কেন শিশু দত্তক নেওয়া যায় না বাংলাদেশে?
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:১৭ পিএম
বাংলাদেশে শিশু দত্তক নেওয়ার বিষয়টি এখনো বেশ জটিল।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিয়ের পর দীর্ঘদিন সন্তান না হওয়ায় অনেক নিঃসন্তান দম্পতি শিশু দত্তক নেওয়ার কথা ভাবেন। কিন্তু বাংলাদেশে শিশু দত্তক নেওয়ার বিষয়টি এখনো বেশ জটিল। কারণ, দেশে শিশু দত্তক নেওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো আইন নেই। আদালতের মাধ্যমে মূলত শিশুর অভিভাবকত্ব পাওয়া যায়।
এক দম্পতি সন্তান না হওয়ায় বাংলাদেশ ও ভারতের পাশাপাশি সিঙ্গাপুরেও চিকিৎসা নিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত সন্তান দত্তক নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও আইনি জটিলতার কারণে স্ট্যাম্প পেপারে চুক্তি করে একটি শিশুকে নিজেদের কাছে নেন। তবে আইনজীবীরা বলছেন, এভাবে স্ট্যাম্প পেপারে স্বাক্ষর করে শিশু দত্তক নেওয়া আইনসিদ্ধ নয়।
দত্তক নয়, পাওয়া যায় অভিভাবকত্ব
বাংলাদেশের মুসলিম আইনে সন্তান দত্তক নেওয়ার কোনো বিধান নেই। গার্ডিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্ডস অ্যাক্ট, ১৮৯০ অনুযায়ী আদালতের মাধ্যমে কোনো শিশুর অভিভাবকত্ব পাওয়া যায়। তবে অভিভাবকত্ব পাওয়া আর সন্তান দত্তক নেওয়া এক বিষয় নয়।
অভিভাবকত্বের মাধ্যমে শিশুকে নিজের জিম্মায় রেখে লালন-পালন করা যায়। তবে শিশুর জন্মদাতা বাবা-মায়ের পরিচয় পরিবর্তন করা যায় না। আদালত শিশুর সর্বোচ্চ স্বার্থ ও কল্যাণ বিবেচনা করে অভিভাবকত্বের সিদ্ধান্ত দেয়।
আইনজীবীদের মতে, কোনো বিরোধ না থাকলে কয়েকটি শুনানির মাধ্যমে অভিভাবকত্ব পাওয়া সম্ভব। তবে শিশুকে নিয়ে বিরোধ বা অন্য কোনো জটিলতা থাকলে পুরো প্রক্রিয়া দীর্ঘ হতে পারে।
ধর্মভেদে ভিন্ন নিয়ম
মুসলিম ও খ্রিস্টান ধর্মে প্রচলিত ব্যক্তিগত আইনে সন্তান দত্তক নেওয়ার বিধান নেই। ফলে এসব ধর্মের অনুসারীরা আদালতের মাধ্যমে শিশুর অভিভাবকত্ব নিতে পারেন।
অন্যদিকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে দত্তক গ্রহণের বিধান রয়েছে। তবে প্রচলিত আইনি কাঠামোয় দত্তকের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনার কারণে ছেলে শিশুকে দত্তকের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
কেন দত্তক নেওয়ার আইন নেই?
১৯৮৯ সালের শিশু অধিকার কনভেনশনে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করলেও দত্তক গ্রহণসংক্রান্ত ২১ ধারায় অনুস্বাক্ষর করেনি। এর অন্যতম কারণ হিসেবে মুসলিম আইনে দত্তক গ্রহণের স্বীকৃতি না থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
তবে ১৯৭২ সালে যুদ্ধশিশু ও পরিত্যক্ত শিশুদের পুনর্বাসনের জন্য বিশেষ আইন করা হয়েছিল। ওই আইনের মাধ্যমে শিশু দত্তক নেওয়ার সুযোগ ছিল। পরবর্তীতে শিশু পাচার ও ধর্মান্তরের মতো অভিযোগের প্রেক্ষাপটে আইন সংশোধন করে বিদেশিদের বাংলাদেশি শিশু দত্তক নেওয়ার সুযোগ বন্ধ করা হয়।
তবে বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশি নাগরিকরা আদালতের অনুমতি নিয়ে অভিভাবকত্বের মাধ্যমে শিশুকে নিজেদের জিম্মায় নিতে পারেন।
পালক সন্তান কি সম্পত্তি পাবে?
অভিভাবকত্বের মাধ্যমে লালন-পালন করা শিশু সাধারণত জৈবিক সন্তানের মতো সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয় না। তবে মুসলিম আইনে ওসিয়ত বা উইলের মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পত্তি দেওয়া যেতে পারে। আইন অনুযায়ী মৃত্যুর পর মোট সম্পত্তির সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ ওসিয়ত করা যায়।
তবে পালক বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর সম্পত্তি ভোগের ক্ষেত্রে অন্যান্য উত্তরাধিকারীদের অধিকার ও অনাপত্তির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে বাংলাদেশে নিঃসন্তান দম্পতিদের জন্য শিশুকে নিজের কাছে নেওয়ার সুযোগ থাকলেও সেটি সাধারণ অর্থে ‘দত্তক’ নয়; বরং আদালতের মাধ্যমে অভিভাবকত্ব গ্রহণ। আর এই আইনি প্রক্রিয়াই এখনো অনেকের কাছে জটিল ও সময়সাপেক্ষ।

