Logo
Logo
×
   

Advertisement

জাতীয়

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার আগেই বিভ্রান্তি

সরকারি তথ্যের ঘাটতিতে দালাল-এজেন্সির দাপট, ৩৩৮ এজেন্সির তালিকা ঘিরে নতুন প্রশ্ন

Advertisement

Icon

আহমাদুল কবির, মালয়েশিয়া

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩২ এএম

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার আগেই বিভ্রান্তি

Advertisement

দীর্ঘ অপেক্ষার পর বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবারও খুলতে যাচ্ছে। এতে নতুন করে আশার আলো দেখছেন বিদেশে যেতে আগ্রহী হাজারো তরুণ। কিন্তু বাজার খোলার আগেই দেখা দিয়েছে বিভ্রান্তি। মালয়েশিয়া সরকার কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া ও ধাপগুলো প্রায় এক মাস আগে প্রকাশ করলেও বাংলাদেশে তা যথাযথভাবে প্রচার না হওয়ায় চাকরিপ্রত্যাশীদের বড় একটি অংশ জানেন না কীভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় এবং কার মাধ্যমে তারা মালয়েশিয়ায় যেতে পারবেন।

তথ্যের এই শূন্যস্থানই দখল করেছে রিক্রুটিং এজেন্সি, ট্রাভেল এজেন্সি, দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের প্রচার, চাকরির আশ্বাস ও দ্রুত মালয়েশিয়া পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা চাকরিপ্রত্যাশীদের আকৃষ্ট করছেন। ফলে সরকারের নির্দেশের চেয়ে দালালের কথাই যেন বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি দিয়ে পরবর্তী নির্দেশনা দেওয়া পর্যন্ত কাউকে পাসপোর্ট জমা না দিতে, টাকা না দিতে এবং মেডিকেল পরীক্ষা না করাতে বলেছে। কিন্তু এই সতর্কবার্তার মধ্যেই কিছু লাইসেন্সধারী রিক্রুটিং এজেন্সি, ট্রাভেল এজেন্সি ও দালাল তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের প্রচারণাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সরগরম। তরুণরা ছুটছেন তাদের দেওয়া আশ্বাসে সরকারি ঘোষণার ভিত্তিতে নয়।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে নতুন করে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা পুরোনো সমস্যারই পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা তৈরি করছে। বিদেশে চাকরিতে যাওয়ার শুরু থেকে বিমানবন্দরে ওঠা পর্যন্ত একজন কর্মীকে নিজ দেশেই নানা ধরনের হয়রানি, অনিশ্চয়তা ও অতিরিক্ত ব্যয়ের মুখে পড়তে হয়। মিথ্যা আশ্বাস, তথ্য গোপন, যখন-তখন টাকা দাবি, পাসপোর্ট আটকে রাখা কিংবা পাসপোর্টের অপব্যবহার এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

এই অনিয়ম একদিনে তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর নানা স্তরে প্রশ্রয় পেয়ে এগুলো অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার রূপ নিয়েছে। ফলে আইন ও বিধিবিধানের উপস্থিতি থাকলেও বাস্তবে তার ফাঁকফোকর ব্যবহার করে একটি অনিয়মের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।

নাগরিককে সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য না দিলে শুধু প্রতারণার ঝুঁকিই বাড়ে না, সচেতন হওয়ার সুযোগও কমে যায়। মালয়েশিয়া সরকার যখন তাদের নিজস্ব মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়ার ধাপ প্রকাশ করেছে, তখন বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোরও উচিত ছিল একই তথ্য দ্রুত ও সহজ ভাষায় চাকরিপ্রত্যাশীদের সামনে তুলে ধরা।

সরকারি তথ্যের জায়গা ফাঁকা থাকলে সেই জায়গা অন্যরা দখল করবে—মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি তারই উদাহরণ।

মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম পুরোনো ও গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। কিন্তু কর্মী পাঠানো নিয়ে অনিয়মের অভিযোগও নতুন নয়। কয়েক বছর পরপর নানা অভিযোগে বাজার বন্ধ হয়েছে। পরে বাংলাদেশ সরকার কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক তৎপরতায় বাজার খুলেছে। কিন্তু একই ধরনের অনিয়ম পুনরায় দেখা দেওয়ায় আবারও বন্ধ হয়েছে।

ভিসা কেনাবেচা, দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, বিভিন্ন পর্যায়ে ঘুষ, মেডিকেল পরীক্ষা ও বিমান টিকিটে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া—এসব অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে। ফলে শ্রমবাজারকে টেকসই ও স্বচ্ছ করার পরিবর্তে একটি অংশের কাছে বিদেশে কর্মী পাঠানো যেন দ্রুত অর্থ আয়ের ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।

এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয়েছে সাধারণ কর্মীকেই। অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে বিদেশে গিয়ে চাকরি না পাওয়া, বেতন না পাওয়া, নিয়োগকর্তার প্রতারণার শিকার হওয়া কিংবা আইনি জটিলতায় পড়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। শেষ পর্যন্ত অনেকে শূন্য হাতে দেশে ফিরেছেন, আবার কেউ কেউ অনিয়মিত অবস্থায় থেকে আরও বড় ঝুঁকিতে পড়েছেন।

এবার নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর জন্য ৩৩৮টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশকে কেন্দ্র করে।

তালিকায় ২৫টি প্রধান এজেন্সি, তাদের অধীনে ২৫০টি সহযোগী এজেন্সি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল)-এর অধীনে ৬২টি এজেন্সি রয়েছে।

প্রশ্ন উঠেছে, ২৫০টি সহযোগী এজেন্সি কি সরাসরি মালয়েশিয়ার নিয়োগদাতার কাছ থেকে চাহিদাপত্র সংগ্রহ ও কর্মী পাঠাতে পারবে, নাকি তারা ২৫টি প্রধান এজেন্সির অধীন সাব-এজেন্ট হিসেবেই কাজ করবে? উত্তরটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অতীতের অভিজ্ঞতায়

‘সহযোগী এজেন্সি’ কাঠামোর আড়ালে কার্যত সিন্ডিকেট ব্যবস্থা তৈরি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, তালিকায় থাকা কিছু এজেন্সির মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা নেই। এমনকি কিছু প্রধান এজেন্সির বিএমইটি ক্লিয়ারেন্সের মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর রেকর্ড নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলামও নতুন ব্যবস্থাকে আগের সিন্ডিকেশন পদ্ধতির সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার ভাষ্য, অতীতেও অনেক এজেন্সির নাম তালিকায় থাকলেও বাস্তবে সরাসরি নিয়োগের সুযোগ সীমিত ছিল।

অন্যদিকে সরকারের বক্তব্য ভিন্ন। ৩৩৮টি এজেন্সির নির্বাচন বাংলাদেশ করেনি; বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের আওতায় মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষই এ তালিকা তৈরি করেছে বলে জানানো হয়েছে।

সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ, পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি দেশটির দুর্নীতি দমন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলো যাচাই-বাছাই করেছে। সরকার ৩৩৮টি এজেন্সির অন্তর্ভুক্তিকে ‘ঐতিহাসিক অর্জন’ হিসেবেও বর্ণনা করেছে।

কিন্তু তালিকা প্রকাশ করাই শেষ কথা নয়। বাস্তবে কোন এজেন্সি কীভাবে কাজ করবে, কর্মীর কাছ থেকে কত টাকা নিতে পারবে, চাহিদাপত্র কে সংগ্রহ করবে, সাব-এজেন্টের ভূমিকা কী হবে এবং পুরো প্রক্রিয়া কীভাবে নজরদারির আওতায় থাকবে—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন।

এর মধ্যেই বিশেষ ব্যবস্থায় আগামী তিন মাসে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশটির সেবা খাতে শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় এসব কর্মী নিয়োগ করা হবে।

সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের মাধ্যমে শূন্য অভিবাসন ব্যয়ে কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। মালয়েশিয়া ডিসেম্বরের মধ্যে ওই খাতে মোট ১৫ হাজার কর্মী নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।

২০২৪ সালের ১ জুনের সময়সীমার আগে মালয়েশিয়ায় যেতে না পারা প্রায় ৫ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে প্রথম দফায় অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথম দলকে বোয়েসেলের ব্যবস্থাপনায় বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিমানভাড়াও অন্যান্য অভিবাসন ব্যয়ও বহন করার কথা রয়েছে।

এই উদ্যোগ সফল হলে এটি হতে পারে স্বচ্ছ ও নিরাপদ কর্মী পাঠানোর একটি কার্যকর দৃষ্টান্ত। তবে শূন্য অভিবাসন ব্যয়ের এই মডেল শুধু সীমিত সংখ্যক কর্মীর মধ্যে আটকে থাকবে, নাকি ভবিষ্যতে বৃহত্তর নিয়োগ ব্যবস্থায়ও এর প্রতিফলন ঘটবে সেটিই এখন দেখার বিষয়।

বিদেশে যাওয়ার আগে কর্মীদের বিএমইটিতে নিবন্ধন করতে হয়। এ নিবন্ধনের সুযোগ ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, জেলা কর্মসংস্থান অফিস ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র—টিটিসিতেও রয়েছে। এরপরও মালয়েশিয়ায় যেতে আগ্রহী বহু তরুণকে ঢাকামুখী হতে দেখা যায়।

প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারি সেবাগুলো যদি মানুষের দোরগোড়ায় থাকে, তাহলে চাকরিপ্রত্যাশীরা কেন দালাল ও এজেন্সির ওপর বেশি নির্ভর করবেন?

রামরুর গবেষণায়ও উঠে এসেছে, চাকরিপ্রত্যাশীরা অনেক ক্ষেত্রে সরকারের চেয়ে কাছের দালালের তথ্যকে বেশি বিশ্বাস করেন। এর অর্থ শুধু নাগরিকের সচেতনতার ঘাটতি নয়; সরকারি তথ্য কীভাবে, কত দ্রুত এবং কতটা সহজ ভাষায় মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে, সেই প্রশ্নও সামনে আসে।

মোবাইলভিত্তিক নিবন্ধন ও আঙুলের ছাপ গ্রহণের মতো ব্যবস্থা আরও সহজলভ্য করা গেলে চাকরিপ্রত্যাশীদের ঢাকায় এসে অযথা অর্থ খরচের প্রয়োজন কমতে পারে। একইভাবে টিটিসিগুলোকে শুধু প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নয়, নিরাপদ বৈদেশিক কর্মসংস্থানের তথ্য ও পরামর্শকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।

বিদেশি শ্রমবাজার খোলা ও বন্ধ হওয়া যেন কোনো কোনো ক্ষেত্রে রিক্রুটিং ব্যবসার চক্রে পরিণত হয়েছে। বাজার বন্ধ থাকলে আগাম প্রচারণা, চাহিদা তৈরি ও অর্থ সংগ্রহ; বাজার খুললে তাড়াহুড়ো করে কর্মী পাঠানো—এই প্রবণতা বন্ধ না হলে নতুন করে একই সংকট তৈরি হতে পারে।

শুধু কতজন কর্মী বিদেশে গেলেন এই সংখ্যাকে সাফল্যের মাপকাঠি করলে চলবে না। কত কম খরচে, কতটা স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়, কতটা নিরাপদে এবং কতটা দক্ষ কর্মী বিদেশে গেলেন সেটিই হওয়া উচিত সাফল্যের মানদণ্ড।

বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া শ্রমবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু নতুন করে বাজার খোলার খবর নয়; এটি পুরোনো ভুল থেকে বেরিয়ে আসার একটি বড় পরীক্ষা।

বর্তমান সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা। এর আগে নতুন চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বার্থ সুরক্ষা এবং ভবিষ্যতে সব যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার প্রত্যাশা করছে সরকার।

কিন্তু সেই নতুন অধ্যায়ের সাফল্য নির্ভর করবে একটি বিষয়েই—এবার কি শ্রমবাজার খুলবে কর্মীর স্বার্থে, নাকি আবারও খুলবে মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের স্বার্থে?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার এবার সত্যিই কতটা ‘নতুন’।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম