গণতন্ত্রের প্রশ্নে বিএনপি সব সময় আপসহীন: মাহদী আমিন
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১২ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সময় ও প্রজন্ম বদলালেও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং গণতন্ত্রের প্রশ্নে বিএনপি সব সময় আপসহীন বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন সংগ্রাম এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আধুনিক রাষ্ট্রদর্শনকে ধারণ করে মেধাভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হবে। ছাত্রদলের মতো এমন দেশপ্রেমিক ছাত্র সংগঠন সঙ্গে থাকলে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে কোনো অপশক্তি রুখতে পারবে না বলেও দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী এই উপদেষ্টা।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ‘জিয়া স্মৃতি বইমেলা ২০২৬’ উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে মাহদী আমিন একথা বলেন। বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে জিয়া স্মৃতি পাঠাগার ও জাতীয়তাবাদী প্রকাশনা সংস্থা।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিএনপিই একমাত্র দল, যা দেশের প্রতিটি জাতীয় সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তিনি বলেন, ইতিহাস সাক্ষী দেয়, যতবারই বাংলাদেশে গণতন্ত্র বিপন্ন হয়েছে, ততবার বিএনপিই তা পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যেমন বাকশাল-পরবর্তী বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছিলেন, তেমনি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেছিলেন। আর দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের পর সবার প্রাণপ্রিয় নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আবারও আজ আমরা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশকে সুসংহত করছি।
বাকস্বাধীনতার ইতিহাস এবং আধুনিক রাষ্ট্র সংস্কারে বিএনপির ভূমিকা অনন্য ও ঐতিহাসিক বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তিনি বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান মাত্র চারটি রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্রের জায়গায় বন্ধ থাকা সব গণমাধ্যম উন্মুক্ত করে দিয়ে এ দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে এনেছিলেন। এরপর দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে উন্মুক্ত মিডিয়া ও আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সুফল পেতে শুরু করে দেশ। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার এমন একটি পরিবেশ তৈরিতে কাজ করছে, যেখানে মৌলিক অধিকার, আইনের শাসন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পুরোপুরি নিশ্চিত থাকবে।
বাকস্বাধীনতার আড়ালে অপপ্রচারের বিষয়ে সতর্ক করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র বলেন, একদল কুচক্রী মহল বাকস্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে নানা অপপ্রচার ও অশালীন ভাষা ব্যবহার করে উসকানি দিচ্ছে। বাকস্বাধীনতার নামে যারা চরম অশালীনতা ও মিথ্যাচার চালাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন তার নিজস্ব গতিতে কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
বিএনপির আত্মমর্যাদাশীল পররাষ্ট্রনীতির কথা উল্লেখ করে মাহদী আমিন বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে সবসময় নতজানু পররাষ্ট্রনীতির বৃত্ত ভেঙে স্বাধীন ও সার্বভৌম অবস্থান বজায় রাখে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সার্ক ও ওআইসিতে বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের পতাকার মর্যাদা উঁচু করেছিলেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে সেই আত্মমর্যাদাশীল ধারা আবারও ফিরে এসেছে। মালয়েশিয়া কিংবা চীনের মতো পরাশক্তিগুলোতে তার বীরোচিত সংবর্ধনা তারই প্রমাণ।
রাষ্ট্র সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি জানান, বিএনপিই বাংলাদেশের ইতিহাসে আধুনিক সংস্কারের মূল রূপকার। শহীদ জিয়ার ১৯ দফা থেকে শুরু করে দেশনেত্রীর ‘ভিশন ২০৩০’ এবং পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক ২৭ ও ৩১ দফার আলোকেই আজকের সমৃদ্ধ ও স্বাবলম্বী বাংলাদেশের পথরেখা রচিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং বিএনপি এমন একটি সত্তা, যা আমাদের অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। আমরা অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে বলি, আমরা সেই দল করি যার প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহান ঘোষক। তিনি যদি ১৯৭১ সালের সেই ২৬ মার্চ চরম মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণা না দিতেন, তবে হয়তো বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথচলা আরও অনেকটা প্রলম্বিত হতো। তিনি কিন্তু কেবল স্বাধীনতার ঘোষণাই দিয়ে থেমে যাননি; একজন বীর সেক্টর কমান্ডার হিসেবে সরাসরি রণাঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে লড়াই করেছেন।
ঐতিহাসিক সিপাহী-জনতার বিপ্লবের প্রসঙ্গ টেনে মাহদী আমিন বলেন, সেদিন দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এক হয়ে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেছিলেন। এরপর বাকশালের পর তিনিই দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। আজ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে জাতির যে নিজস্ব পরিচয়, তার প্রতিটি পরতে শহীদ জিয়াউর রহমান ও বিএনপির অবদান রয়েছে।
বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে একক সংগঠন হিসেবে বিএনপি সবচেয়ে বেশি রক্ত ও আত্মত্যাগ দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তিনি জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দেশের জন্য বিএনপির ৪২০ জনেরও বেশি নেতাকর্মী শহীদ হয়েছেন। একক সংগঠন হিসেবে কেবল ছাত্রদলেরই ১৪০ জনেরও বেশি নেতাকর্মী শহীদ হয়েছেন। এটিই বিএনপির রাজনীতির মাহাত্ম্য এবং ছাত্রদলের আসল শক্তি।
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ব্যাখ্যা দিয়ে মাহদী আমিন বলেন, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, শ্রেণি, মত, পথ ও আদর্শ যা-ই হোক না কেন, সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভালোবেসে গণতান্ত্রিক আদর্শে এই দেশকে গড়ে তোলাই হলো বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। এই দর্শনে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকার, বাকস্বাধীনতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ থাকবে। পাশাপাশি রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিকের সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করবে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র বলেন, সেই অনিশ্চয়তার দিনগুলোতে যখন দেশে কোনো কার্যকর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন বা সরকার ছিল না, তখন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি নির্দেশনায় বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা সারা দেশে জনগণের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। বিএনপি নেতাকর্মীদের সেই ভূমিকার কারণেই তৎকালীন সময়ে দেশকে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছিল।
সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের অধিকার সুরক্ষার পাশাপাশি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি বিএনপি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা ও আস্থা বজায় রেখেছে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তিনি বলেন, বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত ধরেই সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থার বিষয়টি সন্নিবেশিত হয়। পরবর্তী সময়ে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আলেম-ওলামা ও মাশায়েখদের রাষ্ট্র পরিচালনায় সম্মানজনকভাবে সম্পৃক্ত করেছিলেন। আর বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিবসহ সব ধর্মের ধর্মীয় নেতাদের যথাযথ সম্মান ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গার্মেন্টস খাত ও বিদেশে জনশক্তি রফতানি-এই দুটি প্রধান স্তম্ভের মূল রূপকার ছিলেন শহীদ জিয়াউর রহমান। প্রায় পাঁচ দশক ধরে দেশের অর্থনীতি যে ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তার সূচনা তিনিই করেছিলেন। এছাড়া খাল খনন, সবুজ বিপ্লব, গ্রাম সরকার গঠন ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মতো উদ্যোগগুলো আজ প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আরও আধুনিক রূপ নিয়েছে। বর্তমান সরকারের ‘কৃষক কার্ড’ এবং ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রবর্তন মূলত বিএনপির সেই গণমুখী রাজনীতিরই ধারাবাহিকতা।
স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন তুলে ধরে মাহ্দী আমিন বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে শহীদ জিয়া উপজেলায় ৩১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল নির্মাণ শুরু করেছিলেন, যা বেগম খালেদা জিয়া ৫০ শয্যায় উন্নীত করেন। আর আজ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সারা দেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে পর্যায়ক্রমে ১৫১ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক হাসপাতালে রূপান্তরের কাজ শুরু হয়েছে।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন- খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, জিয়া স্মৃতি পাঠাগার কেন্দ্রীয় কমিটি কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা হাবিবা, বিএনপির নির্বাহী কমিটির স্বেচ্ছাসেবক দলের সহ-সম্পাদক আব্দুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল, জিয়া স্মৃতি পাঠাগার কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. জহির দীপ্তি প্রমুখ।
