কৃষিজাত পণ্যের ওপর আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানোর সুপারিশ
সার সরবরাহে স্বচ্ছতা চায় সংসদীয় কমিটি
Advertisement
সংসদ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:২১ এএম
সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সার সরবরাহে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বলেছে কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। কমিটি বলেছে, কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাজের ওপর সরকারের সফলতা অনেকখানি নির্ভর করে। তাই যে কোনো মূল্যে কৃষকের দোরগোড়ায় সার পৌঁছাতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম মেনে নেওয়া হবে না। সার বিতরণ ব্যবস্থাপনায় মনিটরিং ব্যবস্থা আরও জোরদার এবং কৃষিবান্ধব সার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করারও সুপারিশ করেছে কমিটি।
বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির প্রথম বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। কমিটির সভাপতি মো. শাহাদাত হোসেন সেলিম বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। কমিটির সদস্য মো. শহিদুল ইসলাম, মো. মোস্তাফিজুর রহমান, মো. রোকন উদ্দীন বাবুল, মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী, মোছা. সাবিরা সুলতানা, মো. গোলাম রছুল ও মো. আব্দুল বারী সরদার এতে অংশ নেন। বিশেষ আমন্ত্রণে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকের শুরুতে কৃষির বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও মন্ত্রণালয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় কমিটির সভাপতি বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাজের ওপর সরকারের অনেক সফলতা নির্ভর করছে। তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়কে আরও গতিশীলভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। টেকসই ও পরিবেশবান্ধব কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
বৈঠকে কৃষিমন্ত্রী বলেন, বিগত বছরগুলোর তুলনায় চলতি বছর কৃষক পর্যায়ে বেশি সার সরবরাহ করা হয়েছে। স্বচ্ছতার ভিত্তিতে সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এজন্য ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত নীতিমালা-২০২৬’ জারি করা হয়েছে। তিনি বলেন, কৃষি এগিয়ে গেলে দেশ এগিয়ে যাবে, কৃষক শক্তিশালী হলে দেশ শক্তিশালী হবে। আদা, মরিচ, টমেটো, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন কৃষি ও কৃষিজাত পণ্যের আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং রপ্তানিমুখী করার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারই প্রথম মাটির গুণগত মান বজায় রাখার বিষয়ে কাজ শুরু করেছে।
বৈঠকে সার মজুত ও সরবরাহের তথ্য তুলে ধরে মন্ত্রণালয়। জানানো হয়, চলতি অর্থবছরে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি মিলিয়ে সারের চাহিদা ৫৮ লাখ ৫০০ টন। জুলাই থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের মোট ১২ লাখ ১৯ হাজার টন সার বিতরণ করা হয়েছে। ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই চার ধরনের সারের মজুত রয়েছে ১২ লাখ ৫৭ হাজার ৯০০ টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মজুত ছিল ১০ লাখ ৫৮ হাজার ৮০০ টন। ইউরিয়া, টিএসপি ও ডিএপি — তিন ধরনের সারের মজুত গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি বছর বেশি বলে বৈঠকে জানানো হয়।
তবে বৈঠকে কয়েকজন সদস্য তাদের নির্বাচনি এলাকায় সার সংকটের অভিযোগ করেন। কমিটির অন্তত তিন সদস্য জানান, অনেক জায়গায় কৃষক ন্যায্যমূল্যে সার পাচ্ছেন না। আবার কোনো কোনো সদস্য বলেন, তাদের এলাকায় সারের সংকট নেই। সার ডিলার নিয়োগ নিয়েও আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি শাহাদাত হোসেন সেলিম যুগান্তরকে বলেন, সার ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সারের ঘাটতি নেই। তবে নওগাঁ ও রাজশাহীর কিছু এলাকায় সংকট রয়েছে বলে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। এ অবস্থায় কমিটি সার বিতরণে সংকট থাকলে তা দূর করা, পালিয়ে যাওয়া ডিলারদের শূন্যস্থান পূরণ এবং ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের বাসিন্দাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছে।
বৈঠকে মাটি ও ফসলে কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। গতানুগতিকভাবে সার ও কীটনাশক ব্যবহার না করে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব সারের ব্যবহার বাড়িয়ে মাটির গুণগত মান বজায় রাখার বিষয়ে আলোচনা হয়।
এছাড়া যশোরের গদখালীতে ফুল ও মৃত্তিকা গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন, পাহাড় ও সমতল এলাকার বিভিন্ন পরিত্যক্ত জায়গায় তুলা উৎপাদন, চরের জমিতে ভুট্টা, মিষ্টি আলু ও বাদাম চাষ, কৃষিতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার, কৃষকদের উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনে বিদেশে পাঠানো, কৃষক পর্যায়ে পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানির বিষয়েও আলোচনা হয়।
মিয়ানমারে ৪০০ বস্তা সার পাচারের সময় চট্টগ্রামে গ্রেফতার ৩
মিয়ানমারে পাচারের সময় চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী থেকে ৪০০ বস্তা ইউরিয়াসহ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে সদরঘাট নৌ থানা পুলিশ। গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন আবু বকর সিদ্দিক, নুরুল ইসলাম জাহেদ ও আবদুল হক। বুধবার ভোরে কোতোয়ালি থানার চাক্তাই খালের পশ্চিমে বালুর মাঠসংলগ্ন কর্ণফুলী নদীতে অভিযান চালিয়ে এসব সার জব্দ করা হয়। সার পাচারে ব্যবহৃত একটি কার্গো বোটও জব্দ করেছে পুলিশ।
সদরঘাট নৌথানার ওসি আবদুর রব বলেন, গ্রেফতার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় মামলা করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
বদলগাছীতে সার সিন্ডিকেটে জড়িত কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা
নওগাঁর বদলগাছীতে সিন্ডিকেটের কারণে কৃষকদের প্রতি কেজি সার ৪ থেকে ১০ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এ কাজে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা সজল সরকার জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন ডিলারকে কালোবাজারিদের ৫০ বস্তা করে সার দিতে তিনি চাপ দেন বলে অভিযোগ।
রোববার বদলগাছী সদরের মেসার্স আলম ট্রেডার্সের ম্যানেজার মনোরঞ্জনকে এক কালোবাজারিকে ৫০ বস্তা সার দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। তিনি রাজি না হওয়ায় পরে কৃষি অফিস থেকে প্রতিষ্ঠানটির ওপর বিভিন্ন বিষয়ে চাপ আসতে থাকে।
মেসার্স আলম ট্রেডার্সের মালিক মাসুদ করিম আলম বলেন, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা সজল তার ম্যানেজারকে ফোন করে একজনকে ৫০ বস্তা সার দিতে বলেছিলেন। তবে তিনি সার দিতে অস্বীকৃতি জানান।
অভিযোগ অস্বীকার করে সজল সরকার বলেন, তিনি চাপ দেননি; সুযোগ থাকলে ৫০ বস্তা সার দিতে বলেছিলেন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান জানান, তিনি নতুন এসেছেন এবং দ্রুত সার সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করবেন। তবে সজল সরকারের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
উপজেলা সার ও বীজ কমিটির সভাপতি ইউএনও ইসরাত জাহান ছনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তার সার সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত হওয়ার সুযোগ নেই। এমন অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানানো হবে।
তালায় ভেজাল সার-কীটনাশক মজুত, ব্যবসায়ীর কারাদণ্ড
সাতক্ষীরার তালায় বাড়িতে নকল ও ভেজাল সার-কীটনাশক মজুত রাখার দায়ে মশিয়ার রহমান নামে এক ব্যবসায়ীকে এক মাসের কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। জব্দ করা প্রায় ৫ লাখ টাকা মূল্যের নকল ও ভেজাল সার-কীটনাশক ধ্বংসের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
বুধবার সকালে লাউতাড়া গ্রামে মশিয়ার রহমানের বাড়িতে র্যাব অভিযান চালিয়ে এসব পণ্য জব্দ করে। পরে ইউএনও জান্নাতুল আফরোজ স্বর্ণার নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়। মশিয়ার রহমান ওই গ্রামের ইমান আলী মোড়লের ছেলে। তিনি বিসিআইসি সার সাব-ডিলার হিসাবে ব্যবসা করার পাশাপাশি সার ও কীটনাশকের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
রাজশাহীতে জব্দ সার সরকারি দামে পেলেন কৃষক
রাজশাহীর পবা উপজেলায় কৃষকের বাড়িতে নিয়মবহির্ভূতভাবে মজুত ১২৯ বস্তা সার জব্দ করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ ঘটনায় কৃষক মামুনুন্নবী মিলনকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। পরে জব্দ করা ৪৮ বস্তা এমওপি ও ৮১ বস্তা টিএসপি সার সরকারি নির্ধারিত মূল্যে স্থানীয় কৃষকদের কাছে বিক্রি করা হয়।
বুধবার বড়গাছী ইউনিয়নের মণ্ডলপাড়ায় ইউএনও ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. ইবনুল আবেদীনের নেতৃত্বে অভিযানটি হয়।
তবে মিলনের দাবি, বিক্রির জন্য নয়, নিজের জমিতে আলু চাষের জন্য সার রেখেছিলেন। গত বছর ৪৫ বিঘা জমিতে আলু চাষের পর সার বেঁচে যায়। চলতি মৌসুমে প্রয়োজনের সময় সার না পাওয়ার আশঙ্কায় তিনি সেগুলো মজুত করেছিলেন।
গুরুদাসপুরে সার পাচারের ভিডিও ভাইরাল
নাটোরের গুরুদাসপুরের এক ডিলারের ৪০ বস্তা সার পাচারের ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। মঙ্গলবার ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে শ্যালোচালিত ভটভটিতে সার নিয়ে সিরাজগঞ্জের তাড়াশের দিকে যাওয়ার দৃশ্য দেখা যায়। স্থানীয়দের কথোপকথনে ৪০ বস্তা সার তাড়াশের সবুজপাড়ায় নেওয়ার কথা শোনা যায়। চালকের বক্তব্যেও ডিলার গিয়াস উদ্দিন প্রামাণিকের নাম শোনা যায়।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে গিয়াস উদ্দিন বলেন, ভিডিওটি ১৫ সেপ্টেম্বরের নয়, ১১ সেপ্টেম্বরের। তার দাবি, রানীগ্রামের কৃষক শহিদুল ও রাশিদুল তার কাছ থেকে ৮ বস্তা করে মোট ১৬ বস্তা সার ন্যায্যমূল্যে কিনেছিলেন। পথে রাঙ্গা মোল্লা নামে এক ব্যক্তি সারবোঝাই ভটভটি আটকে ২০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন। টাকা না দেওয়ায় তার বিরুদ্ধে সার পাচারের নাটক সাজানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
রাঙ্গা মোল্লা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সার ডিলারের মাধ্যমে তাড়াশে পাচার হচ্ছিল। পাচার রোধ করায় গিয়াস উদ্দিন তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ করছেন।
গুরুদাসপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কে এম রাফিউল ইসলাম বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
