Logo
Logo
×
   

Advertisement

জাতীয়

মন্ত্রিসভায় পাশের পরও হয়নি নতুন পে স্কেলের গেজেট, হচ্ছে ১১ পরিবর্তন

Advertisement

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৫৮ পিএম

মন্ত্রিসভায় পাশের পরও হয়নি নতুন পে স্কেলের গেজেট, হচ্ছে ১১ পরিবর্তন

Advertisement

মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পরও এখনো প্রকাশ হয়নি নতুন জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এর গেজেট। গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো অনুমোদন করা হয়। এতে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে গ্রেডভেদে মূল বেতন ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

নতুন কাঠামোয় শুধু মূল বেতনই নয়, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, মোবাইল, যাতায়াত ও টিফিন ভাতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। পাশাপাশি উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময়সীমা কমানো, প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য নতুন ভাতা এবং সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন ভাতা পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।

নতুন বেতনকাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে। তবে মূল বেতন একসঙ্গে নয়, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। সাম্প্রতিক সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়ন হবে এবং অন্যান্য ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।

১. বাড়িভাড়া ভাতার হার কমছে

নতুন পে-স্কেলের অন্যতম বড় পরিবর্তন বাড়িভাড়া ভাতা। বর্তমানে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় গ্রেডভেদে মূল বেতনের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ বাড়িভাড়া দেওয়া হয়। নতুন কাঠামোয় তা কমিয়ে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।

ঢাকার বাইরে অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও সাভারে বর্তমানে ৪০ থেকে ৫৫ শতাংশের পরিবর্তে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশন ও সাভারের বাইরে ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশের পরিবর্তে ২৫ থেকে ৪৫ শতাংশ বাড়িভাড়া দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

তবে মূল বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ায় শতাংশ কমলেও বাড়িভাড়ার প্রকৃত টাকার অঙ্ক গ্রেডভেদে বাড়তে পারে। অর্থাৎ ভাতার হার কমিয়ে মূল বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে মোট আর্থিক সুবিধার মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

২. বয়সভেদে চিকিৎসাভাতা

বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা চিকিৎসাভাতা পান। নতুন কাঠামোয় বয়সভেদে এ ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।

৫০ বছর পর্যন্ত বয়সী চাকরিজীবীরা মাসে ৩ হাজার টাকা, ৫০ বছরের বেশি থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত ৪ হাজার টাকা, ৬০ বছরের বেশি থেকে ৭০ বছর পর্যন্ত ৫ হাজার টাকা এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সে ৬ হাজার টাকা চিকিৎসাভাতা পাওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও বয়স অনুযায়ী চিকিৎসাভাতা বাড়ানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

৩. গ্রেডভেদে কমবে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি

বর্তমানে সব গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবী মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পান। নতুন কাঠামোয় এ অভিন্ন হার আর থাকছে না।

গ্রেড-২০ থেকে গ্রেড-৬ পর্যন্ত ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। গ্রেড-৫-এ এ হার ৪ শতাংশ, গ্রেড-৪ ও ৩-এ ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং গ্রেড-২-এ ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ করা হচ্ছে।

অর্থাৎ উচ্চ বেতনভোগী কর্মকর্তাদের মূল বেতন বেশি হলেও প্রতিবছর বেতন বৃদ্ধির শতাংশ তুলনামূলক কম হবে। সশস্ত্র বাহিনীতেও একই ধরনের কাঠামো অনুসরণ করা হচ্ছে।

৪. সব গ্রেডে চালু হচ্ছে মোবাইল ভাতা

নতুন বেতনকাঠামোয় প্রথমবারের মতো সব গ্রেডের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য মোবাইল ভাতার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রথম থেকে পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তারা মোবাইল বিল পেয়ে থাকেন।

নতুন প্রস্তাবে প্রথম থেকে পঞ্চম গ্রেডে মাসে ৫০০ টাকা এবং ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডে ১৫০ টাকা মোবাইল ভাতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এর ফলে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরাও প্রথমবারের মতো নির্দিষ্ট মোবাইল ভাতার আওতায় আসবেন। নতুন কাঠামোয় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্যও মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতা চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

৫. যাতায়াত ভাতা দ্বিগুণ

জীবনযাত্রার ব্যয় ও পরিবহণ খরচ বিবেচনায় যাতায়াত ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে মাসে ৩০০ টাকা পাওয়া গেলেও নতুন কাঠামোয় তা বাড়িয়ে ৬০০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রেষণ ভাতার কাঠামো পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে শিক্ষা সহায়ক ভাতা, কার্যভার ভাতা, আপ্যায়ন ভাতা, কুক অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যালাউন্স, উৎসব ভাতা এবং শ্রান্তি-বিনোদন ভাতার বিদ্যমান হার বহাল রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

৬. টিফিন ভাতা বাড়ছে ৩০০ টাকা

নতুন কাঠামোয় টিফিন ভাতাও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। বর্তমানে মাসে ২০০ টাকা টিফিন ভাতা দেওয়া হয়। এটি বাড়িয়ে ৫০০ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।

একই সঙ্গে ধোলাই ভাতা ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে।

৭. প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য নতুন ভাতা

নতুন পে-স্কেলে প্রথমবারের মতো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য ভাতা চালু করা হচ্ছে।

প্রতি সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সর্বোচ্চ দুই সন্তান এ সুবিধার আওতায় আসবে। অর্থাৎ একজন কর্মচারী এ খাতে মাসে সর্বোচ্চ ৬ হাজার টাকা পেতে পারেন।

৮. বাংলা নববর্ষ ভাতা কমছে

কয়েকটি ভাতা বাড়ানো হলেও বাংলা নববর্ষ ভাতার হার কমানোর প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে এ ভাতা দেওয়া হয়।

নতুন কাঠামোয় তা কমিয়ে মূল বেতনের ১৫ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে পাহাড়ি ভাতা এবং হাওড়, দ্বীপ ও চরভাতা মূল বেতনের ২০ শতাংশই থাকবে। তবে এসব ভাতার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হবে।

ঝুঁকি ভাতাসহ বিভিন্ন বিশেষ ভাতার পরিমাণ বিদ্যমান হারের তুলনায় ২০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাবও রয়েছে।

৯. পেনশনে আসছে পরিবর্তন

এক গ্রেড এক পেনশন বাস্তবায়নের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে নিট পেনশনের নতুন সীমা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী সর্বনিম্ন নিট পেনশন ১০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭০ হাজার ২০০ টাকা হতে পারে।

পেনশন কাঠামোর এই পরিবর্তনের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্তদের চিকিৎসাভাতাও বয়সভেদে বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।

নতুন বেতনকাঠামোর আওতায় অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুবিধা নির্ধারণের বিষয়টি গেজেট ও পরবর্তী বাস্তবায়ন নির্দেশনায় আরও স্পষ্ট হবে।

১০. উচ্চতর গ্রেড ও বিশেষ প্রণোদনায় পরিবর্তন

বর্তমানে একই গ্রেডে ১০ বছর চাকরি করলে পদোন্নতি না হলেও উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। নতুন কাঠামোয় এ সময় কমিয়ে ৮ বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছে। দ্বিতীয়বার উচ্চতর গ্রেড পেতে একই গ্রেডে আরও ছয় বছর চাকরির শর্ত রাখা হচ্ছে।

পদোন্নতিযোগ্য পদে কর্মরতরা পদোন্নতি না পেলে চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ দুইবার এ সুবিধা পাবেন। আর পদোন্নতির সুযোগ নেই এমন ‘ব্লকড পদে’ কর্মরতরা সর্বোচ্চ তিনবার উচ্চতর গ্রেড পাবেন।

এদিকে ২০২৪ সালে চালু হওয়া বিশেষ প্রণোদনাও নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতিল হবে। প্রথমে মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে চালু করা এ প্রণোদনা পরে ১০ শতাংশ করা হয়েছিল।

১১. সশস্ত্র বাহিনীর বেতন-ভাতাতেও বড় পরিবর্তন

জাতীয় বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর বেতন ও ভাতা পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে। নন-কমব্যাট্যান্ট (এনরোল্ড) বা এনসি (ই) এবং সমতুল্য পদে প্রারম্ভিক মূল বেতন ২১ হাজার টাকা এবং মেজর জেনারেল ও সমপদে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সমপদকে গ্রেড-২ এবং কর্নেল ও সমপদকে গ্রেড-৩-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

বিমানবাহিনীর ফ্লাইং পে বাড়ানোর পাশাপাশি কমান্ড, স্টাফ, টিচিং, কোয়ালিফিকেশন, ডিস্টার্বেন্স ও বিশেষজ্ঞ বেতন ১০ শতাংশ করে এবং দক্ষতা, নিযুক্তি, প্যারাসুট, কমান্ডো বা স্নাইপার, স্কুবা ডাইভিং ও সদাচরণ বেতন ১৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। জরিপ ভাতা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জন্য বিদ্যমান ৮১ ধরনের ভাতাও পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রতিরক্ষা ভাতা, কিট ভাতা, ডেঞ্জার মানি, দোভাষী ও শিক্ষকতা ভাতাসহ বিভিন্ন ভাতা বিদ্যমান হারের তুলনায় ১০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।

তবে বাড়িভাড়া, যাতায়াত, কার্যভার, আপ্যায়ন, টিফিন, ধোলাই, পাহাড়ি, উৎসব, শ্রান্তি-বিনোদন, নববর্ষ, শিক্ষা সহায়ক, চিকিৎসা এবং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রেষণ ভাতা নতুন জাতীয় বেতন স্কেলের অনুরূপ হবে।

২৪ লাখ চাকরিজীবী, সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত উপকৃত হওয়ার কথা

সরকারের হিসাবে নতুন বেতন কাঠামোয় প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন।

নতুন কাঠামোয় গ্রেড-২০-এর প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং গ্রেড-১-এর নির্ধারিত বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ।

নতুন পে-স্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হলেও মূল বেতন ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর এখন অর্থ বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন ও বাস্তবায়ন নির্দেশনা জারির অপেক্ষা রয়েছে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম