জন এফ ড্যানিলোউইচ
অর্থবহ আলোচ্যসূচি ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর ভারতে যাওয়া ঠিক হবে না
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:২৩ পিএম
সাংবাদিক কনক সরওয়ার ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক এবং দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক জন এফ ড্যানিলোউইচ। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক এবং দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক জন এফ. ড্যানিলোউইচ। তিনি বাংলাদেশে মার্কিন দূতাবাসের ডেপুটি চিফ অব মিশন (ডিএমসি) বা উপ-রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বলেছেন, সুনির্দিষ্ট ও অর্থবহ আলোচ্যসূচি ছাড়া বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরে যাওয়া ঠিক হবে না। সম্প্রতি সাংবাদিক কনক সরওয়ারের এক টক শোতে অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে কনক সরওয়ারের প্রশ্নের জবাবে জন এফ ড্যানিলোউইচ বলেন, আমি প্রথমেই বলব, বাংলাদেশ ও তার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি মৌলিকভাবে আশাবাদী। গত এক মাসের মতো সময়ে কয়েকটি স্মরণ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সম্মান আমার হয়েছে। সেখানে ‘দীর্ঘ জুলাই’, জুলাই বিপ্লব এবং হাসিনা সরকারের পতনে ভূমিকা রাখা মানুষদের আত্মত্যাগ স্মরণ করা হয়েছে। তাই ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আগে বাংলাদেশ কোথায় ছিল, সেটি স্মরণ করেই আমাকে শুরু করতে হবে।
জন এফ ড্যানিলোউইচ বলেন, স্বীকার করছি, আরও অনেকের মতো ২০২৪ সালের আগস্টে আমিও হয়তো কিছুটা অযৌক্তিক রকমের উচ্ছ্বসিত ছিলাম। তখন বাংলাদেশে অনেক মৌলিক পরিবর্তন আসবে বলে কল্পনা করেছিলাম। যারা মনে করেছিলেন এটি একটি নতুন বাংলাদেশ, একটি ‘বাংলাদেশ ২.০’ গড়ার সুযোগ—আমিও তাদের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একমত ছিলাম। ওই আন্দোলনের মধ্যে বৈপ্লবিক সম্ভাবনা ছিল বলে আমিও মনে করতাম, যদিও শেষ পর্যন্ত সেই আশার কিছু অংশ বাস্তবায়িত হয়নি।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ১৮ মাস ক্ষমতায় ছিল। আমার মতে, স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, জবাবদিহিতার প্রক্রিয়া শুরু করা, মৌলিক সংস্কারের সূচনা করা এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচন আয়োজনের উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি বাস্তবায়নে তারা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে। তারা যা অর্জন করতে পেরেছে, তার জন্য আমি তাদের কৃতিত্ব দিই। আমি চাইতাম তারা আরও বেশি কিছু করতে পারত, তবে তারা যে সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করেছে, সেটিও বুঝি। এরপর ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হলো। আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, বাংলাদেশের মানুষ আবার তাদের নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। নির্বাচন নিখুঁত ছিল না—কোনো নির্বাচনই নিখুঁত নয়। তবে আমি যা দেখেছি ও শুনেছি, তার ভিত্তিতে বিশ্বাস করি নির্বাচনের ফল জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়েছে এবং বিএনপি সরকার একটি জনম্যান্ডেট পেয়েছে। এখন সেই ম্যান্ডেট নিয়ে তাদের দেশ পরিচালনার সুযোগ এসেছে। বিএনপি ২০ বছর ক্ষমতার বাইরে ছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে ছিলেন। ফলে নতুন সরকারের কিছু প্রাথমিক সমস্যা ও মানিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ থাকাই স্বাভাবিক। আগে সরকারে ছিলেন এমন কারো কারো সেরা সময় পেছনে পড়ে গেছে। অনেক দিক থেকেই সম্পূর্ণ নতুন একটি দল দায়িত্ব নিয়েছে। আমার মতে, তারা খুব কঠিন পরিস্থিতি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে— শুধু হাসিনা আমলের দীর্ঘ অপশাসনের উত্তরাধিকার নয়; তারা এমন সময় ক্ষমতায় এসেছে, যখন ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রস্তুতি চলছিল এবং তার ফলে জ্বালানির দাম, মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক দুর্ভোগের প্রভাব দেখা দিচ্ছিল।
জন এফ ড্যানিলোউইচ বলেন, এসব কঠিন চ্যালেঞ্জ, প্রস্তুতির ঘাটতি ও অনভিজ্ঞতা বিবেচনায় আমার মতে তারা যুক্তিসঙ্গত কাজ করেছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপও আমার এ ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ যে এখনও অনেক কাজ বাকি। সংস্কারে আরও অগ্রগতি দেখতে চেয়েছিলাম। বাংলাদেশের মানুষ যেভাবে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন চেয়েছিল, সেটিও আরও এগিয়ে যাক— আমি তা চাই।
বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমি সন্দেহের সুবিধা দিতে চাই এবং যথেষ্ট কৃতিত্বও দিই। তার কথা ও কাজে আমার মনে হয়েছে, তিনি ভিন্নভাবে কাজ করতে চান। তবে তাকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক— দুই ক্ষেত্রেই বহু বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
সরকারের উপর ভারতের চাপ ও ভারতে শেখ হাসিনা অবস্থান প্রসঙ্গে জন এফ ড্যানিলোউইচ বলেন, গত কয়েক বছরে আমি এ নিয়ে অনেক লিখেছি ও বলেছি। ঢাকায় দায়িত্ব পালনের আগের সময়টির কথাও মনে পড়ে। ভারতীয় কূটনীতিকদের সঙ্গে বহু আলোচনায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের স্বার্থ কোথায় মিলে যেতে পারে, সেই অভিন্ন ক্ষেত্র খোঁজার চেষ্টা করেছি। তখনও দেখেছি, ভারতের নীতি আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে অতিমাত্রায় কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। ভারতীয় সহকর্মীদের বলতাম, বাংলাদেশের প্রতি তাদের আরও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি নেওয়া দরকার। কিন্তু কেবল তাদেরই জানা কারণে তারা শেখ হাসিনার পেছনে সব সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। শেষ সময় পর্যন্ত সেটি চলেছে, যখন স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে তার সমর্থন কমছে। সত্যি বলতে, ভারত এর মূল্য দিয়েছে। মানুষ হাসিনা সরকারকে সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা মনে রেখেছে। শেষ দিকে ভারত কার্যত একমাত্র দেশ ছিল, যে হাসিনাকে সমর্থন দিয়েছিল; পরে তাকে আশ্রয়ও দিয়েছে। শুধু হাসিনা নন, তার অন্য ঘনিষ্ঠজন ও সহপলাতকেরাও ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের আশ্রয় দেওয়া এক বিষয়; কিন্তু বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও ভারত কেন এই নীতি চালিয়ে গেল, তা বোঝা আমার পক্ষে কঠিন। অধ্যাপক ইউনূস ও অন্যরা ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করে সম্পর্ক নতুনভাবে শুরু করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তা প্রত্যাখ্যাত হয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রী মোদি অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে দেখা করতে অস্বীকৃতি জানান। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যোগাযোগের চেষ্টাগুলোও বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে এক প্রশ্নে মার্কিন এই কূটনীতিক বলেন, ভারত একপর্যায়ে নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেয়। শেষ দিকে তাদের পছন্দ ছিল বিএনপি ক্ষমতায় আসুক—এটি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল বলে আমার মনে হয়। নির্বাচনের পর সব লক্ষণই বলছিল, ভারত বিএনপি সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী এবং নিজেদের স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার জন্য বিএনপি সরকারকেই সবচেয়ে ভালো সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে। উভয় দিক থেকে উচ্চপর্যায়ের সফর হয়েছিল এবং সম্পর্ক নতুনভাবে শুরুর পথে সবকিছু এগোচ্ছিল। তারপর, আমার কাছে ব্যাখ্যাতীতভাবে, ৫ আগস্ট ভারতীয় প্রতিষ্ঠান শেখ হাসিনা ও তার দলকে ভারতে সংবাদ সম্মেলন করার অনুমতি দিল— ঠিক সেই সময়, যখন বাংলাদেশ ২০২৪ সালের গ্রীষ্মের নিহতদের আত্মত্যাগ স্মরণ ও শোক করছিল। অন্তত এটুকু বলা যায়, এটি ছিল সংবেদনশীলতাহীন; এবং নিশ্চয়ই বাংলাদেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার একটি চেষ্টা। বাংলাদেশ সরকার সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেছিল। তারপরও অনুষ্ঠানটি হতে দেওয়া হলো এবং শেখ হাসিনা এতে অংশ নিলেন। এখন তারা এর পরিণতি মোকাবিলা করছে।
জন এফ ড্যানিলোউইচ বলেন, আমি বারবার বলেছি, আমার কাছে বিস্ময়কর হলো—ভারত বাংলাদেশে নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধেই কাজ করে যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন বিজেপি ও তার সহযোগী আরএসএস থেকে শুরু করে গণমাধ্যমে সক্রিয় সাবেক কর্মকর্তা এবং অনলাইনে সক্রিয় ব্যক্তিদের নিয়ে এমন এক ইকোসিস্টেম তৈরি হয়েছে, যারা বাংলাদেশ সম্পর্কে ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ায়। এর বাস্তব প্রভাব রয়েছে।
সাম্প্রতিক একটি জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২৫ শতাংশ ভারতীয়ের বাংলাদেশ সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে। এটি বিস্ময়কর নয়, কারণ একজন সাধারণ ভারতীয় বাংলাদেশে কী ঘটছে সে সম্পর্কে প্রচুর মিথ্যা তথ্যই দেখেন। দুই দেশের মধ্যে সত্যিকারের সম্পর্কোন্নয়ন ঘটাতে সরকারগুলোকে নিজেদের জনগণের কাছে সত্য বলা শুরু করতে হবে। ভুল ধারণা ভাঙার জন্য আরও সরাসরি মানুষে-মানুষে যোগাযোগ দরকার। যেমন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের গণহত্যা চলছে বা বাংলাদেশ পরবর্তী আফগানিস্তান হতে যাচ্ছে— এ দুটি ধারণাই ভুল। বাংলাদেশকে যারা জানেন, তারা জানেন কোনোটিই সত্য নয়। তারপরও সীমান্তের ওপারে এসব প্রচার চলতে থাকে এবং দুই দেশের সম্পর্কের পরিবেশ বিষাক্ত করে।
তিনি বলেন, আমি বহু সাবেক ভারতীয় কর্মকর্তা, সাবেক হাইকমিশনার, সাবেক জেনারেল ও রাজনীতিককে ভারতীয় টেলিভিশনে বাংলাদেশ সম্পর্কে মিথ্যা বলতে বা প্রমাণযোগ্যভাবে অসত্য বক্তব্য দিতে দেখি। দুটি সম্ভাবনা আছে: তারা মিথ্যা বলছেন— যা খারাপ; অথবা সম্ভবত আরও খারাপ হলো, কী ঘটছে সে সম্পর্কে তারা এতটাই অজ্ঞ। ভারতীয় অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেও তারা এমন করতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে রাজ্য নির্বাচন ছিল এবং বিজেপি অবশ্যই সেই নির্বাচনি প্রচারে বাংলাদেশবিরোধী, মুসলিমবিরোধী ও অভিবাসনবিরোধী তাস খেলেছে। দায়িত্বজ্ঞানহীন গণমাধ্যমও সম্ভবত শুধু দর্শক টানতে চাইছে। তারা যত বেশি চাঞ্চল্য সৃষ্টি করবে, তত বেশি দর্শক পেতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব সত্যকে প্রতিনিধিত্ব করে না।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে ভারত কেন শুরুতেই তাকে সফরে চাইবে, তা আমি বুঝতে পারি। কূটনীতিতে এটি স্বাভাবিক। অধিকাংশ দেশ অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে উচ্চপর্যায়ের সফরকে অনেক গুরুত্ব দেয়। রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের সফর খুব তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু তারেক রহমান ও তার সরকার সচেতনভাবে দেখাতে চেয়েছেন বলে আমার মনে হয় যে তারা আরও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবেন।
বর্তমান সরকারের বাংলাদেশ ফার্স্ট নীতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ ধারণার অর্থ—বাংলাদেশের স্বার্থকে কোনো এক দেশের, বিশেষ করে হাসিনা আমলের অভিজ্ঞতার পর ভারতের, অধীন করা হবে না। তাই প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফর মালয়েশিয়ায় করা বুদ্ধিমান সিদ্ধান্ত ছিল। ওই সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। চীনের সঙ্গে সম্পর্কও স্পষ্টতই গুরুত্বপূর্ণ, তাই সেখানে যাওয়াও যৌক্তিক ছিল। কোনো সুনির্দিষ্ট ও অর্থবহ আলোচ্যসূচি ছাড়া শুরুতেই ভারত গেলে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতো। কয়েকটি জটিল দ্বিপক্ষীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করে সমাধানের পথ বের করা দরকার। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সফরের সময় ভারতীয় পক্ষকে বলেছেন, বাংলাদেশ সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী, তবে ধীর ও স্থিরভাবে এগোতে চায়।
‘তারেক রহমানকে তাড়াতাড়ি ভারত সফরে চাপ দিয়ে তারা তাকে দেশের ভেতরে রাজনৈতিক চাপের মধ্যে ফেলছিল। ৫ আগস্টের সংবাদ সম্মেলনের পর সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করা প্রধানমন্ত্রীর জন্য রাজনৈতিকভাবে অসম্ভব হয়ে পড়ে বলে আমার মনে হয়। অন্য উসকানিও ছিল। প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা ভারত সফরের চেষ্টা করে বিমানবন্দরে সমস্যায় পড়েছিলেন এবং তাকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। আরও কিছু সমস্যা চলমান।’
তিনি বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন খুব শিগগির নিউইয়র্কে হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি ও প্রধানমন্ত্রী তারেক একদিনের ব্যবধানে ভাষণ দেবেন। অর্থাৎ দুজন একই সময়ে নিউইয়র্কে থাকবেন। দুই পক্ষই যদি দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠককে গুরুত্ব দেয়, তবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ফাঁকে নিউইয়র্কে সমমর্যাদায় তারা কেন বৈঠক করবেন না? তারেক রহমানকে মোদির সঙ্গে দেখা করতে ভারতেই যেতে হবে, বা উলটোটা হবে— এমন তো নয়।
তিনি আরও বলেন, নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী অন্য বহু বিশ্বনেতার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাবেন। আগামী সপ্তাহ ও মাসগুলোতে নিশ্চয়ই আরও বিদেশ সফর করবেন। শেষ পর্যন্ত ভারতেও যাবেন বলে আমার বিশ্বাস, কিন্তু তাড়াহুড়োর প্রয়োজন নেই। শেষ কথা হলো, নতুন সরকার গঠন ও গুরুতর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলার মতো চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী দেশের ভেতরে থেকে এসব সমস্যা সামলাতে চাইবেন— এটি বোধগম্য। সরকারি ব্যয়ে কিছুটা কৃচ্ছ্রসাধনের সময় তিনি বিদেশ সফরে অনেক সময় ও অর্থ ব্যয় করছেন— এমন ভাবমূর্তি এড়িয়ে যেখানে সবচেয়ে বেশি কাজ বাকি, সেখানেই মনোযোগ দিতে চাইতে পারেন।
আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে মার্কিন এই কূটনীতিক বলেন, আমার মতে এটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শুধু শেখ হাসিনা নন; যেমন বলেছি, আওয়ামী লীগের আরও বহু সাবেক নেতা বা জ্যেষ্ঠ নেতা সেখানে রয়েছেন, যারা নিজেরাও পলাতক। আপনি শরিফ ওসমান হাদির কথিত হত্যাকারীদের কথা বলেছেন। তবে ভারতে আরও অনেকে আছেন, যাদের ভারতে থাকার কথা আমরা জানি এবং যারা গুরুতর অভিযোগের মুখোমুখি। কেউ এসব অভিযোগে দণ্ডিত, কারো বিচার চলছে। তাই বাংলাদেশ কেন এটিকে উচ্চ অগ্রাধিকার দেবে, তা সম্পূর্ণ বোধগম্য। আমি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হলে এটিকে উচ্চ অগ্রাধিকার দিতাম। কয়েকটি কারণে ন্যায়বিচার গুরুত্বপূর্ণ। ভুক্তভোগীদের সম্মান জানাতে জবাবদিহির প্রক্রিয়া শুরু করা দরকার। ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে এবং তারও আগে যে ধরনের অপরাধ হয়েছে, তা আর ঘটতে দেওয়া হবে না— এই বার্তা দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। এরপর আছে ওই ব্যক্তিদের বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার চলমান চেষ্টা।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে ড্যানিলোউইচ বলেন, আপনি জানেন, বহু বছর ধরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলা হয়েছে— সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো প্রতি বিদ্বেষ নয়। স্নায়ুযুদ্ধের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের দ্বিমেরু সংঘাতের সময় শেখ মুজিব এ কথা বলেছিলেন। সে সময় জোটনিরপেক্ষ থাকার কিছু যুক্তি হয়তো ছিল এবং বাংলাদেশ নিজেকে সেই শিবিরে রাখার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বিশ্ব, দক্ষিণ এশিয়া এবং বাংলাদেশ বদলে গেছে। আমরা এখন বহুমেরু বিশ্বে প্রবেশ করছি। আগের ধরনের পরাশক্তির দ্বন্দ্ব নেই; একমেরু বিশ্বও নেই। এখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা এবং অন্য জোটগুলোর মাধ্যমে চিহ্নিত উদীয়মান বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতা রয়েছে। একই সঙ্গে বহু মধ্যম শক্তি নিজেদের মতো করে নতুন বিশ্বে অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছে।
মক্কা চুক্তি নিয়ে ভারতের উদ্বেগ্ন নিয়ে ড্যানিলোউইচ বলেন, ভারতীয় নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের কিছু অংশ কয়েক দশক পেছনে তাকায়—১৯৭১ সালের আগের পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাতগুলোর দিকে। সম্ভাব্য দুই-মুখী যুদ্ধের যে সংকট বা চ্যালেঞ্জ তারা মোকাবিলা করেছিল, সেটিও তারা দেখে। ১৯৭১ সালের পর ভারতীয় নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান মনে করেছিল, পূর্ব দিক নিয়ে আর চিন্তা করতে হবে না। স্পষ্টতই চীন ও পাকিস্তানকে ঘিরে তাদের নিরাপত্তা উদ্বেগ রয়েছে। কিন্তু অতীতে বা সাম্প্রতিক অতীতে ভারত মনে করত, পূর্ব সীমান্তে কী ঘটছে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে হবে না। সম্ভাব্যভাবে সেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটায়— এমন যেকোনো কিছু তাদের উদ্বেগের কারণ হবে। কিন্তু আবারও বলব, তারা এখানে বৃহত্তর চিত্রটি ধরতে পারছে না। মক্কা চুক্তিকে একটি প্রতিরক্ষামূলক জোট হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য সদস্যদের সম্মিলিত নিরাপত্তা দেওয়া ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এগিয়ে নেওয়া। জাতিসংঘ সনদেও এসব নীতি রয়েছে, যা প্রতিটি দেশকে ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত আত্মরক্ষার অধিকার দেয়। মক্কা চুক্তি যদি কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে গড়া আক্রমণাত্মক সামরিক ব্যবস্থা না হয় এবং মূলত প্রতিরক্ষামূলক থাকে, তবে ভারতের উদ্বিগ্ন হওয়ার কী আছে, তা আমি জানি না।
