Logo
Logo
×
   

জাতীয়

অনলাইনে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে নাগরিকের গোপন তথ্য

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৪ পিএম

অনলাইনে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে নাগরিকের গোপন তথ্য

একজন মানুষের পরিচয়, অবস্থান কিংবা ব্যক্তিগত যোগাযোগের তথ্য সবই এখন টাকার বিনিময়ে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে অনলাইনে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও মেসেজিং প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ্যে এসব তথ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। 

অর্থের বিনিময়ে পাওয়া যাচ্ছে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), কল ডিটেলস রেকর্ড (সিডিআর), মোবাইল ফোনের অবস্থান, এসএমএসের তথ্য, টিআইএন, পাসপোর্ট এবং মোবাইল আর্থিক সেবার লেনদেনের বিবরণ।

তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে এমন অন্তত ১০টি সক্রিয় ওয়েবসাইটের সন্ধান মিলেছে, যেগুলোতে বিভিন্ন ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি ফেসবুকেও এ ধরনের বিজ্ঞাপনের ব্যাপক উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এক মাসের অনুসন্ধানে ৬৭৫টি পোস্ট শনাক্ত করা হলেও এর মধ্যে ৬০৫টিতে সরাসরি ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির প্রস্তাব ছিল।

সামান্য টাকাতেই মিলছে এনআইডির তথ্য

ভোটার তালিকা বিক্রির বিষয়ে অনুসন্ধানের সময় গত জুনে একটি ফেসবুক পোস্টের মন্তব্যে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখতে পায় ডিসমিসল্যাব। বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত সাইন কপি শব্দটি ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে প্রতিষ্ঠানটি প্রকাশিত ৬৭৫টি পোস্ট খুঁজে পায়।

এসব বিজ্ঞাপনের সূত্র ধরে ভোটার লিস্ট নামের একটি টেলিগ্রাম গ্রুপের সন্ধান মেলে। সেখানে এনআইডি বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখে ক্রেতা সেজে যোগাযোগ করেন ডিসমিসল্যাবের গবেষকেরা।

একটি মোবাইল নম্বর ও ৫০০ টাকা দেওয়ার পর মাত্র ১৭ মিনিটের মধ্যে ওই নম্বরের গ্রাহকের এনআইডি কার্ডের পিডিএফ পাঠানো হয়। নথিতে থাকা নাম, ছবি ও জন্মতারিখসহ তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে মিলে যায়। এমনকি দুই মাস আগে তার মায়ের নাম সংশোধন করা হলেও এনআইডির কপিতে সেই হালনাগাদ তথ্যও ছিল।

শুধু পরিচয় নয়, নজরে যোগাযোগ এবং চলাফেরাও

ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির পরিধি শুধু এনআইডি বা জন্মনিবন্ধনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একই টেলিগ্রাম গ্রুপে হেল্প বিডি নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন, মোবাইলের অবস্থান, সিডিআর, এসএমএসের তালিকা, আইএমইআই, টিআইএন, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, পাসপোর্ট এবং ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছিল।

ডিসমিসল্যাবের গবেষকেরা ২৫ জুন ওই অ্যাকাউন্টের পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। একটি গ্রামীণফোন নম্বরের তিন মাসের কল রেকর্ড চাওয়া হলে ১ হাজার ৫০ টাকা পরিশোধের প্রায় আড়াই ঘণ্টার মধ্যেই ফাইল সরবরাহ করা হয়।

ফাইলটি যাচাই করে দেখা যায়, সেখানে থাকা সাম্প্রতিক ২০টি নম্বর, কলের সময় এবং কলের ধরণ সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের প্রকৃত কল-ইতিহাসের সঙ্গে মিলে গেছে।

আরেকটি ওয়েবসাইটে একইভাবে একটি গ্রামীণফোন নম্বরের অবস্থান জানতে চাওয়া হয়। টাকা পরিশোধের মাত্র ১৬ মিনিটের মধ্যে ওই নম্বরের সর্বশেষ সক্রিয় সময়, মোবাইল টাওয়ারভিত্তিক অবস্থান, একটি ঠিকানা এবং গুগল ম্যাপের লিংক সরবরাহ করা হয়।

একাধিক প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ছে ব্যবসা

ফেসবুক, টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের বিভিন্ন পোস্ট ও গ্রুপ অনুসরণ করে ১০টি সক্রিয় ওয়েবসাইটের তথ্য পেয়েছে ডিসমিসল্যাব। এসব সাইটে ব্যক্তিগত তথ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন সেবার জন্য আলাদা আলাদা মূল্য নির্ধারণ করা রয়েছে। ওয়েবসাইটগুলোর নকশা এবং পরিচালনার ধরনেও উল্লেখযোগ্য মিল দেখা গেছে।

অনুসন্ধানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেওয়া অনেক ব্যক্তি নিজেরা তথ্য সংগ্রহ করেন না। বরং অন্য উৎস থেকে তথ্য কিনে পরে তা বাড়তি দামে বিক্রি করেন। অনুসন্ধানে ডিসমিসল্যাব জানতে পারে, ৮০০ টাকায় একজন মোবাইল গ্রাহকের কল তালিকা সংগ্রহ করে ৯০০ টাকায় বিক্রি করা হয়। 

কয়েক বছর ধরেই চলছে তথ্য বিক্রির প্রবণতা

ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির ঘটনা নতুন নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব তথ্যের অপব্যবহার হলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে সিডিআর থেকে একজন ব্যক্তি কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, কখন করেছেন এবং কতক্ষণ কথা বলেছেন—এসব তথ্য জানা সম্ভব। কলটি করা হয়েছিল নাকি গ্রহণ করা হয়েছিল, সেটিও অনেক ক্ষেত্রে বোঝা যায়।

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, কল রেকর্ড ও অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করলে একজন ব্যক্তির যোগাযোগের নেটওয়ার্ক এবং চলাফেরার একটি চিত্র তৈরি করা যায়। ফলে এসব তথ্য নজরদারি, হয়রানি কিংবা প্রতারণার মতো কাজে ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম