Logo
Logo
×
   

Advertisement

জাতীয়

মায়ের মৃত্যুর পর পেনশনের টাকা পেতে ঘুস দাবি, ক্ষোভে দু’ঘণ্টায় ঘুস.সাইট তৈরি শাহেদের

Advertisement

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৩:০৭ পিএম

মায়ের মৃত্যুর পর পেনশনের টাকা পেতে ঘুস দাবি, ক্ষোভে দু’ঘণ্টায় ঘুস.সাইট তৈরি শাহেদের

ঘুস.সাইট-এর উদ্যোক্তা শাহেদ শরীফ আহমেদে। ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

মায়ের মৃত্যুর পর সরকারি পেনশনের টাকা তুলতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের বারবার ঘুসের দাবির মুখে পড়তে হয়েছিল। নিজের পাসপোর্ট করতেও একই ধরনের অভিজ্ঞতা হয় ১৭ বছর বয়সি শাহেদ শরীফ আহমেদের। সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ঘুসের এমন অভিজ্ঞতা থেকেই প্রতিবাদী উদ্যোগ নেয় সে। তৈরি করে ‘ঘুস.সাইট’ (ghush.site) নামের একটি ওয়েবসাইট, যেখানে ভুক্তভোগীরা ঘুস দাবির অভিযোগ জানাতে পারছেন।

ওয়েবসাইটটি চালুর মাত্র নয় দিনের মধ্যে রোববার বিকাল ৪টা পর্যন্ত ৯ হাজার ৬৬৫টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগে ঘুস হিসেবে দাবি করা অর্থের মোট পরিমাণ ৩২১ থেকে ৩৩২ কোটি টাকা বলে ওয়েবসাইটের তথ্য থেকে জানা গেছে।

শাহেদ শরীফ আহমেদ ময়মনসিংহ ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় বাবার সঙ্গে থাকে। ব্রিটিশ কাউন্সিলের অধীন কেমব্রিজ ইন্টারন্যাশনালের এ-লেভেলে পড়াশোনা করছে সে। তার বাবা শরীফুল ইসলাম (শামীম) আগে সৌদি আরবের একটি ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন।

শাহেদের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার পূর্বপাড়া এলাকায়। তার মা আমিনা খাতুন ময়মনসিংহ সদরের আজমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ২০২২ সালের ১৬ ডিসেম্বর শারীরিক অসুস্থতায় তিনি মারা যান।

পরিবারের অভিযোগ, চাকরির ১৩ বছরের মাথায় আমিনা খাতুনের মৃত্যুর পর তার ভবিষ্য তহবিলের প্রায় ৭ লাখ টাকা তুলতে গিয়ে ট্রেজারি অফিসে ১০ হাজার, জেলা শিক্ষা অফিসে ২০ হাজার এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ৮ হাজার টাকাসহ মোট ৩৮ হাজার টাকা ঘুস দিতে হয়েছে।

এ ছাড়া কল্যাণ তহবিলের ২ লাখ টাকা এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্য ৮ লাখ টাকা পেতে শিক্ষা কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ১ লাখ টাকা ঘুস দাবি করেছেন বলেও অভিযোগ পরিবারের। টাকা না দিলে ফাইল এগোবে না বলে জানানো হয়েছিল বলে দাবি তাদের।

নিজের ও পরিবারের অভিজ্ঞতা থেকেই ওয়েবসাইটটি তৈরির উদ্যোগ নেন শাহেদ। গণমাধ্যমে তিনি বলেন, ‘আম্মুর পেনশনের টাকার ফাইল আটকে রেখে লাখ টাকা ঘুস চাওয়া হচ্ছিল। এ ছাড়া দেড় বছর আগে ও-লেভেল পরীক্ষার জন্য পাসপোর্ট করতে গেলে ফাইল আটকে রেখে ১ হাজার ৫০০ টাকা ঘুস নেওয়ার পর তিন ঘণ্টার মধ্যে কাজ করে দেওয়া হয়। এই ক্ষোভ থেকেই ওয়েবসাইটটি বানাই।’

ভারতে প্রচলিত একটি ওয়েবসাইট দেখে এ উদ্যোগের অনুপ্রেরণা পেয়েছিল শাহেদ। মাত্র দুই ঘণ্টায় কোডিং করে ওয়েবসাইটটির কাঠামো তৈরি করে সে। পড়াশোনার পাশাপাশি অনলাইনে ওয়েবসাইট উন্নয়নের কাজও শিখেছে শাহেদ।

পরে বন্ধু ও সহপ্রতিষ্ঠাতা সাইফ কবিরের সহযোগিতায় ডোমেইন কেনা হয় এবং ওয়েবসাইটটি চালু করা হয়। ২১ আগস্ট চালুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ‘ঘুস.সাইট’। পুরো উদ্যোগ বাস্তবায়নে তাদের প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।

ওয়েবসাইটটির দুই প্রতিষ্ঠাতা শাহেদ শরীফ আহমেদ ও সাইফ কবির। শাহেদ ওয়েবসাইটের কোডিং ও কারিগরি দিক দেখছে। অন্যদিকে সাইফ বিপণন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের বিষয়টি সামলাচ্ছে। অভিযোগ যাচাই ও স্ক্রিনিংয়ের জন্য চার সদস্যের একটি মডারেশন টিম রয়েছে বলেও জানান শাহেদ।

ওয়েবসাইট চালুর পর কোনো হুমকি বা নিরাপত্তাজনিত আশঙ্কা তৈরি হয়েছে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে শাহেদ বলে, ‘এখন পর্যন্ত আলহামদুলিল্লাহ, কোনো হুমকি বা নেতিবাচক ফোন পাইনি। শুরুতে এতটা ভাইরাল হবে, তা ভাবিনি। ভেবেছিলাম, সিভিতে যুক্ত করব। তবে ভবিষ্যতে কোনো আশঙ্কা তৈরি হতেও পারে।’

আইনি ঝুঁকি এড়াতে বর্তমানে ভুক্তভোগীদের নাম-পরিচয় বা নির্দিষ্ট অভিযুক্ত ব্যক্তির তথ্য ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হচ্ছে না। ভবিষ্যতে আইনি টিম গঠন কিংবা সরকারি সমর্থন পাওয়া গেলে পূর্ণাঙ্গ তথ্য ড্যাশবোর্ডে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান শাহেদ।

নিজেদের উদ্যোগের লক্ষ্য সম্পর্কে শাহেদ শরীফ আহমেদ বলে, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল স্বচ্ছতা তৈরি করা। সরকারের টাকাগুলো কোথায় যাচ্ছে এবং কোথায় অপচয় হচ্ছে, তা সবাইকে জানানো। সরকারি অফিসে ঘুস নেওয়া অত্যন্ত অন্যায় ও গর্হিত কাজ। আমরা বিষয়গুলো সবার সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে চাই, যেন মানুষ জানতে পারে বাংলাদেশে কীভাবে এসব অনিয়ম ঘটছে।’

সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে ঘুসের মাত্রা শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য জানিয়ে সে আরও বলে, ‘সরকার যদি এই তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে ব্যবস্থা নেয়, তাহলে তা শুধু আমাদের উদ্যোগের সফলতা নয়, দেশের জন্যও বড় সুফল বয়ে আনবে। আমার মূল লক্ষ্য কোনো নীতিগত শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, আমি সোজা কথায় ঘুসের মাত্রা শূন্যে নামিয়ে আনতে চাই। যেন কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানে কারও ঘুস নেওয়ার সুযোগ না থাকে এবং সাধারণ মানুষ কোনো অন্যায় বাধা ছাড়াই তাঁদের প্রাপ্য সেবা পেতে পারেন।’

তরুণদের এ উদ্যোগ পুলিশেরও নজরে এসেছে। ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, কোনো অনিয়ম বা ঘুসের তথ্য পাওয়া গেলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো আশঙ্কা তৈরি হলে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে সহায়তা ও প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেবে।

সচেতন নাগরিক কমিটি, ময়মনসিংহ জেলা শাখার সহসভাপতি শরীফুজ্জামান বলেন, দেশের দুর্নীতির অন্যতম প্রধান উৎস ঘুস। এটি দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করার পাশাপাশি অনেক মানুষকে তাদের মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত করছে। ‘ঘুস.সাইট’-এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকা ঘুসের চিত্র সামনে আসছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তার মতে, সরকার নিজ উদ্যোগে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর এ ধরনের স্বচ্ছতা তৈরির ব্যবস্থা করলে সাধারণ মানুষ ব্যাপকভাবে উপকৃত হবে।

শাহেদের বাবা শরীফুল ইসলাম বলেন, স্ত্রীর মৃত্যুর পর সরকারি পাওনা টাকা তুলতে গিয়ে তাকে ঘুসের মুখোমুখি হতে হয়েছে। অনেকটা বাধ্য হয়েই ঘুস দিয়ে প্রায় ৭ লাখ টাকা তুলেছেন বলে দাবি করেন তিনি। তবে বাকি ১০ লাখ টাকা পেতে ১ লাখ টাকা ঘুস চাওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ তার। কমপক্ষে ৮০ হাজার টাকা ঘুস দিতে হবে বলেও জানানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘কাগজপত্র নিয়ে শিক্ষা অফিসে দৌড়ঝাঁপ করেও কাজ হচ্ছে না। উপজেলা শিক্ষা অফিসের অফিস সহকারী মজিবুর রহমান জানিয়েছেন, উপজেলা ও জেলা শিক্ষা অফিস মিলে ১ লাখ টাকা না হলে কাজ হবে না। আমি জেদ ধরেছি, ঘুস না দিয়ে পাওনা টাকা তুলব। দেশের স্বার্থে ছেলে যে উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে আমার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।’

শিক্ষক আমিনা খাতুনের পেনশনের টাকা পাওয়া গেলেও কল্যাণ তহবিল ও চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যুর কারণে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্য মোট ১০ লাখ টাকা কেন পাওয়া যাচ্ছে না, তা জানতে রোববার বিকেলে সদর উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ে যাওয়া হয়। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মীরা শিক্ষকের ফাইল খুঁজে পাননি।

উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. মজিবুর রহমান ঘুস চাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘কেউ আমার কাছে এলে সর্বাত্মক সহযোগিতা করি। আমার কাছে কাগজ নিয়ে এলে দ্রুত স্বাক্ষর করিয়ে দিয়ে দিই।’

এ বিষয়ে সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীন গণমাধ্যমে বলেন, ঘুস দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাকে কিছু জানাননি। এমন কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি। একই সঙ্গে মৃত শিক্ষকের সব বকেয়া দ্রুত পরিশোধের আশ্বাস দেন।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম