Logo
Logo
×
   

Advertisement

জাতীয়

সিলেটে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি

গণতন্ত্র রক্ষা ও দেশ পুনর্গঠনই প্রধান কাজ

Advertisement

Icon

সিলেট ব্যুরো

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১৮ পিএম

গণতন্ত্র রক্ষা ও দেশ পুনর্গঠনই প্রধান কাজ

নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণ দেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

Advertisement

অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা, রক্তপাত ও সন্তানদের প্রাণের বিনিময়ে আমরা একটি ফ্যাসিস্ট সরকারকে সরিয়ে দীর্ঘকাল লড়াই করে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে পেয়েছি। এই গণতন্ত্রকে রক্ষা করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়াটাই এখন আমাদের সবচেয়ে বড় কাজ, সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। আগামী দিনের লড়াই হচ্ছে দেশকে পুনর্গঠন করার, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সত্যিকারের বাসযোগ্য আবাসস্থল গড়ে তোলার।

সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) আয়োজিত বর্ণাঢ্য নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এসব কথা বলেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

মঙ্গলবার বিকালে সিলেট নগর ভবনের সামনে সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংবর্ধনা ও সুধী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

এতে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন- বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এমপি, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, জাতীয় সংসদের হুইপ জিকে গউছ এমপি এবং রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী।

রাষ্ট্রপতির সহধর্মিণী রাহাত আরা বেগমসহ সিলেট বিভাগের বিভিন্ন আসনের সংসদ সদস্য, স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তবে আয়োজকদের বিরুদ্ধে অনাগরিক আচরণ ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ এনে সিসিকের এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠান বয়কট করে সিলেট মহানগর বিএনপি।

সিলেটের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের প্রশংসায় রাষ্ট্রপতি তার বক্তব্যে বলেন, আমরা অত্যন্ত ভাগ্যবান যে অত্যন্ত যোগ্য একজন মানুষকে বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে পেয়েছি, যার নেতৃত্বে বাংলাদেশের বাণিজ্য সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। আর আপনাদেরই আরেক সন্তান আরিফ সাহেব, যিনি দীর্ঘদিন সিসিকের মেয়র ছিলেন এবং এখন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের দায়িত্ব পেয়েছেন। আমি জানি ইতোমধ্যেই তিনি অনেক কাজ করেছেন। বিদেশে বন্ধ হয়ে যাওয়া শ্রমবাজারগুলো পুনরায় খোলার চেষ্টা করে সফল হয়েছেন। সিলেটের সার্বিক উন্নয়নের পথ সুগম করতে প্রধান দুটি মন্ত্রণালয়ই আপনাদের হাতে রয়েছে।

সংবর্ধনার জবাবে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আবেগঘন কণ্ঠে রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতি ও বর্তমান নিরপেক্ষ অবস্থানের কথা ব্যক্ত করে বলেন, আগে রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে যেভাবে আপনাদের সঙ্গে কথা বলতাম, এখন সেভাবে পারি না। কারণ আমি শপথ নিয়েছি, আমি সম্পূর্ণ দল নিরপেক্ষভাবে কাজ করব, কথা বলব।

সিলেট নিজেই অত্যন্ত গর্বিত একটি জায়গা। এখানে হযরত শাহজালাল (র.) ও হযরত শাহপরান (র.) শুয়ে আছেন, শ্রীচৈতন্য দেবের স্মৃতি সিলেটে রয়েছে। এখানে হাছন রাজা, রাধারমন দত্ত, শীতালং শাহ, শাহ আব্দুল করিম, হেমাঙ্গ বিশ্বাসরা জন্ম নিয়েছেন। এমএজি ওসমানী, সাইফুর রহমান, এমএ খান, ইলিয়াস আলীর মতো নেতারা এখানে জন্ম নিয়েছেন। সিলেটের আলাদা সংস্কৃতি রয়েছে। সিলেটের চা বাগানের সারা বিশ্বে খ্যাতি রয়েছে এবং প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখছেন। সিলেটের মানুষ একইসঙ্গে শান্তিপ্রিয় ও প্রতিবাদী।

সিলেটের সঙ্গে নিজের দীর্ঘদিনের গভীর স্মৃতির কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, সিলেট আমার কাছে অত্যন্ত প্রিয় একটি জায়গা। আমি যখনই সুযোগ পাই তখনই সিলেটে আসি। সিলেটে যতবার এসেছি আপনাদের উষ্ণ আতিথেয়তা পেয়েছি। আমাদের চরম দুঃসময়েও আপনারা আমাদের পাশে ছিলেন। আমার বারবার মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা, যখন আমরা দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে নিয়ে এখানে সমাবেশ করেছি, লংমার্চ করেছি এবং পরবর্তীকালে আপনাদের সঙ্গে নিয়ে গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করেছি। আজ ১৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস- এই দিনটিতে আজকে আপনাদের সামনে কথা বলতে পারছি। সিলেটের মানুষের সঙ্গে অতীতে ছিলাম, আগামীতেও থাকব ইনশাআল্লাহ। সিলেটের মানুষ আগামীতে দেশের নেতৃত্ব দেবে।

দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও পরবর্তী সরকার গঠনের ধারাবাহিকতা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, আজকে বহু ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে, রক্তপাতের বিনিময়ে, আমাদের সন্তানদের প্রাণের বিনিময়ে আমরা একটা ফ্যাসিস্ট সরকারকে সরিয়ে দীর্ঘকাল লড়াই করে একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছি। আমরা গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার একটা সুযোগ পেয়েছি। আজকে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমাদের নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়েছে। ওই সরকার চেষ্টা করছে অতি দ্রুততার সঙ্গে দেশকে সেই ভগ্নস্তূপ থেকে আবার জাগিয়ে তোলার। আমি প্রায়ই বলতাম, আমরা যারা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পক্ষে কাজ করি, তারা অনেকটা ফিনিক্স পাখির মতো। ধ্বংস হয়ে যায়, কিন্তু সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে আবার সামনে উড়ে গিয়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করি।

সংসদীয় গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক ঐক্যমতের ওপর কড়া তাগিদ দিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, গণতন্ত্র রক্ষায় সরকার ও বিরোধী দলকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সংসদকে কার্যকর করতে হবে। সরকারি ও বিরোধী দলের প্রধান দায়িত্ব হবে এই গণতান্ত্রিক অবস্থাকে টিকিয়ে রাখা। নানা বিষয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও দ্বিমত থাকবেই, তবে আলোচনার মাধ্যমে তা সমাধান করতে হবে এবং দেশের মৌলিক বিষয়গুলোতে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। আমাদের আগামী দিনের লড়াই দেশকে পুনর্গঠন করার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর বাসযোগ্য আবাসস্থল তৈরি করার। তা না হলে আমরা বারবার হোঁচট খেয়েছি—এ দেশের মানুষ বারবার গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছে কিন্তু বাধা পেয়েছে। আজকে যে সুযোগ এসেছে, সেই সুযোগ যেন আমরা কখনো অবহেলায় না হারাই। যদি নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াতে না পারি, নিজেদের অধিকার নিজেরা আদায় করতে না পারি তবে কেউ এসে আমাদের করে দিয়ে যাবে না।

প্রবাসীদের বিনিয়োগ, আঞ্চলিক অর্থনীতি ও বিদেশি বাণিজ্যের সম্ভাবনা নিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, সিলেটের হাওড়, চা বাগান, পাহাড় ও নদীকেন্দ্রিক পর্যটন শিল্পের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। একইসঙ্গে প্রবাসীদের বিনিয়োগ, জ্বালানি, কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প, চা, মৎস্য, গ্যাস, তথ্যপ্রযুক্তি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। গতকালই পাকিস্তানের হাইকমিশনার আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন।

তিনি বললেন, কয়েক দিন আগেই সিলেটে গিয়েছিলেন এবং এখান থেকে চা আমদানি করে নিয়ে যাবেন। অর্থাৎ আমাদের এখান থেকে চা তারা রপ্তানি করবে—তো এগুলো সঠিকভাবে কোঅর্ডিনেট করা দরকার। সিলেটের প্রবাসীদের আহ্বান জানাব আপনারা এসে এখানে শিল্প গড়ে তুলুন এবং পর্যটন ও কৃষিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করুন।

ভাষণের শেষভাগে দেশের ঐতিহাসিক অসাম্প্রদায়িক চেতনার ভূয়সী প্রশংসা করে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বাংলাদেশে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান আমরা অনেক জাতি একসঙ্গে বাস করি। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হচ্ছে এখানকার চমৎকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি; যা বিশ্বের আর কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই। আমাদের এখানে সাম্প্রদায়িক বিচ্ছিন্নতা বা গোলযোগ একদমই কম, কারণ আমরা সেভাবেই সম্প্রীতির মধ্যে বড় হয়ে উঠেছি। আসুন আমাদের অভিন্ন ইস্যুগুলোতে একমত হয়ে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাই।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সিলেটের সার্বিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানে বক্তারা সিলেটের পর্যটন, হাওড়াঞ্চলের মৎস্য খাত, চা শিল্প এবং প্রবাসীদের বিনিয়োগ সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জোর দাবি জানান।

রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী ও সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী সিলেটের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও প্রবাসীদের অভাবনীয় অবদানের কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতিকে আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

সংবর্ধনা ভাষণ শেষে রাষ্ট্রপতির সম্মানে সিলেট অঞ্চলের আঞ্চলিক ঐতিহ্য, বাউল গান ও লোকসংস্কৃতি নিয়ে সিসিকের উদ্যোগে এক মনোজ্ঞ ও বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করা হয়।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম