জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি
চট্টগ্রামে সকাল থেকেই গণপরিবহণে নৈরাজ্য শুরু
Advertisement
আহমেদ মুসা, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৪ পিএম
প্রতীকী ছবি: এআই
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করা হলো রাতে। আর সকালেই এর ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে গণপরিবহণে। বিভিন্ন রুটে অস্বাভাবিক ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়ার কারণে এ নিয়ে চলছে চরম নৈরাজ্য। মর্জিমাফিক বাসভাড়া আদায় করছেন পরিবহণ শ্রমিকরা। অকটেন ও ডিজেলের দাম বাড়লেও এ সুযোগে গ্যাসে চালিত বাস ও সিএনজির ভাড়াও ইচ্ছামতো আদায় করা হচ্ছে। এ নিয়ে চট্টগ্রাম নগরীতে চলছে যাত্রী-হেলপার বাগবিতণ্ডা। ঘটছে হাতাহাতির ঘটনাও। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) ও বাস মালিকপক্ষ এখন ভাড়া বাড়ানোর ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। তারপরও বাস শ্রমিকরা ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন।
যাত্রীদের অভিযোগ, সরকার প্রতি লিটার জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করেছে ২০ টাকা। এই হিসাবে একটি যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণ করা যায়; কিন্তু তার আগেই গণপরিবহণগুলো ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় শুরু করে দিয়েছে সোমবার সকাল থেকেই। এমনিতেই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে জনজীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে। তার ওপর গণপরিবহণে ভাড়ার এমন নৈরাজ্য গণমানুষের ভোগান্তি ও ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখা দিয়েছে। বাসে উঠা-নামার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ১৫ টাকা! আগে যে ভাড়া ছিল ৭ টাকা থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত।
ঘোষণা ছাড়া পণ্য পরিবহণ ও গণপরিবহণের ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় হতাশ যাত্রী ও শ্রমিকরা। একইভাবে রাইট শেয়ারিং চালকদের আয়ও প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। সাধারণ মানুষ বলছেন, নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে বারবার জ্বালানির দাম বৃদ্ধি তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়াবে ।
চট্টগ্রাম নগরীর ২০টি রুটে ১ হাজার ৮০টি বাস ও মিনিবাস, ১৭টি রুটে ১ হাজার ১৩৬টি হিউম্যান হলার এবং ২২টি রুটে ১ হাজার ৭২১টি অটোটেম্পো চলাচলের অনুমোদন রয়েছে। নগরীতে প্রতিদিন আনুমানিক ৫৯ থেকে ৬৭ লাখ ট্রিপ সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে ৬৫ থেকে ৭১ শতাংশ যাত্রী অর্থাৎ ৩৮ লাখের বেশি মানুষ প্রধান বাহন হিসেবে বাস, টেম্পো ও হিউম্যান হলারের মতো গণপরিবহণ ব্যবহার করেন।
কাজীর দেউড়ি মোড় থেকে নিউ মার্কেট মোড় পর্যন্ত এক কিলোমিটার দূরত্বেও মিনি বাসের ভাড়া ছিল ৭ টাকা। এখন আদায় করা হচ্ছে ১৫ টাকা। এ নিয়ে যাত্রী-হেলপারের সঙ্গে প্রতিনিয়িত চলছে বাকযুদ্ধ।
নগরীর আগ্রাবাদ, বহদ্দারহাট, চকবাজার নিউমার্কেটসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বাস, টেম্পো হিউম্যান হলার সবধরণের পরিবহণে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। কোতোয়ালি মোড় থেকে জামাল খান মোড় পর্যন্ত ম্যাক্সিমার জনপ্রতি ভাড়া ছিল ৮ টাকা থেকে ১০ টাকা। সোমবার থেকে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে ১৫ টাকা।
বাসে বহদ্দারহাট থেকে নতুন ব্রিজ (শাহ আমানত ব্রিজ) পর্যন্ত বাসের ভাড়া ছিল জনপ্রতি ১০ থেকে ১২ টাকা। মাহিন্দ্রায় জনপ্রতি ভাড়া ছিল ১৪ টাকা। কিন্তু এখন জনপ্রতি বাস ভাড়া আদায় করা হচ্ছে ১২ থেকে ১৪ টাকা। মাহিন্দ্রায় জনপ্রতি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে ১৫ টাকা থেকে ২০ টাকা। অথচ এসব মাহিন্দ্রা টেম্পো গ্যাস চালিত। তারপরও আদায় করা হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া।
আগে বাসে উঠা-নামা ভাড়া ছিল ১০ টাকা। সোমবার থেকে রাতারাতি গাড়ি উঠা-নামা ভাড়া করা হয়েছে ১৫ টাকা। কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত আগে ভাড়া ছিল ৩৫ টাকা, এখন নেওয়া হচ্ছে ৪৫ টাকা থেকে ৫০ টাকা। কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে ২ নম্বর গেটের ভাড়া ছিল ১২ টাকা। ৬০ শতাংশ বাড়তি অজুহাতে এখন ভাড়া নেয়া হচ্ছে ১৫ টাকা। ক্ষেত্রবিশেষ ২০ টাকাও দাবি করা হচ্ছে। এ নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত বাগবিতণ্ডা লেগে রয়েছে। সরকারি চার্ট অনুযায়ী, বহদ্দারহাট থেকে শিকলবাহা ক্রসিং পর্যন্ত ভাড়া ২২ টাকা হলেও আদায় করা হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। পটিয়া রুটে ৫৯ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৭০-৭৫ টাকা এবং কেরানীহাট পর্যন্ত ১১২ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ১৫০ টাকা। অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে চালক ও সহকারীদের সঙ্গে যাত্রীদের বাগবিতণ্ডা এখন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সরকার নির্ধারিত ভাড়া কোনোভাবেই মানা হচ্ছে না। চালকরা কিলোমিটার-ভিত্তিক হিসাবও দিচ্ছেন না; বরং নিজেদের ইচ্ছামতো ১০ টাকাকে ২০ টাকা, ২০ টাকাকে ২৫ টাকা করে ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন। এমনকি সিএনজি অটোরিকশাতেও অযৌক্তিকভাবে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে, যদিও গ্যাসের কোনো সংকট নেই।
নগরীর একটি সরকারি কলেজের শিক্ষক নাসির উদ্দিন যুগান্তরকে জানান, জ্বালানি তেলের দাম কমলে গণপরিবহণে ভাড়া কমানোর কোনো উদ্যোগ থাকে না; কিন্তু জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে রাতারাতি ভাড়া বেড়ে যায়। সরকার এখনও বাস ভাড়া বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। নগরীর সড়কগুলোতে ভাড়া নিয়ে চলছে নৈরাজ্য। গণপরিবহণ চালক-হেলপাররা সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তোয়াক্কা না করে নিজেদের খেয়াল খুশিমতো বাড়তি ভাড়া আদায় করছেন। আর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে গ্যাসচালিত বাসগুলোও ডিজেলচালিত বাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সমানতালে বাড়তি ভাড়া আদায় করছে। এ নিয়ে নগরবাসী ও বাস সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা এমনকি হাতাহাতির ঘটনাও ঘটছে।
বিআরটিএ চট্টগ্রামের বিভাগীয় পরিচালক শফিকুজ্জামান ভূঞা যুগান্তরকে জানান, গত রাতে মাত্র জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। বাস ভাড়া বাড়ানোর ব্যাপারে ঢাকা থেকে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।
