ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে নিয়ে কী বলেছিলেন হাসনাত আবদুল্লাহ, যার জন্য এত উত্তেজনা
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৮:০০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জাতীয় সংসদে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহর দেওয়া বক্তব্যকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়। তার বক্তব্যের প্রতিবাদে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। এমনকি ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত জেলায় এনসিপির কোনো কর্মসূচি হতে দেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
তবে শনিবার (২৯ আগস্ট) হাসনাত আবদুল্লাহ নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করেন। পাশাপাশি তিনি জানান, নৌকাবাইচের স্থান উল্লেখের ক্ষেত্রে তার তথ্যগত ভুল হয়েছিল।
সংসদে কী বলেছিলেন হাসনাত
গত বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কাছে সম্পূরক প্রশ্ন করেন হাসনাত আবদুল্লাহ। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে দাবি করে বিভিন্ন পরিসংখ্যান তুলে ধরার পাশাপাশি তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বন্ধের প্রসঙ্গও আনেন।
হাসনাত বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রতি মাসে গড়ে ২৬০টি হত্যাকাণ্ড ঘটলেও বর্তমান সরকারের সময়ে তা বেড়ে ৩১১টিতে দাঁড়িয়েছে। তাঁর দাবি, আগের সরকারের ছয় মাসে ১ হাজার ৭৮০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল, আর বর্তমান সরকারের ছয় মাসে হয়েছে ১ হাজার ৭৮৯টি।
নারী ও শিশু নির্যাতন এবং পুলিশের ওপর হামলার পরিসংখ্যানও তুলে ধরেন তিনি। এরপর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রসঙ্গ টেনে হাসনাত বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কনসার্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, নৌকাবাইচ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া একটি কালচারাল জেলা সেখানে গান-বাজনা, সিনেমা বন্ধের মতোই।’
এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে তিনি জানতে চান, ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিনি সফল হয়েছেন কি না এবং এ ক্ষেত্রে তার ভূমিকা কী ছিল।
হাসনাতের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এটা প্রশ্ন, না পল্টনের বক্তৃতা বুঝতে পারিনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে ছয় মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সফল হয়েছেন কিনা, এটা একটা প্রশ্ন। তারপর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় সিনেমা হল কেন নেই, সেটা আরেকটা প্রশ্ন।’
হাসনাতের দেওয়া হত্যা ও আহতের পরিসংখ্যান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘কত হত্যা হয়েছে, জখম হয়েছে ইত্যাদি যে ডাটা দিলেন, সেই ডাটাটা কীসের ভিত্তিতে দিলেন, কী পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে দিলেন, সেই স্ট্যাটিস্টিকটা আমি জানি না।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে কি না, তা দৃশ্যমান।’ তাঁর দাবি, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
বক্তব্যের প্রতিবাদে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিক্ষোভ
সংসদে হাসনাতের বক্তব্যের পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল হয়। বিক্ষোভকারীরা তার বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান। ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এনসিপির কোনো কর্মসূচি হতে দেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
এর মধ্যে শনিবার (২৯ আগস্ট) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া পোস্টে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হওয়ায় তিনি দুঃখিত।
তিনি লিখেছেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাবদিহি চেয়ে সংসদে যে বক্তব্য দিয়েছিলাম, তাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের সঙ্গে ভুল-বোঝাবুঝি সৃষ্টি হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করছি।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও লেখেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান-বাজনা, সিনেমা অনেকটা নিষিদ্ধের মতোই। এই বক্তব্যের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার দায় আসলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। সেখানকার আলেম–ওলামাদের ওপর দিয়েছেন। তাদের ভাবমূর্তি বিশ্বের সামনে ক্ষুণ্ন করেছেন।’
হাসনাত দাবি করেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কনসার্ট বন্ধ হওয়ার ঘটনাটি গণমাধ্যমে যেভাবে উপস্থাপিত হয়েছিল, বাস্তবতা তার থেকে ভিন্ন।
তিনি লেখেন, গভীর রাতে উচ্চ শব্দের কারণে মাদ্রাসার পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছিল। শিক্ষার্থীরা শব্দ কমাতে বলার পর পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয় এবং পরবর্তী সময়ে কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন বলে তার দাবি।
হাসনাত লিখেছেন, ‘মিডিয়া ভিন্নভাবে উপস্থাপন করলেও ঘটনাপ্রবাহ থেকে এটা স্পষ্ট, মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা কনসার্ট বন্ধ করে দেয়নি। তারা শুধু শব্দ কমাতে বলেছিলেন। এর মানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাংস্কৃতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ নয়, যেমনটা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন। যার মাধ্যমে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ সম্পর্কে ভুল বার্তা দিয়েছিলেন, তাদেরকে ছোট করেছিলেন।’
নৌকাবাইচের বিষয়টি নিয়ে নিজের তথ্যগত ভুলও স্বীকার করেন তিনি। হাসনাত লেখেন, ‘অন্যদিকে নৌকাবাইচের বিষয়টিতে স্থান নিয়ে আমার তথ্যগত ত্রুটি হয়েছে। সিলেটের জায়গায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া বলে ফেলি। এই ত্রুটিতে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল–বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়েছে, তাতে আমি বিব্রত। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি।’
নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে হাসনাত বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলন একটি সর্বজনীন সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছে, যেখানে সবার অধিকার নিশ্চিত হবে।
তিনি লেখেন, ‘জুলাই একটা সর্বজনীন সমাজের স্বপ্ন দেখায়, যেখানে সকল মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা হবে, এবং কেউ কারও মত বা দৃষ্টিভঙ্গি আরেকজনের ওপর চাপিয়ে দেবে না। বিতর্ক থাকবে, দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য থাকবে, কিন্তু কেউ কাউকে জোর করবে না তার মতামতকেই একমাত্র গ্রহণযোগ্য মতামত হিসেবে গ্রহণ করতে। জুলাই এই কমন মিনিমাম গ্রাউন্ডের ঐক্যের প্রতীক। এই আদর্শের প্রতি আমি কমিটেড ছিলাম, আছি, থাকব।’
তিনি আরও বলেন, সরকারের দায়িত্ব হলো কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন অন্যের ওপর জোর করে নিজেদের মত চাপিয়ে দিতে না পারে, তা নিশ্চিত করা।
হাসনাতের ভাষায়, ‘এই বাংলাদেশ সবার, যেখানে মসজিদ থাকবে, মন্দির থাকবে, সঙ্গীত থাকবে, ওয়াজ থাকবে, মাজার থাকবে, কনসার্ট হবে, মাহফিল হবে, রথযাত্রা হবে, সিনেমা উৎসব হবে, আবার বিজ্ঞ আলেমদের আলোচনাও হবে। সব ধর্মের, মতের মিলনস্থল এই বাংলাদেশ। যার যেটা পছন্দ হবে, সে সেটায় যাবে, অংশ নেবে, যার যেটা পছন্দ হবে না, সে সেটায় যাবে না। আর সরকার এইটুকু নিশ্চিত করবে, কেউ যেন আরেকজনের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়, এমন কিছু করতে না পারে।’
হাসনাত আরও লিখেছেন, ‘আজকে সরকার সেই নিরাপত্তা দিতে পারছে না এবং তার ফলে সমতার বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে ক্ষতি হচ্ছে।’
এদিকে সংসদে দেওয়া বক্তব্যের ব্যাখ্যায় হাসনাত জানান, মূল ঘটনা এবং গণমাধ্যমে সেটি কীভাবে উপস্থাপিত হয়েছে—তা নিয়ে সংসদে বিস্তারিত কথা বলা উচিত ছিল। তবে সম্পূরক প্রশ্নের সময় সীমিত থাকায় বিস্তারিত বলার সুযোগ পাননি বলে দাবি করেন তিনি।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাসনাত আব্দুল্লাহর দুঃখ প্রকাশের পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছে কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ।
শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুরে গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানান কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের সভাপতি আব্দুল খালেক।

-6a92cd856afcd.jpg)