Logo
Logo
×
   

Advertisement

জাতীয়

ভারত থেকে টনে টনে ইলিশ বাংলাদেশে আমদানি হচ্ছে কেন?

Advertisement

Icon

বিবিসি বাংলা

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৪৬ পিএম

ভারত থেকে টনে টনে ইলিশ বাংলাদেশে আমদানি হচ্ছে কেন?

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

বাংলাদেশের বেনাপোল বন্দর দিয়ে গত দুই মাসে প্রায় সাত কোটি টাকা মূল্যের সাড়ে তিন লাখ কেজিরও বেশি (প্রায় ৩৫০ টন) ইলিশ আমদানি করেছে ১৯টি প্রতিষ্ঠান। তবে দেশের বিভিন্ন বাজারে এসব মাছ বাংলাদেশি ইলিশ হিসেবে বিক্রির অভিযোগও উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক, কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছে, ভারত থেকে আরও ইলিশ বাংলাদেশে আসার পথে রয়েছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, আমদানি হওয়া অধিকাংশ ইলিশই ভারতের গুজরাট থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।

প্রতি বছর দুর্গাপূজার আগে বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে ইলিশ রপ্তানি নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক দেখা গেলেও এবার ঘটেছে উল্টো চিত্র। পদ্মার ইলিশের পরিবর্তে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বিপুল পরিমাণ গুজরাটি ইলিশ বাংলাদেশে প্রবেশ করছে পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে।

পশ্চিমবঙ্গ চিল্ড ফিশ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মাকসুদ জানিয়েছেন, গত প্রায় দুই মাসে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশ বাংলাদেশে রপ্তানি হয়েছে। তার দাবি, এর প্রায় পুরোটাই গুজরাট থেকে এসেছে।

সংশ্লিষ্টদের ধারণা, বাংলাদেশের বাজারে ইলিশের উচ্চমূল্যের তুলনায় ভারত থেকে আমদানি করা ইলিশের দাম অনেক কম হওয়ায় ব্যবসায়ীরা এ খাতে আগ্রহী হয়েছেন।

যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মনিরুল মামুন বলেন, মৎস্য অধিদপ্তরের অনুমতি নিয়েই কিছু প্রতিষ্ঠান ইলিশ আমদানি করছে। তবে কেন এভাবে আমদানির প্রয়োজন হয়েছে, সে বিষয়ে তাদের কাছে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই।

মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক জানিয়েছেন, ব্যবসায়ীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সীমিত পরিসরে ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

এদিকে ইলিশ গবেষক ড. আনিসুর রহমানের মতে, নদীদূষণ, কারেন্ট জালে জাটকা নিধন, বালু উত্তোলনসহ নানা কারণে বাংলাদেশের জলসীমায় ইলিশের প্রাপ্যতা কমেছে। ফলে বাজারে সংকট তৈরি হওয়ায় বিভিন্ন উৎস থেকে ইলিশ আসছে।

কেন ভারত থেকে ইলিশ আমদানি?

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই ইলিশ রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এখন দেশটিকে ভারত থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ইলিশ আমদানি করতে হচ্ছে।

যশোর জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাস—জুলাই ও আগস্টে—১৯টি প্রতিষ্ঠান ভারত থেকে মোট ৩ লাখ ৫২ হাজার ৪৮৪ কেজি ইলিশ আমদানি করেছে। এসব মাছের মূল্য প্রায় সাত কোটি টাকা।

বেনাপোল স্থলবন্দরের মৎস্য কোয়ারেন্টাইন পরিদর্শক আশওয়াদুল আলমও এ তথ্য জানিয়েছেন।

তবে কেন আমদানি করা হচ্ছে—এ প্রশ্নের জবাবে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুল মামুন বলেন, এ ধরনের আমদানি এবারই প্রথম নয়, তবে এত বড় পরিসরে আগে দেখা যায়নি। তার ভাষায়, ‘হয়তো সেখানে বেশি মাছ ধরা পড়েছে। ব্যবসায়ীরা যথাযথ অনুমতি নিয়ে আমদানি করছেন, তাই আমরা অনুমোদন দিচ্ছি।’

বাংলাদেশে প্রায় দুই দশক ধরে ইলিশের উৎপাদন বাড়লেও গত তিন বছরে ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন ও গড় ওজন কমেছে। এ নিয়ে গবেষকদের উদ্বেগ রয়েছে।   

এ অবস্থায় ইলিশের মৌসুম চলাকালেই ভারত থেকে ইলিশ আমদানির বিষয়টি নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা ইলিশের পূর্ণাঙ্গ জীবনচক্র উন্মোচনের পর উৎপাদন ও সংরক্ষণে বড় অগ্রগতির আশা করা হয়েছিল।

আমদানিকারকদের হয়ে কাজ করা একটি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার মো. কামরুজ্জামান বলেন, বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় ব্যবসায়ীরা আমদানির দিকে ঝুঁকছেন। তার ভাষায়, ‘লাভ না থাকলে কেউ আমদানি করবে না।’

তিনি জানান, গত বছর জুলাই থেকেও ভারত থেকে ইলিশ আমদানি শুরু হয়েছিল।

উৎপাদন কমছে, রপ্তানিও লক্ষ্যমাত্রার নিচে

বাংলাদেশ শুধু ইলিশ আমদানি করছে তা নয়, গত অর্থবছরে রপ্তানির ক্ষেত্রেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ১ হাজার ২০০ টন রপ্তানির লক্ষ্য থাকলেও ১১০ টনেরও কম ইলিশ বিদেশে পাঠানো গেছে।

ইলিশ উৎপাদন বাড়াতে ২০২০ সালে ছয় বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। তবে প্রকল্পটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. খালেদ কনক।

তিনি বলেন, ‘ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য প্রায় ৪০০ কোটি টাকার প্রকল্প ছিল। সেটি কতটা কার্যকর হয়েছে, কোথাও গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। উৎপাদন কমার কারণও বের করতে হবে।’

ভারত থেকে ইলিশ আমদানির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ইলিশ আমদানি নিষিদ্ধ নয়। আগেও সীমিত পরিসরে এসেছে। এ বছর বাজারে সরবরাহ কম থাকায় ব্যবসায়ীদের আবেদনের ভিত্তিতে কিছু অনুমতি দেওয়া হয়েছে।’

তার মতে, ইলিশ মূলত সামুদ্রিক মাছ। প্রজননের জন্য নদীতে এলেও সমুদ্রে অতিরিক্ত আহরণের কারণে বাংলাদেশের জলসীমায় মজুত কমে যেতে পারে।

অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা ও আমদানিকারকের দাবি, ভারত থেকে আনা ইলিশের ক্রয়মূল্য প্রতি কেজিতে সর্বোচ্চ দুই ডলার বা প্রায় ২৪৬ টাকার কাছাকাছি। শুল্ক ও অন্যান্য ব্যয় যোগ করেও এর দাম দেশের বাজারে একই ওজনের দেশি ইলিশের তুলনায় অনেক কম পড়ে। ফলে আমদানিকারকদের লাভের সুযোগও বেশি।

বাজারে সংকট কতটা?

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার বিভিন্ন বাজারে ৫০০ গ্রামের বেশি ওজনের ইলিশ ১,৬০০ টাকা, ৭০০ গ্রামের মাছ ১,৮০০ টাকা, ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রামের মাছ ২,২০০ থেকে ২,৪০০ টাকা এবং এক কেজির বেশি ওজনের ইলিশ ২,৮০০ টাকার কাছাকাছি দামে বিক্রি হতে দেখা গেছে।

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। বিশ্বের মোট ইলিশের বড় অংশই বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন আরও কমে ৫ লাখ ৪ হাজার মেট্রিক টনে নেমে আসে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদন পাঁচ লাখ টনেরও নিচে নেমে যেতে পারে।

ইলিশ বিশেষজ্ঞ ড. আনিসুর রহমান মনে করেন, ইলিশের অভিবাসনপথ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, পরিবেশ দূষণ, কীটনাশকের ব্যবহার এবং ক্ষতিকর উপায়ে মাছ ধরা—সব মিলিয়ে প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

গুজরাটে ইলিশের প্রাচুর্য

পশ্চিমবঙ্গের রপ্তানিকারক সৈয়দ আনোয়ার মাকসুদের মতে, এ বছর গুজরাটে বিপুল পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়েছে। ফলে সেখানে সরবরাহ বেড়েছে এবং দামও কমেছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে শুধু ইলিশ নয়, ইলিশের ডিমেরও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। গুজরাটের বড় আকারের ইলিশে প্রচুর ডিম থাকায় এসব মাছ বাংলাদেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

তার মতে, গুজরাটের ভারুচ থেকে পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ার পাইকারি বাজার হয়ে পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত পর্যন্ত একটি বাণিজ্যিক সরবরাহ চেইন গড়ে উঠেছে।

ভারুচের ব্যবসায়ী নেতা চিমন ট্যান্ডেল জানান, গত পাঁচ বছর ধরে সেখানে ইলিশের উৎপাদন ভালো হচ্ছে। অধিকাংশ মাছ পশ্চিমবঙ্গে পাঠানো হলেও বাংলাদেশেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রপ্তানি হচ্ছে।

তিনি জানান, প্রতিদিন ভারুচ থেকে তিনটি ট্রাক ছাড়ে। প্রতিটি ট্রাকে গড়ে ২৫০টি বাক্স থাকে এবং প্রতি বাক্সে প্রায় ৬০ কেজি ইলিশ পরিবহন করা হয়।

মৎস্যজীবী দীপকভাই মাচ্ছির দাবি, বর্তমানে গুজরাটে প্রতি কেজি ইলিশ ৬০০ থেকে ৭০০ ভারতীয় রুপিতে বিক্রি হচ্ছে। মৌসুমে ছোট মাপের জেলেরাও প্রায় পাঁচ লাখ রুপি পর্যন্ত আয় করতে পারেন।

পশ্চিমবঙ্গের মৎস্য ব্যবসায়ী রথীকান্ত বার বলেন, বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরাও পশ্চিমবঙ্গের বাজারে এসে খুচরা পরিমাণে ইলিশ কিনছেন। তাদের পছন্দের তালিকায় গুজরাট ও মহারাষ্ট্রের বড় আকারের ইলিশই বেশি।

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের মৎস্যজীবী নেতা জয়কৃষ্ণ হালদার জলদূষণ ও শিল্পভিত্তিক মাছ ধরাকে ইলিশের সরবরাহ পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, নদী ও সমুদ্রের পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় সাধারণ জেলেরা আগের মতো মাছ পাচ্ছেন না।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম