ঢাকা পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেসি কনফারেন্স
মামলার তদন্ত-চার্জশিটে গতি আনতে সমন্বিত পদক্ষেপের তাগিদ
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৪৫ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি, তদন্তে গতি আনা, সময়মতো চার্জশিট দাখিল, মেডিকেল ও ফরেনসিক প্রতিবেদন দ্রুত আদালতে উপস্থাপন এবং বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি কমাতে আদালত, পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
শনিবার ঢাকা জেলার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসির আয়োজনে অনুষ্ঠিত পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেসি কনফারেন্সে এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়।
চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (ভারপ্রাপ্ত) মো. মাহবুবুর রহমানের সভাপতিত্বে কনফারেন্সে প্রধান অতিথি ছিলেন সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মো. রফিকুল ইসলাম। জেলার মামলার নিষ্পত্তি-সংক্রান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহফুজুর রহমান। সঞ্চালনা করেন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. তাজুল ইসলাম সোহাগ।
সভায় ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন, সিআইডির পুলিশ সুপার, পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, জেল সুপার, সিভিল সার্জন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন থানার ওসি, জেলা পিপি, ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
দ্রুত তদন্ত ও চার্জশিটে গুরুত্ব
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন-সংক্রান্ত মামলার অগ্রগতি নিয়েও আলোচনা হয়। ঢাকা জেলা জজ আদালতে এ ধরনের মাত্র চারটি মামলা বিচারের জন্য এসেছে বলে সভায় জানানো হয়। এসব মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করে আইনানুগভাবে চার্জশিট দাখিলের জন্য থানার ওসিদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে পুলিশ সুপারের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়।
তদন্তে কোনো আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগের পর্যাপ্ত ভিত্তি না থাকলে আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
পুলিশ রিপোর্ট দাখিলের পর আসামির নাম বা ঠিকানায় ভুল ধরা পড়লে আইনানুগভাবে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিলের বিষয়েও আলোচনা হয়। তবে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়ার সময় মূল অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত ‘সেন্ট-আপ’ আসামি যেন বাদ না যায়, সে বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তাদের সতর্ক করেন সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মো. রফিকুল ইসলাম।
দীর্ঘদিন গ্রেফতারি পরোয়ানা (W/A) তামিল না হওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। দ্রুত পরোয়ানা তামিল এবং সংশ্লিষ্ট আসামিদের গ্রেফতারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
মেডিকেল-ফরেনসিক প্রতিবেদন দ্রুত দেওয়ার তাগিদ
ভিকটিমদের মেডিকেল সার্টিফিকেট ও ফরেনসিক প্রতিবেদন দ্রুত পাওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়। মেডিকেল প্রতিবেদন চাওয়ার ক্ষেত্রে সঠিক কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন এবং সংশ্লিষ্ট থানা থেকে যথাযথ রিকুইজিশন পাঠানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
চিকিৎসাদানকারী চিকিৎসক কর্মরত না থাকলে সংশ্লিষ্ট পদে কর্মরত চিকিৎসকের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বোর্ড গঠন করে যথাযথ স্বাক্ষরে দ্রুত প্রতিবেদন দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়।
হত্যা মামলায় মামলা দায়েরের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সুরতহাল প্রতিবেদন, জব্দ তালিকা ও পোস্টমর্টেম প্রতিবেদন আদালতে সময়মতো না আসার বিষয়টি উঠে আসে। মামলা দায়েরের পরপরই সুরতহাল প্রতিবেদন ও জব্দ তালিকা এবং পরে পোস্টমর্টেম প্রতিবেদন যথাসময়ে আদালতে পাঠানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় মেডিকেল পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা হয়। ভিকটিমের মেডিকেল পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট আইনগত বিষয় যথাযথভাবে বিবেচনা করে মামলা গ্রহণ ও তদন্ত পরিচালনার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
ডিজিটাল আলামত সংরক্ষণে সতর্কতা
ডিজিটাল আলামত ও ইলেকট্রনিক সাক্ষ্য যথাযথভাবে জব্দ, সংরক্ষণ ও শনাক্তকরণের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়। সিসি ক্যামেরার ডিভিআরসহ সংশ্লিষ্ট ডিভাইস যথাযথভাবে জব্দ এবং মোবাইল ফোন জব্দের সময় সিমের তথ্য ও আইএমইআই নম্বর সঠিকভাবে নথিভুক্ত করার বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তাদের সতর্ক করা হয়।
ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি ও স্বীকারোক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রেও আইনগত শর্ত, স্বেচ্ছাস্বীকৃতি ও নির্ধারিত পদ্ধতি যথাযথভাবে অনুসরণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
এপিপিদের নিয়মিত উপস্থিতির তাগিদ
অধিকাংশ আদালতে সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটরদের (এপিপি) নিয়মিত উপস্থিত না থাকার বিষয়টি সভায় উঠে আসে। আদালতের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার স্বার্থে এপিপিদের নিয়মিত ও যথাসময়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে জেলা পিপির দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন পিপির পক্ষের প্রতিনিধি।
এছাড়া বিশুদ্ধ ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সময় জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের পর্যাপ্ত পুলিশ ফোর্স দিয়ে সহযোগিতার বিষয়েও পুলিশ সুপারের সঙ্গে আলোচনা হয়।
সভায় ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনের চারটি লিফটের নিম্নমান ও ঘন ঘন বিকল হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চলাচলের সুবিধার্থে দ্রুত সমস্যার সমাধান ও উন্নতমানের লিফট সরবরাহের দাবি জানানো হয়। সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী (ইএম বিভাগ) বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির আশ্বাস দেন।
সভায় বক্তারা বলেন, বিচার কার্যক্রম দ্রুত ও জনবান্ধব করতে আদালত, পুলিশ, কারাগার, মেডিকেল কর্তৃপক্ষ এবং তদন্তকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করা প্রয়োজন। সময়মতো তদন্ত প্রতিবেদন, চার্জশিট, মেডিকেল-ফরেনসিক প্রতিবেদন, আলামত ও আসামিদের আদালতে উপস্থাপন নিশ্চিত করা গেলে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির পাশাপাশি বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তিও কমবে।
সভাপতির বক্তব্যের মধ্য দিয়ে কনফারেন্সের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
