আ.লীগঘেঁষা চিকিৎসক এবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৩৮ পিএম
ডা. কিশালয় সাহা। সংগৃহীত ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আওয়ামী লীগঘেঁষা হিসেবে পরিচিত চিকিৎসক ডা. কিশালয় সাহাকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয়েছে। গত ১ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
কুয়াকাটার ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা থেকে তাকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাখালী কার্যালয়ে সহকারী পরিচালক (চলতি দায়িত্ব), শ্রেণি-১ পদে বদলি ও পদায়ন করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দাপটের সঙ্গে চলাফেরা এবং দলটির নেতাকর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ থাকা এই চিকিৎসককে এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়ায় স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বিস্ময় দেখা দিয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উপসচিব সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারের কর্মকর্তা ডা. কিশালয় সাহাকে বর্তমান কর্মস্থল থেকে বদলি করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, মহাখালী, ঢাকায় সহকারী পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) পদে পদায়ন করা হয়েছে। তার বিসিএস পরিচিতি নম্বর ১০১১৮১১৫।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, আগামী ৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তাকে নতুন কর্মস্থলে যোগদান করতে হবে। অন্যথায় ৭ সেপ্টেম্বর থেকে বর্তমান কর্মস্থল থেকে তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত (স্ট্যান্ড রিলিজ) বলে গণ্য হবেন।
ডা. কিশালয় সাহা আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে দাপটের সঙ্গে চলাফেরা করতেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বিভিন্ন সময়ের কর্মকাণ্ড ও ছবিতেও আওয়ামী লীগঘেঁষা অবস্থানের চিত্র পাওয়া যায়।
তার ফেসবুক প্রোফাইলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেছে। সম্প্রতি তার পদায়নের পর ওই ছবিগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
এছাড়া ডা. কিশালয় সাহার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারেক রহমানকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য ও বক্তব্য দিয়েছিলেন তিনি। এ সংক্রান্ত তথ্য-প্রমাণও রয়েছে।
ডা. কিশালয় সাহার কর্মজীবনের আরেক পর্যায় নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চাকরির সময় তিনি তৎকালীন এমপি, পরবর্তীতে বিমান প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মাহবুব আলীর আস্থাভাজন হিসেবে প্রভাব বিস্তার করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ওই সময়ে ক্ষমতাসীনদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে এলাকায় দাপট দেখাতেন তিনি। নিয়মিত মাদক সেবন করতেন চেম্বারে বসে। এতে বাধা দেওয়ায় তৎকালীন স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয় বলে অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডে তৎকালীন এমপির প্রভাব ব্যবহার করা হয়েছিল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাখালী কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) পদটি প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অধিদপ্তরের বিভিন্ন শাখার কার্যক্রম, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত নানা বিষয়ে এ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালন করতে হয়।
সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দলীয় ঘনিষ্ঠতা ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে এমন একজন কর্মকর্তাকে কীভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সদর দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়া হলো।
তাদের মতে, সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মকর্তাদের পদায়নের ক্ষেত্রে অতীত ভূমিকা, রাজনৈতিক প্রভাব ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
অভিযোগ রয়েছে, কুয়াকাটার ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা থেকে সরাসরি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সদর দপ্তরে সহকারী পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) পদে পদায়নের পেছনে একটি স্বার্থান্বেষী মহল কাজ করেছে। তাদের সহযোগিতা ছাড়া এমন পদায়ন সম্ভব নয় বলেও সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ দাবি করেছেন।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত কোনো কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হলে সরকারের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত এমন পদে দায়িত্ব দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অতীত ভূমিকা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, একদিকে আওয়ামী লীগ আমলে দাপট দেখানোর অভিযোগ, অন্যদিকে বিএনপি নেতাকর্মীদের হয়রানির অভিযোগ থাকার পরও ডা. কিশালয় সাহাকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন কীভাবে হলো, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যুগ্ম সচিব সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘মাননীয় প্রতিমন্ত্রী মহোদয় এ বিষয়ে অনুরোধ করেছিলেন। তবে মাননীয় মন্ত্রী (স্বাস্থ্যমন্ত্রী) গতকাল চলে গেছেন। তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন, তিনি এসে বিষয়টি বাতিল করবেন। আপাতত এ বিষয়ে কোনো কার্যক্রম নেওয়া হবে না। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক যেখানে আছেন, সেখানেই থাকবেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিষয়টি বাতিল করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী এসে এটি বাতিল করবেন।’
