Logo
Logo
×
   

Advertisement

জাতীয়

সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনীতে আলেমদের আপত্তি কেন

Advertisement

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩৬ পিএম

সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনীতে আলেমদের আপত্তি কেন

Advertisement

সম্পত্তি দান করার পরেও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত সেটি ভোগ করার অধিকার রাখতে পারবেন এমন বিধান রেখে ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদ অধিবেশনে পাশ হয়। তবে এটি পাশ হওয়ার পর থেকেই সম্পত্তি সংক্রান্ত নানা ধরনের আলোচনা তৈরি হয়েছে।

সম্পত্তি রেজিস্ট্রির পর এই ধরনের দান সাধারণভাবে ‘অপরিবর্তনীয়’ হওয়ায় শুধু দাতার ইচ্ছা পরিবর্তনের কারণে তা বাতিলের সুযোগও থাকছে না নতুন আইনে। তবে আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষা, পারিবারিক বা অন্য কোনও প্রকৃত প্রয়োজন দেখা দিলে দাতা ও দানগ্রহীতার পারস্পরিক সম্মতিতে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে তা পরিবর্তন বা বাতিল করা যাবে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আদালতের অনুমোদনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

এতদিনের প্রচলিত ‘দ্যা ট্রান্সফার অফ প্রপার্টি অ্যাক্ট, ১৮৮২ অথবা সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২’ অনুযায়ী, কেউ সম্পত্তি দান করার সঙ্গে সঙ্গে সেটির মালিকানা ও ভোগদখলের অধিকার গ্রহীতার কাছে চলে যায়। যে কারণে বাবা-মা জীবদ্দশায় সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর অনেক সময় অসহায় হয়ে পড়েন।

তবে নতুন সংশোধিত এই আইনে বলা হয়েছে, সম্পত্তি দান করলেও জীবদ্দশার বাবা-মায়ের সেই সম্পত্তিতে অধিকার অব্যাহত থাকবে।

গত ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’-এর মাধ্যমে ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্ট, ১৮৮২’-এ নতুন ১২২ক ও ১২২খ ধারা যুক্ত করা হয়েছে। এতে বাবা-মা বা দাদা-দাদি সন্তান বা নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণের আইনি স্বীকৃতি পেয়েছেন। একইভাবে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও এই ধরনের দানের সুযোগ রাখা হয়েছে।

তবে নতুন বিধানটি সাধারণ গিফট, মুসলিম হেবা বা অন্য স্বীকৃত হস্তান্তর পদ্ধতির বৈধতাকে প্রভাবিত করবে না বলে সরকারের তরফে জানানো হয়েছে।  

গত রোববার আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান আইনটিতে নতুন এই সংশোধনীর বিল জাতীয় সংসদ অধিবেশনে উত্থাপন করলে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা এটিকে কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী বলে প্রতিবাদ করেন। তবে পরে কন্ঠভোটে বিলটি পাস হয়। 

এ বিলের বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে সংশোধনের দাবি জানিয়েছে দেশের আলেমসমাজ। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশসহ ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলো এ বিল পাশের পর তীব্র আপত্তি জানিয়েছে। 

তাদের মতে, মানবিক ও সামাজিক নিরাপত্তার কথা বলা হলেও এই আইনের মাধ্যমে মূলত কুরআন, সুন্নাহ ও ইসলামী শরীয়াহ নির্ধারিত ফারায়েজ (উত্তরাধিকার) এবং হেবার মূল নীতিকে পাশ কাটানোর সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। 

শুধু কন্যাসন্তান থাকলে কেন এই আইন

মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে কোনও ব্যক্তি পুত্রসন্তান না রেখে শুধু কন্যাসন্তান রেখে মারা গেলে কন্যা উত্তরাধিকারী হলেও পরিস্থিতি অনুযায়ী অন্য ওয়ারিশেরও সম্পত্তিতে অধিকার তৈরি হতে পারে। ফলে শুধু কন্যাসন্তান থাকলে বাবার মৃত্যুর পর তার সব সম্পত্তি কন্যার পান না। 

এই বাস্তবতায় কোনো বাবা যদি জীবদ্দশায় নিজের সম্পত্তি মেয়ের নামে দিয়ে যেতে চান, নতুন আইনের বিধানটি সেই সুযোগ তৈরি করেছে।

বাবা সম্পত্তি মেয়েকে দান করার পরও দলিলে নিজের জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন। অর্থাৎ, আইন অনুযায়ী বাবা জীবিত থাকা পর্যন্ত সম্পত্তিটি ভোগ করবেন, কিন্তু একই সঙ্গে সম্পত্তি হস্তান্তরের আইনি প্রক্রিয়াটিও সম্পন্ন হবে।

নতুন আইনটির ফলে কন্যাসন্তানের মুসলিম উত্তরাধিকার বা মিরাসের হিস্যা বাড়ছে না। মিরাস বলতে, কোনও ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর তিনি যে সম্পত্তি রেখে যান, সেই সম্পত্তিতে প্রচলিত মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মা ও অন্যান্য বৈধ ওয়ারিশের যে অংশ নির্ধারিত হয়, তাকে বোঝায়।

নতুন আইনে সেই উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় কন্যার প্রাপ্য অংশ বাড়ানো হয়নি। বরং বাবা-মা জীবিত থাকা অবস্থায় কন্যার কাছে সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি সুনির্দিষ্ট আইনি পথ তৈরি হচ্ছে।

ফলে পুত্রসন্তান নেই; এমন কোনো বাবা যদি চান, তার জীবদ্দশাতেই সম্পত্তি মেয়ের কাছে চলে যাক এবং একই সঙ্গে তিনি জীবিত থাকা পর্যন্ত সেই সম্পত্তি ভোগ করতে পারেন, তাহলে নতুন বিধানটি সেই সুযোগ দিচ্ছে।

মেয়ে কি দান পাওয়া সম্পত্তি বিক্রি করতে পারবে?

নতুন আইনে ১২২ক-এর অধীনে দান করা সম্পত্তি দানগ্রহীতা বিক্রি করতে পারবে কি না; এ বিষয়ে সরাসরি কোনও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়নি। তবে এখানে দুটি বিষয় আলাদা; দানগ্রহীতার কাছে সম্পত্তির স্বত্ব হস্তান্তর এবং দাতার সংরক্ষিত জীবনকালীন ভোগাধিকার।

অর্থাৎ, বাবা মেয়েকে সম্পত্তি দান করে নিজের জীবনকালীন ভোগাধিকার রেখে দিলে মেয়ের কাছে সম্পত্তির স্বত্ব গেলেও বাবার সংরক্ষিত ভোগাধিকার বহাল থাকবে। ফলে মেয়ের পরবর্তী কোনও হস্তান্তর বা বিক্রয়ের ক্ষেত্রেও বাবার ওই সংরক্ষিত অধিকারের বিষয়টি বিবেচনায় থাকবে।

নতুন আইনে এমনও বলা হয়েছে, দানগ্রহীতা দাতার জীবদ্দশায় মারা গেলে সম্পত্তি আইন অনুযায়ী দানগ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে যাবে। তবে এর পরও দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার সম্পত্তির সঙ্গে বহাল থাকবে।

দান কি পরে বাতিল করা যাবে?

নতুন ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ১২২ক-এর অধীনে করা গিফট রেজিস্ট্রেশনের পর সাধারণভাবে তা অপরিবর্তনীয় থাকবে। অর্থাৎ, বাবা-মা পরে শুধু মত পরিবর্তন করলেই দান করা সম্পত্তি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকবে না।

তবে ১২২খ ধারায় নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন বা বাতিলের সুযোগ রাখা হয়েছে। আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষা, পারিবারিক বা অন্য কোনও প্রকৃত প্রয়োজন দেখা দিলে দাতা ও দানগ্রহীতার পারস্পরিক সম্মতিতে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে তা পরিবর্তন বা বাতিল করা যাবে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট আদালতের অনুমোদনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

বিলের বিষয়ে একমত নয় বিরোধী দল ও আলেমরা 

নতুন এই আইন পাশের সময় বিরোধী দল ও জোট সদস্যরা জাতীয় সংসদে বিরোধিতা করেছেন।

বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’-এর বিরোধিতা করে বলেন, ‘এই আইনটি কুরআন-সুন্নাহবিরোধী। সরকার ও বিএনপির পক্ষ থেকে কুরআন-সুন্নাহর বাইরে কোনও আইন না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এই বিল পাস করা হচ্ছে। দেশের প্রখ্যাত ওলামায়ে কেরামও বলেছেন, আজীবন ভোগদখলের অধিকার রেখে দানের এই বিধান ইসলামী আইনের পরিপন্থী। এতে আল্লাহর দেওয়া মিরাসি বিধানকে পাশ কাটানোর সুযোগ তৈরি হবে।’

তিনি বলেন, ‘সামাজিক সমস্যা সমাধানের জন্য ইসলামী পারিবারিক আইনকে পাশ কাটানোর যুক্তি নেই। বাবা-মায়ের অধিকার রক্ষায় ২০১৩ সালের আইন রয়েছে। এই বিলের মাধ্যমে উত্তরাধিকার ও হেবার বিধানকে পাশ কাটানোর সুযোগ তৈরি হলে এর পক্ষে ভোটদানকারীদের দায়ভার নিতে হবে।’

এই বিরোধিতা করে বিলটি সংসদে জনমত যাচাইয়ে দিলে বিরোধী দল প্রতিবাদ জানিয়ে সংসদ অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করে।

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আবদুল মালেক এ ধরনের শর্তযুক্ত হেবা শরিয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয় বলে মতামত দিয়েছেন। 

চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি দেওয়া এক ফতোয়ায় তিনি বলেন, ইসলামী উত্তরাধিকার আইনে কার কতটুকু সম্পত্তির অধিকার রয়েছে, তা কুরআন-সুন্নাহর মাধ্যমে নির্ধারিত। ফলে সামাজিক বাস্তবতা, পারিবারিক প্রয়োজন বা অন্য কোনো যুক্তির ভিত্তিতে আল্লাহ তায়ালার নির্ধারিত মিরাসের বিধানে পরিবর্তন বা সংশোধনের সুযোগ নেই।

তৎকালীন ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার সহকারীর করা প্রশ্নের জবাবে মুফতি আব্দুল মালেক ফতোয়ায় বলেন, ‘পুত্রসন্তান না থাকলে কন্যাসন্তানকে উত্তরাধিকার থেকে আংশিক বঞ্চিত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা বা সুরক্ষার দোহাই দিয়ে ‘জীবনস্বত্ব সংরক্ষণ করে হেবা’ প্রবর্তনের যে আইনি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা সম্পূর্ণ শরীয়তবিরোধী, বাতিল ও অগ্রহণযোগ্য।’

ইসলামি শরিয়া বিশেষজ্ঞদের মতামত না নিয়ে তড়িঘড়ি করে জাতীয় সংসদে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল-২০২৬’ পাশ করায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।

সংগঠনের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী এক বিবৃতিতে এর প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, ‘এই বিল কুরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। মুসলমানপ্রধান আলেম-ওলামাদের এ দেশে ইসলামি শরিয়াহবিরোধী কোনো আইন গ্রহণযোগ্য হবে না। এই বিল সংশোধন করতে হবে।’ তিনি রাষ্ট্রপতিকে বিলে স্বাক্ষর না করার আহ্বান জানান।

আইনটি পাশের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক সরকারের প্রতি এই আইন অনতিবিলম্বে পুনর্বিবেচনার দাবি জানান।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, আমরা সরকারের সদিচ্ছার প্রতি সুধারণা রাখছি। তবে সম্ভবত গভীরভাবে না ভেবেই আইনটি আনা হয়েছে। সেজন্য সরকারকে বলব, আইনটি নিয়ে অধিকতর পর্যালোচনা করুন। উলামায়ে কেরাম ও আইনবিদদের সাথে পরামর্শ করুন। প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনুন। কিন্তু সমস্যা সমাধানের নামে কোন অবস্থাতেই শরীয়াহ অমান্য করা যাবে না।

বিএনপির নির্বাচনী শরিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতারা বলছেন, মুসলমানদের সম্পত্তি বণ্টন, উত্তরাধিকার, হেবা ও মালিকানা হস্তান্তরের বিষয়গুলো ইসলামী শরিয়াহর সুস্পষ্ট বিধানের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। নতুন কোনো আইন বা আইনের কোনো ধারা যেন পবিত্র কোরআন-সুন্নাহ নির্ধারিত মিরাস ও হেবার বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। 

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম