্য একটি গাইডলাইন তৈরিরও নির্দেশ দিয়েছে।

নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বর্তমান সরকার বাংলাদেশজুড়ে খাল খননের কার্যক্রম শুরু করেছে।  বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃষ্টির সময় এই খালগুলো ভরাট হয়ে যাবে। যে কারণে বাঁধ রক্ষা ও খাল ভরাট রোধে এই বিন্না ঘাসই সাশ্রয়ী এবং টেকসই বিকল্প হিসেবে ব্যবহার হতে পারে।

এছাড়াও সড়ক ও জনপথ বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পাহাড় ধস রক্ষায় বৈজ্ঞানিকভাবে এই ঘাসকে ব্যবহারের কথা বলছেন তারা। তবে উদ্ভিদ বিজ্ঞানীরা বলছেন, পথে ঘাটে পতিত জমিতে পড়ে থাকা এই ঘাস দামি সুগন্ধিসহ নানা কাজেই ব্যবহার হয়ে থাকে এই ঘাসের শেকড় বা অন্যান্য অংশ।

বিন্না ঘাস বা ভেটিভার কী?

বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে পথে ধারে, পরিত্যক্ত জমি কিংবা চর এলাকায় গুল্মজাতীয় এই ঘাসটি দেখা যায়। এর ইংরেজি নাম ভেটিভার, তবে বাংলাদেশে বিন্না ঘাস নামেও পরিচিত। গ্রামাঞ্চলের কোথাও কোথাও এই ঘাসটি বেন্না ঘাস, খসখস কিংবা ছন নামেও পরিচিত। এই ঘাস একটি বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদও।

ভেটিভার বা বিন্না ঘাস দেখতে লম্বা সরু পাতা, ঘন ঝোপের মতো বেড়ে ওঠে। এটি সাধারণত দেড় থেকে তিন মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। কিন্তু এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর শিকড়।

ফাইল ছবি

প্রায় দুই দশকের গবেষণার অভিজ্ঞতা থেকে বুয়েটের অধ্যাপক মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম বলছিলেন, এই ঘাসের শেকড়গুলো অত্যন্ত লম্বা ও শক্তিশালী হয়। শেকড় দুই থেকে তিন মিটার কখনো কখনো চার মিটার পর্যন্ত মাটির ভেতর ভেদ করতে পারে।  লম্বা ও সরু এই ঘাসের পাতাগুলো লম্বা সরু হয়ে থাকে। পথে ঘাটে কিংবা পতিত জমিতে ঝোপের মতো বেড়ে ওঠে এই ঘাসটি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের প্রিন্সিপাল এক্সপেরিমেন্টাল অফিসার মোহাম্মদ আব্দুর রহিম বলেন, এই ঘাস দেখতে সাধারণ হলেও এর ক্ষমতা অসাধারণ। এর শিকড় শুধু মাটিকে আঁকড়ে ধরেই রাখে না, বরং ভূমির স্তরগুলোকে একটি প্রাকৃতিক জালের মতো ধরে রাখে।

গবেষকদের মতে, এর শেকড়গুলো মাটির ভেতরে জালের মতো ছড়িয়ে থাকার কারণে মাটি, পাহাড় কিংবা ভূমির ক্ষয়রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।  যে কারণে বাংলাদেশের অন্য ঘাস থেকে এই বিন্না ঘাসকে একেবারেই আলাদা মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

গবেষকরা বলছিলেন, শুধু প্রযুক্তি নয়, প্রাকৃতিক ঔষধি গুণও রয়েছে এই বিন্না ঘাসের। বিশেষ করে এর শিকড় থেকে পাওয়া যায় সুগন্ধযুক্ত তেল। সুগন্ধি, প্রসাধনী এবং বিভিন্ন সুগন্ধি পণ্যেও এর ব্যবহার করা হয়ে থাকে এই বিন্না ঘাস।

ভূমির ক্ষয়রোধে ঘাস যখন প্রযুক্তি

গবেষকদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভেটিভার বা বিন্না ঘাস ভূমির ক্ষয়রোধ, পাহাড় ধস কিংবা নদীর ভাঙন রোধে কাজ করে।  থাইল্যান্ড, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, চীন, ব্রাজিল, ভিয়েতনাম ও আফ্রিকান দেশগুলোতে এই ঘাস ভূমিধ্বস রোধ, রাস্তার বাঁধ স্লোপ সুরক্ষা, নদীতীর সংরক্ষণ ও কৃষি জমি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

গবেষকরা বলছেন, এই ঘাসটি জন্মের চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে এর শেকড় মাটির গভীরে পৌঁছে জালের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এরপরই এই ঘাস ঢাল, বাঁধ কিংবা মাটির ক্ষয়রোধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়।  এই হিম ঠাণ্ডা কিংবা খরতাপ-সব পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা আছে বলেও মনে করেন গবেষক ও উদ্ভিদ বিজ্ঞানীরা।

গবেষকদের মতে, বৃষ্টির সময় পানির স্রোত যখন ঢাল, বাঁধ কিংবা রাস্তার পাশ দিয়ে নামে তখন সেখানে এই জাতীয় ঘাস বা গুল্ম থাকলে সেটি মাটির ক্ষয়রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

অধ্যাপক শরীফুল ইসলাম নিজেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রকল্পে এই ঘাসটির ব্যবহার নিয়ে কাজ করছেন।  তিনি বলছিলেন, আমাদের দেশে বিভিন্ন সময় রড, সিমেন্ট, জিও ব্যাগ কিংবা বিভিন্ন ম্যাটেরিয়াল দিয়ে বাঁধ রক্ষার কাজ করা হয়েছে থাকে। কিন্তু এই ঘাসের শেকড় এতটাই শক্তিশালী যে এটিই বাঁধ রক্ষায় আরও কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।

তবে তার মতে, সব ধরনের পরিস্থিতি বা সব জায়গায় আবার এই ঘাস ব্যবহার করে মাটির ক্ষয়রোধ বা বাঁধ রক্ষা সম্ভব হবে না।

কারণ হিসেবে তিনি ব্যাখ্যা করছিলেন, ধরেন একটা খরস্রোতা নদীর বাঁধ রক্ষা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে যদি আপনি এই ঘাস রোপন করেন সেটি কোন কাজে লাগবে না। তবে এটি পাহাড়ের ক্ষয়রোধ কিংবা সড়ক ও জনপথের রাস্তার পাশে এই ঘাসগুলো লাগালে তা মাটির ক্ষয়রোধে বেশ ভালো কাজে দিবে।

এই ঘাসের সবচেয়ে বড় দুইটি উপকারিতাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখেন গবেষকরা। তার প্রথমটি হলো সাশ্রয়ী আর দ্বিতীয়টি পরিবেশবান্ধব।

একটি উদাহরণ দিয়ে অধ্যাপক ইসলাম বলছিলেন, ধরেন আপনি একটা বাঁধরক্ষায় রড সিমেন্ট বা কনক্রিটের ব্যবহার করলেন। সেখানে যদি আপনার খরচ হয় ১০০ টাকা। তার বিপরীতে আপনি যদি এই বিন্না ঘাসের সঠিক ব্যবহার করতে পারেন তাহলে সেটি করতে পারবেন মাত্র দশ টাকায়।

তবে, তার মতে সব জায়গায় যে এই ঘাস ব্যবহার করেই ক্ষয়রোধ বা ভুমি ধস ঠেকানো যাবে না। সে সব জায়গায় জিও ব্যাগ, কিংবা সিমেন্টের ব্লক বা রড দিয়েই বাঁধ রক্ষা করতে হবে।

হঠাৎ বাংলাদেশে আলোচনা যে কারণে

বাংলাদেশে বিশেষত চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙামাটি, কক্সবাজারের পাহাড়ি অঞ্চল এবং পদ্মা, যমুনা, মেঘনা নদীতীরবর্তী এলাকা ধস ও ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকে বছরজুড়েই।

গত ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই নির্বাচনে জিতলে বেশ কিছু উন্নয়নমূলক কাজের প্রতিশ্রুতি ছিল বিএনপির। তার মধ্যে অন্যতম একটি প্রতিশ্রুতি ছিল খাল খনন।  যে কারণে নির্বাচনের পরই এই খাল খননের কর্মসূচি উদ্বোধন করেছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও দেশের বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছেন এবং খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করছেন।

এমন পরিস্থিতিতে স্বল্প খরচে ও পরিবেশ বান্ধব উপায়ে এই বাঁধ ও খালের নাব্যতা রক্ষায় কি করা যায় সেটি নিয়ে নানা আলোচনাও হয়।  বিশেষ করে নদী ও খালের তীর, বাঁধ, পাহাড়ি ঢল ও হাওর অঞ্চলে বিন্না ঘাসের ব্যবহার পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি অবকাঠামোর স্থায়িত্ব বাড়াতে পারে সেটি নিয়ে কয়েকটি বৈঠকে এই বিন্না ঘাসের ব্যবহারের উদ্যোগ নেয় সরকার।

গত সপ্তাহে ঢাকায় এ নিয়ে একটি বৈঠক হয়। যেখানে বাংলাদেশের পানি সম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেছে, নদীভাঙন, ভূমিক্ষয় ও মাটির ক্ষয় রোধে বিন্না ঘাস একটি কার্যকর, পরিবেশবান্ধব ও স্বল্পব্যয়ী প্রাকৃতিক সমাধান হতে পারে।

পরে গত সোমবার সচিবালয়ে এ নিয়ে একটি বৈঠকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে কোন কোন প্রকল্পে এই বিন্না ঘাস ব্যবহার করা যায় তার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে টেকনিক্যাল কমিটি হয়েছে।

ওই কমিটির সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম বলছিলেন, বেশ কয়েকটি বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছে কোন কোন খাতে বা কোন কোন জায়গায় এই বিন্না ঘাসের ব্যবহার করা যায় সেই সম্ভাব্যতা যাচাই করা।

তার মতে, খালের পাড়, বড় বড় রাস্তার পাশের মাটির ক্ষয়রোধ কিংবা পাহাড়ি এলাকায় যে সব উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড হবে তা রক্ষায় এই ঘাসের ব্যবহার করা যেতে পারে।

তিনি আরও বলেন, কোন কোন সেক্টরে আমরা এটা ব্যবহার করতে পারি, কতখানি ব্যবহার করতে পারবো সেটা নির্ধারিত হবে সবার সঙ্গে আলোচনার পর। বিশেষ করে এলজিইডি, পানি উন্নয়ন বোর্ড, কিংবা সরকারের কৃষি এগুলোতে ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আপাতত এসব জায়গায় ব্যবহার হবে এই ঘাস।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .