নতুন আচরণবিধি
উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে কী করা যাবে ও কী যাবে না
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:১৭ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদের জন্য প্রায় একই ধরনের নতুন আচরণবিধি জারি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নতুন বিধিমালায় নির্বাচনী প্রচারে পোস্টার ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলেও সীমিত পরিসরে ব্যানার, লিফলেট, ফেস্টুন ও বিলবোর্ড ব্যবহারের অনুমতি রাখা হয়েছে। পাশাপাশি মাইক, ক্যারাভান ও অন্যান্য ভ্রাম্যমাণ বাহনে প্রচারের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমাও বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
সোমবার নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদের স্বাক্ষরে স্থানীয় সরকারের পাঁচ স্তরের জন্য পৃথক আচরণবিধির গেজেট প্রকাশ করা হয়।
দীর্ঘ প্রায় এক দশক দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর এবার নির্দলীয় প্রতীকে ভোট আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। ২০১৬ সালের আচরণবিধি বাতিল করে স্থানীয় সরকারের সব স্তরের জন্য নতুন করে বিধিমালা প্রণয়ন করেছে ইসি।
প্রচারে পোস্টার নিষিদ্ধ, বিলবোর্ডে সীমা
নতুন আচরণবিধিতে নির্বাচনী প্রচারে পোস্টার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে ব্যানার, লিফলেট, ফেস্টুন ও বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। এসব প্রচারসামগ্রীর আকার ও ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
ব্যানারের সর্বোচ্চ আকার হতে পারবে ১০ ফুট বাই ৪ ফুট। লিফলেট ও হ্যান্ডবিল এ-ফোর আকারের, অর্থাৎ ৮ দশমিক ২৭ ইঞ্চি বাই ১১ দশমিক ৬৯ ইঞ্চির মধ্যে রাখতে হবে। ফেস্টুনের সর্বোচ্চ মাপ ১৮ ইঞ্চি বাই ২৪ ইঞ্চি এবং বিলবোর্ডের প্রচার অংশের সর্বোচ্চ আকার ১৬ ফুট বাই ৯ ফুট নির্ধারণ করা হয়েছে।
সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রতি ওয়ার্ডে একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতি ইউনিয়ন বা পৌর ওয়ার্ডে একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও পুরো নির্বাচনী এলাকায় সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড রাখা যাবে। জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতি থানা বা উপজেলায় একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
প্রচারসামগ্রী সাদা-কালো হতে হবে। ফেস্টুন ও হ্যান্ডবিলে পলিথিনের আবরণ কিংবা পিভিসি ব্যবহার করা যাবে না। এসব সামগ্রীতে মুদ্রণের তারিখও উল্লেখ করতে হবে। নির্বাচনী প্রতীকের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা ছয় ফুটের বেশি হতে পারবে না। প্রচারের কাজে জীবন্ত প্রাণী ব্যবহারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
মাইক ব্যবহারে সময়সীমা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যয় ও নির্বাচনী খাতে
নির্বাচনী প্রচারে মাইক বা শব্দবর্ধক যন্ত্র ব্যবহারের অনুমতি থাকবে দুপুর ১২টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। একই সময়ে একটির বেশি মাইক ব্যবহার করা যাবে না। এই সময়সীমার মধ্যেই ক্যারাভান বা অন্যান্য ভ্রাম্যমাণ বাহন ব্যবহার করে প্রচার চালানো যাবে। তবে জেলা পরিষদ নির্বাচনে মাইক ব্যবহারের অনুমতি রাখা হয়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালানো যাবে। তবে এ ধরনের প্রচারে যে ব্যয় হবে, তা নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ভুয়া তথ্য, বিকৃত ছবি বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট প্রচারের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
ভোটারের এনআইডি ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞা
প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার জন্য ভোটারদের প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে ভোটার কিংবা তার পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) নম্বর সংগ্রহ করা যাবে না। এ ছাড়া মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসে (এমএফএস) লেনদেনের উদ্দেশ্যেও ভোটারের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ভোটারদের এনআইডি ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের নম্বর সংগ্রহের অভিযোগ ওঠার পর ইসি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছিল। এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আচরণবিধিতেই এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরাসরি নিষিদ্ধ করা হলো।
প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ’ ব্যক্তিরা
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ’ ব্যক্তিদের অংশ নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি। নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, চিফ হুইপ, বিরোধীদলীয় নেতা, সংসদ উপনেতা, বিরোধীদলীয় উপনেতা, প্রতিমন্ত্রী, হুইপ, উপমন্ত্রী বা সমমর্যাদার ব্যক্তি, সংসদ সদস্য এবং সিটি মেয়র। এর পাশাপাশি মেয়রের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও প্রশাসকরাও প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না।
প্রার্থী ছাড়া চেয়ারম্যান, মেয়র, প্রশাসক কিংবা স্থানীয় সরকারের দায়িত্বে থাকা কোনো ব্যক্তিও নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না।
আচরণবিধি লঙ্ঘনে কারাদণ্ড ও জরিমানা
নতুন বিধিমালায় আচরণবিধি লঙ্ঘনের জন্য সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আচরণবিধি ভঙ্গের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ডের পাশাপাশি ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান বহাল রয়েছে। গুরুতর লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে প্রার্থিতা বাতিলের সুযোগও রাখা হয়েছে।
পাঁচ ধরনের নির্বাচনে আলাদা বিধান
ইউনিয়ন পরিষদ: প্রতি ওয়ার্ডে একটি বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের ব্যয় নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাবে দেখাতে হবে। দুপুর ১২টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মাইক ব্যবহার করা যাবে। আগের বিধিমালায় বিলবোর্ডের সুযোগ না থাকলেও এবার সীমিত আকারে তা যুক্ত করা হয়েছে।
উপজেলা পরিষদ: প্রতি ইউনিয়ন বা পৌর ওয়ার্ডে একটি করে এবং পুরো নির্বাচনী এলাকায় সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। নির্বাচনী ক্যাম্পের সংখ্যাও সীমিত করা হয়েছে। কেন্দ্রীয়ভাবে একটি, প্রতি ইউনিয়নে একটি এবং পৌর এলাকায় প্রতি তিন ওয়ার্ডে সর্বোচ্চ একটি ক্যাম্প স্থাপন করা যাবে।
পৌরসভা: প্রতি ওয়ার্ডে একটি বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। দুপুর ১২টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মাইক, ক্যারাভান বা ভ্রাম্যমাণ বাহনে প্রচার চালানোর অনুমতি থাকবে।
জেলা পরিষদ: প্রতি থানা বা উপজেলায় একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। তবে এ নির্বাচনে মাইক ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়নি।
সিটি করপোরেশন: প্রতি ওয়ার্ডে একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। পোস্টার নিষিদ্ধ থাকবে। পাশাপাশি ব্যানার, লিফলেট, ফেস্টুন ও বিলবোর্ডের নির্দিষ্ট আকার মেনে প্রচার চালাতে হবে।
মতামত নিয়ে চূড়ান্ত করা হয়েছে আচরণবিধি
চলতি বছরের জুনে স্থানীয় সরকারের পাঁচ স্তরের নির্বাচনের জন্য নতুন আচরণবিধির খসড়া প্রকাশ করেছিল নির্বাচন কমিশন। খসড়ার ওপর নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলসহ সাধারণ নাগরিকদের মতামত চাওয়া হয়।
পরে পাওয়া মতামত পর্যালোচনা করে বিধিমালা চূড়ান্ত করা হয়। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে সোমবার তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আইন ও বিধির সঙ্গে সমন্বয় রেখেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আচরণবিধি প্রণয়ন করা হয়েছে।
চলতি বছরের শেষ দিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের। প্রথম ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
দেশের ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৬১টি জেলা পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৩৩০টি পৌরসভা এবং ১৩টি সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন পদে ধাপে ধাপে ভোট আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।


