Logo
Logo
×
   

জাতীয়

গণভবন থেকে জুলাই জাদুঘর, এক রক্তাক্ত ইতিহাসের সাক্ষী

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:১৬ পিএম

গণভবন থেকে জুলাই জাদুঘর, এক রক্তাক্ত ইতিহাসের সাক্ষী

জুলাই জাদুঘরে সংরক্ষিত আলোচিত সেই ছবি। ছবি: যুগান্তর

ইতিহাস যেন বারবার ফিরে আসে। দেশ-কাল ভিন্ন হতে পারে, শাসকের নামও বদলে যায়, কিন্তু একটি সত্য বারবারই সামনে আসে—কোনো ক্ষমতাই চিরস্থায়ী নয়। আর প্রকৃতি ও সময় কখনও অন্যায়কে ক্ষমা করে না।

রাশিয়ায় ১৯১৭ সালে সাধারণ জনগণ যেমন মহাপরাক্রমশীল জারদের ঝেঁটিয়ে ক্ষমতা থেকে ছুঁড়ে ফেলেছিল। সেই একই ইতিহাস রচিত হয়েছিল ভিন্ন একটি দেশে ভিন্ন সময়ে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে যাকে ৩৬ জুলাই নামেও ডাকা হয়। ১৭ বছরের শাসন ক্ষমতা ফেলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 

এই জুলাই জাদুঘর সেই ইতিহাসের সাক্ষী বহন করে। 

এটি ছিল শেখ হাসিনার বাসভবন। যা গণভবন নামে পরিচিত ছিল। তা এখন নতুন নাম পেয়েছে—জুলাই জাদুঘর। ভবনটিতে প্রবেশের পরেই হাতের বাম দিকে দেখা যায় দেয়াল গ্রাফিতি। জুলাইয়ে যে স্লোগান দিয়ে সাধারণ জনগণ রাস্তায় নেমে ছিল ‘বিকল্প কে, তুমি আমি আমরা ’, ‘কোটা না মেধা? মেধা মেধা’ ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ তা টাঙানো।

বাংলাদেশ ইতিহাসের শুরু মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফা, ৭ মার্চের ভাষণ থেকে, ৭২-এ রক্ষী বাহিনী হয়ে  মুজিব সরকারের আমল। এদেশে প্রথম যে ফ্যাসিবাদের সূচনা হয়েছিল তার শুরু তখন। বাকশাল গঠন থেকে ১৯৭৮ সালের বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতাবর্তন, ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের হত্যা, খালেদা জিয়ার দল এবং দেশের হাল ধরা থেকে পরবর্তীতে বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনার পত্রিকার খণ্ড চিত্র উঠে এসেছে । 

আর একটু সামনে এগোলে মাঠের মাঝে বেশ বড় জায়গা জুড়ে এক বৃত্তাকার স্থান। সেখানে অনেক প্রতীকী গণকবর রয়েছে। ওখানে সুন্দর করে লেখা ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে, কত প্রাণ হলো বলিদান’। এই প্রতিটি গণকবর আমাদের সেই শহীদের আত্মদানের কথাই সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করিয়ে দেয়। পাশের রেলিংয়ে রয়েছে শহীদ যোদ্ধাদের নাম। 


এর পাশেই আমরা দেখতে পাই কয়েকজন সেনা অফিসার তাদের কাঁধে কফিন বহন করে নিয়ে যাচ্ছেন। মনে পড়ে যায় ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারির কথা, পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের কথা।

এর ঠিক পাশেই অজস্ত্র নাম সম্বলিত একটি নামফলক। যারা শেখ হাসিনার সময়ে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিল এগুলো সেই শহীদদের নাম। ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরে হত্যাযজ্ঞের কথাও করুণ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেয়।

জুলাইয়ের আন্দোলনে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ যখন রাস্তায় নেমে এসেছিল, রিক্সাচালক সুজনও সেই ডাকে সাড়া দিয়ে মাঠে নেমেছিলেন। ভাস্কর্যে আমরা দেখতে পাই, রিক্সাচালক সুজন তার রিক্সার ওপর দাঁড়িয়ে জুলাই যোদ্ধাদের স্যালুট করছেন। ওখানে রয়েছে জুলাইয়ে নিহত ভাইকে কাঁধে নিয়ে আন্দোলনে আসা তার দুই বোন, যারা ভাই হত্যার বিচার চাইতে এসেছেন।

জাদুঘরের নামফলক ও পাশে টানানো ছবিতে থাকা হত্যাকাণ্ড দেখে আপনার হৃদয় কেঁপে উঠবে। আরও বড় ধাক্কা দেবে আয়নাঘরের আদলে তৈরি একটি নির্যাতনকেন্দ্র। সেখানে মাত্র ২.৫ ফুট চওড়া ছোট ছোট সেলে মানুষকে দীর্ঘদিন আটকে রাখার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সেলগুলোতে আলো, বাতাস , পয়ঃনিস্কাশনের সীমিত ব্যবস্থা ছিল। দেয়ালে বন্দিদের লেখা মাকে চিঠি ও দিন গোনার চিহ্নও রয়েছে।

আয়নাঘরের পাশেই একটি সাউন্ডপ্রুফ ঘর। যেখানে ড্রিল মেশিন দিয়ে শরীর ফুটো করে, দাঁত তুলে ফেলে, নখে উঁপড়ে ফেলে, আঙুল কেটে কিংবা ইলেক্ট্রিক শক দিয়ে চালানো হত নির্যাতন।

জুলাই জাদুঘরের মূল ফটক পেরিয়ে ডান দিকের হল ঘরে দেখা যায় ভাঙচুরের নানা স্মৃতিচিহ্ন। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর জনতার ক্ষোভের সাক্ষী এসব জিনিস কাঁচের ঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে। বড় প্রজেক্টরে দেখানো হচ্ছে ৫ আগস্টের ঘটনাবলি ও সাধারণ মানুষের বাঁধভাঙা উল্লাস ।  

আরেকটি ঘরে দেখা যায় আরেকটি টর্চার সেল। যারা হাসিনা সরকারের বিরোধীতা করতেন তাদের নির্যাতনের অনেক সরঞ্জাম এখানে রয়েছে। অপর এক কক্ষে রয়েছে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের চিত্র। ছবিতে দেখা যায় এপিসি, হাজারীবাগে পড়ে থাকা সেনা কর্মকর্তার লাশ, সেনা কর্মকর্তার পোশাক, পারিবারিক ছবিসহ সেদিনের বিভৎসতার চিত্র । 

জুলাইয়ে নারীদের ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। আরেকটি ঘরে সেই সাহসী নারীদের চিত্রের দেখা মিলবে। যাদের কেউ পুলিশের পিকআপ ভ্যান থেকে ভাইকে রক্ষা করে নিয়ে আসছে, ছাত্রলীগের হামলা, বৃষ্টিতে ভেজা উপেক্ষা করে স্লোগান, মিছিলের শুরুতে পুরুষদের সামনে নারীদের অবস্থান—সব কিছু মিলবে জুলাই জাদুঘরে। 

‘কোনকালে একা হয়নিকো জয়ী পুরুষের তরবারী’

প্রেরণা দিয়েছে , শক্তি দিয়েছে বিজয়লক্ষ্মী নারী’।

কাজী নজরুলের এই অমর বাণী জুলাইয়ে বাংলাদেশের নারীরা আবার প্রমাণ করেছেন। ছবিতে, প্ল্যাকার্ডে দেখা মিলবে নারীদের সাহসী স্লোগান-‘দেশটা কারো বাপের না।’

আরেকটি ঘরে রাখা আছে জুলাই শহীদের স্মৃতি-স্মারক। জুলাই শহীদদের ব্যবহৃত ঘড়ি, স্কুল ছাত্রের জুতা, টাই, শার্ট। জুলাইয়ে পুলিশের গুলি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আন্দোলনে থাকা দুই ছাত্রের রাস্তার ব্যারিকেডের আড়ালে অবস্থান নেওয়া। নিহত শিশুদের ব্যবহৃত খেলনা, জুতা, জায়নামাজ ফ্রেমে রাখা আছে। নিহত শিশুদের খেলার ব্যাট, নিহত ডাক্তারের চিকিৎসা সরঞ্জাম, সাংবাদিকের ক্যামেরা ও আইডি কার্ড। একজন শহীদের রক্ত মাখা শার্ট আর আন্দোলনে যাওয়ার আগে বাবা মাকে লেখা শেষ চিঠি আমাদের সবার হৃদয়কে ভারাক্রান্ত করে।

জুলাই জাদুঘর বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এই জাদুঘর সশ্রদ্ধচিত্তে মনে করিয়ে দেয়, ২৪ এর জুলাই এবং শেখ হাসিনার আমলে প্রাণ বিলিয়ে দেয়া বাংলার মানুষদের। বাংলাদেশের মানুষ অন্যায়কে প্রতিহত করতে জানে। এই দেশের মানুষ দেশের প্রয়োজনে রক্ত দিতে জানে। মাথা নত করে না।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম